—প্রতীকী চিত্র।
অস্ট্রেলিয়ার দেখানো পথে হাঁটতে চাইছে ব্রিটেন এবং ফ্রান্সও! অস্ট্রেলিয়ার মতো তারাও কিশোর-কিশোরীদের সমাজমাধ্যম ব্যবহারের উপরে নিষেধাজ্ঞা আনতে চাইছে। তবে তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত বিশেষজ্ঞেরা। এরই মধ্যে ইউরোপীয় দুই দেশই নিজের নিজের মতো করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে শুরু করেছে।
গত মাসেই অস্ট্রেলিয়ার সেনেটে বিল পাশ করে এই সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। জানিয়ে দেওয়া হয়, ১৬ বছরের কমবয়সিরা আর সমাজমাধ্যম ব্যবহার করতে পারবে না। ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব, এক্স, স্ন্যাপচ্যাট, ইনস্টাগ্রাম প্রভৃতি ১০টি প্রচলিত সমাজমাধ্যমের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। অস্ট্রেলিয়ার ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন দেশে আলোচনা শুরু হয়।
এখন ফ্রান্সও চাইছে সে দেশে ১৫ বছরের কম বয়সি কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা চাপাতে। এই বিষয়ে বেশ কিছু বিল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে ফ্রান্সে। তার মধ্যে একটি বিলে সরাসরি সমর্থন জানিয়েছেন সে দেশের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ। ‘দ্য গার্ডিয়ান’ও গত সপ্তাহে জানায়, মার্কিন মনোবিজ্ঞানী জোনাথন হাইটের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাইছে ব্রিটিশ সরকার। বস্তুত, অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সিদের সমাজমাধ্যম ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞায় শুরু থেকেই সমর্থন জুগিয়ে আসছেন হাইট, যা থেকে অনুমান করা হচ্ছে, ব্রিটেনও এই সংক্রান্ত কড়াকড়ির পথে এগোচ্ছে।
তবে কিশোর-কিশোরীদের সমাজমাধ্যম ব্যবহারের উপরে নিষেধাজ্ঞা চাপানোর সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকরী হবে, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। যাঁরা এই নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করেন, তাঁদের দাবি কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঠেকাতে এটি অবশ্যই প্রয়োজন। আবার অনেকে এমনটাও দাবি করছেন যে এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকরী তা এখনও হিসাব কষার সময় আসেনি। পরিবর্তে অন্য কোনও পদ্ধতি অবলম্বনের পক্ষে সওয়াল করছেন তাঁরা।
যেমন ব্রিটেন যে মনোবিদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাইছে, সেই হাইট ২০১৪ সালে একটি বই লেখেন— ‘দ্য অ্যাংশিয়াস জেনারেশন’। ওই বইতে তিনি দাবি করেন, স্ক্রিনে দিকে বা সমাজমাধ্যমের পাতায় বেশি ক্ষণ তাকিয়ে থাকলে শিশুদের মস্তিষ্ক প্রভাবিত হয়। এর ফলে মানসিক অসুস্থতার এক ‘মহামারি’ সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করেন হাইট। তবে এই দাবি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কও রয়েছে। কানাডার মনোবিদ ক্যান্ডিস ওডজার্ড ওই বইয়ের সমালোচনায় লেখেন, হাইট এক ‘ভয়ঙ্কর গল্প’ বলছেন যার সঙ্গে বিজ্ঞানের কোনও যোগ নেই।
আবার হাইটের মতকে সমর্থন করেন, এমন মনোবিদও রয়েছেন অনেকে। তাঁদের মধ্যে এক জন অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাইকেল নোয়েটেল। হাইটের ধারণাকে সমর্থন করে তিনি বলেন, “সমাজমাধ্যম যে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষতি করে, তার প্রচুর প্রমাণ রয়েছে। কেউ কেউ এটির প্রমাণ চেয়ে একটি অবাস্তব দাবি করছেন।” আবার এমনও অনেকে রয়েছেন, যাঁরা মনে করছেন সমাজমাধ্যমের ব্যবহারে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তবে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণেরও বিরূপ প্রভাব থাকতে পারে বলে মনে করেন তাঁরা। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক বেন সিংহ গত তিন বছর ধরে এক লক্ষেরও বেশি কিশোর-কিশোরীকে পর্যবেক্ষণ করেন।
সিংহ গবেষণায় দাবি করেন, যারা দিনে দুই ঘণ্টার বেশি সমাজমাধ্যম ব্যবহার করে এবং যারা একেবারেই ব্যবহার করে না— উভয় ক্ষেত্রেই মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। পরিবর্তে যারা পরিমিত ভাবে সমাজমাধ্যমকে ব্যবহার করে, তাদেরই মানসিক স্বাস্থ্য সবচেয়ে ভাল দেখা গিয়েছে। এএফপি-কে সিংহ বলেন, “অতিরিক্ত বিধিনিষেধ বা অতিরিক্ত ব্যবহার, দুই-ই সমস্যার কারণ হতে পারে।” এ অবস্থায় গবেষকদের অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি আরও সময় নিয়ে বিবেচনা করা উচিত। অস্ট্রেলিয়ায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার অন্তত এক বছর পর সে দেশে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে কী প্রভাব দেখা যাচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করা উচিত। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যামি অর্বেনের কথায়, “অস্ট্রেলিয়ায় নিষেধাজ্ঞার কোনও অবাঞ্ছিত প্রভাব দেখা যাচ্ছে কি না, তা আগামী এক বছরের মধ্যে আমরা অনেকটা বুঝতে পারব।”