CO-POWERED BY
Back to
Advertisment

উৎসবের গ্যালারি

Durga Puja 2021: দুর্গার বিভিন্ন অস্ত্র ও তার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা

নিজস্ব প্রতিবেদন
কলকাতা ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৬:১১
‘দেবী ভাগবত পুরাণ’ দুর্গাকে বর্ণনা করে জগতের সর্বময় শক্তির মূর্ত রূপ হিসেবে। মহিষাসুর নিধনের জন্য তিনি উদ্ভূত হয়েছিলেন বিভিন্ন দেবতার তেজ থেকে। দশভুজা দুর্গাকে ১০টি প্রহরণ বা অস্ত্র প্রদান করেছিলেন বিভিন্ন দেবতা। এই অস্ত্র বা তাঁর হস্তধৃত বস্তুগুলির আবার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাও রয়েছে।

২) দুর্গামূর্তিতে দেখা যায়, দেবী ত্রিশূলধারিণী। এই ত্রিশূল তাঁকে প্রদান করেছিলেন স্বয়ং শূলপাণি শিব। বিবিধ হিন্দু শাস্ত্র ত্রিশূলের বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়। কখনও ত্রিশূলের তিনটি ‘শূল’ সত্ত্ব, রজ ও তম— এই ত্রিগুণের প্রতীক হিসেবে বর্ণিত । আবার কখনও এই তিনটিকে সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের ইঙ্গিতবাহী বলা হয়েছে। বিভিন্ন তন্ত্র গ্রন্থে ত্রিশূলকে জাগতিক মায়া থেকে মুক্তির উপায় হিসবেও বর্ণনা করা হয়েছে।
Advertisement
দেবীকে তাঁর চক্র ‘সুদর্শন’ দান করেন শ্রীবিষ্ণু। সুদর্শনের গায়ে ১০৮টি ধারালো ফলা রয়েছে। শাস্ত্রে সুদর্শন চক্রাকার ব্রহ্মাণ্ডের প্রতীক এবং দেবীশক্তি তার কেন্দ্রস্থল হিসেবে বর্ণিত। চক্রকে আলাদা সত্তা হিসেবে পুজো করার রেওয়াজও হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত।

দেবীর ১০ হাতে ধরে থাকা সব বস্তুই যে ‘অস্ত্র’, এমন নয়। জলদেবতা বরুণ দুর্গাকে প্রদান করেছিলেন শঙ্খ। সনাতন ধর্মে শঙ্খের মহিমা বিপুল। শঙ্খধ্বনিকে ওঙ্কারের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তা ছাড়া, শঙ্খ মাঙ্গলিক কাজ থেকে শুরু করে যুদ্ধারম্ভ— সব কাজেই ব্যবহৃত হয়।
Advertisement
দেবির এক হাতে রয়েছে অগ্নি, যা তাঁকে দিয়েছিলেন স্বয়ং আগ্নিদেব। অগ্নিদেব আদিবৈদিক দেবতা। তিনি প্রাকৃতিক শক্তির প্রতিভূ। মানব সভ্যতার শুরুতেই রয়েছে আগুনের মহিমা। অগ্নি আজ পর্যন্ত পূজিত হন হোমশিখায়, দেবারতির প্রদীপে। দেবীর হাতে ধরা অগ্নি এক দিকে যেমন অস্ত্র, তেমনই আবার প্রজ্জ্বলিত অগ্নি দেবীর নিজস্ব শক্তিকেও বোঝায়। শাস্ত্র মতে অগ্নি যাবতীয় ক্লেদ থেকে জগৎকে উদ্ধার করে, শুদ্ধ করে।

আর এক বৈদিক দেবতা পবন বা বায়ু দুর্গাকে দিয়েছিলেন তির-ধনুক। ধনুক এখানে সম্ভাব্য শক্তির প্রতীক আর তির প্রকাশিত গতিশক্তিকে বোঝায়। দেবীর হাতে এই দুই অস্ত্র তাঁর শক্তিরূপকেই বর্ণনা করে। জানায়, তিনিই জগৎশক্তির সম্ভাবনা ও প্রকাশ্য রূপকে ধারণ করে রয়েছেন।

দেবরাজ ইন্দ্র দুর্গাকে প্রদান করেছিলেন বজ্র। বজ্রের সঙ্গে অতি প্রাচীন প্রকৃতি উপাসনার বিশেষ যোগ রয়েছে। বজ্র অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক শক্তি। তা ছাড়া, ‘দৃঢ়তা’ বোঝাতেও বজ্রের উপমা ব্যবহৃত হয়। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মে বজ্রের বিভিন্ন মহিমা বর্ণিত। দুর্গার বর্তমান রূপটির পিছনে বৌদ্ধতান্ত্রিক প্রভাব যথেষ্ট। সে দিক থেকে দেখলেও, দেবীর হাতে ধরা বজ্র ভিন্ন ইঙ্গিত বহন করে। বৌদ্ধ ব্যাখ্যা অনুসারে, বজ্র জাগতিক বন্ধন থেকে চেতনাকে মুক্ত করে।

দেবীকে পদ্ম প্রদান করেছিলেন ব্রহ্মা। ভারতীয় আধ্যাত্মিকতায় পদ্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তা পূর্ণ চৈতন্যকে ব্যক্ত করে। দেবীকে তন্ত্রশাস্ত্র প্রকাশিত জগৎশক্তি হিসেবেই জ্ঞান করে। সেই কারণে তাঁর হাতে ধরা পদ্ম সামূহিক চৈতন্যকেই বোঝায়। আবার মতান্তরে ব্রহ্মা নিজের কমণ্ডলু দান করেন দেবীকে। এই পাত্রে ধৃত জল সৃষ্টির প্রতীক।

দেবীর অন্যতম আয়ুধ হল খড়্গ। কোথাও কোথাও তা তরবারি হিসেবেও দেখা যায়। পুরাণ অনুসারে, যম এই অস্ত্র দেবীকে দিয়েছিলেন। এই অস্ত্র একাধারে মৃত্যু ও ন্যায়বিচারের প্রতীক। এতে জড়িয়ে আছে বীরত্ব, শক্তি ইত্যাদির অনুষঙ্গও।

ব্রহ্মাপুত্র বিশ্বকর্মা দেবীকে দিয়েছিলেন কুঠার-সহ আরও বিভিন্ন অস্ত্র। পুরাণে বিশ্বকর্মাকে অসংখ্য দিব্যাস্ত্র নির্মাণ করতে দেখা যায়। যার মধ্যে কুঠার একাধারে নির্মাণ ও ধ্বংসের প্রতীক। কুঠার দিয়ে কাঠ কেটে তৈরি হয় বিবিধ আসবাব থেকে শুরু করে বাড়িঘরও। সে দিক থেকে দেখলে, এটি সৃজনের প্রতীক। আবার কুঠার একটি প্রাণঘাতী অস্ত্রও বটে।

কোনও কোনও দুর্গামূর্তির হাতে গদা দেখা যায়। গদা মোহকে চূর্ণ করে বলে ব্যক্ত করে বিভিন্ন শাস্ত্র।

দুর্গার কোনও মূর্তির হাতে সাপ দেখা যায়। সাপ হিন্দু ধর্মে কুলকুণ্ডলিনী শক্তির প্রতীক। যা জাগরিত হলে সাধকের সাধনা পূর্ণ হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। শাক্তধর্মে সর্পপ্রতীক বার বার ব্যবহৃত হয়। এই সাপটিও দেবীকে শিব প্রদান করেছিলেন বলে মনে করা হয়।

সব দুর্গামূর্তি এক রকম নয়। তার অসংখ্য প্রকারভেদ রয়েছে। সেই ভেদ অনুসারে দেবীর অস্ত্রও বদলে যায়। মনে রখা দরকার, পৌত্তলিক হিন্দু ধর্মে প্রতিটি দেব-কল্পনার পিছনে গভীর দার্শনিক তত্ত্ব কাজ করে। দেবী দুর্গার ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে। তাঁর মূর্তি সব মিলিয়ে এক পুর্ণতার প্রতীক। তাঁর দশ হাতে ধৃত অস্ত্রগুলি বিভিন্ন ভাবে সাধনতত্ত্বকেই ব্যক্ত করে।

দুর্গার এই রূপকল্পনায় মিশে রয়েছে বৌদ্ধ দেবী-ভাবনাও। সে ক্ষেত্রে আবার দেবীর হাতে ধরা অস্ত্রের অন্য রূপও দেখা যেতে পারে। কিন্তু হিন্দু অথবা বৌদ্ধ, যা-ই হোক না কেন, দেবীর এই দশপ্রহরণের আসল কাজ মানুষকে আসুরিক চেতনা থেকে মুক্ত করে ব্রহ্মাণ্ডস্বরূপ প্রদর্শন, পূর্ণজ্ঞান লাভের পথে নিয়ে যাওয়া।