বিধানসভা ভোটে চমক নয়, বরং দলের পুরনো নেতা-কর্মীদেরই বেশির ভাগ আসনে প্রার্থী করেছে রাজ্য বিজেপি। তাতেও প্রার্থী নিয়ে বিক্ষোভে যতিচিহ্ন পড়ল না। এমনকি, শুক্রবার সেই বিক্ষোভ দেখা গেল রাজ্য বিজেপির বিধাননগরের দফতরেও। আর তা সামাল দিতে আসরে নামতে হল দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকেই। জেলায় ‘পরিস্থিতি সামলাতে’ মাঠে নেমেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও। ক্ষোভের সুর দেখা গিয়েছে বিজেপির ‘শক্ত-ঘাঁটি’ বলে পরিচিত মতুয়া-এলাকাতেও। এরই মধ্যে দলের সিদ্ধান্তই যে শেষ কথা, তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন শমীক। নিজেদের দলে প্রার্থী-ক্ষোভ দেখা গেলেও বিজেপির ‘কোন্দলে’র কথা বলে টিপ্পনী কাটতে ছাড়েনি তৃণমূল কংগ্রেস।
গত বার বিজেপির প্রার্থী নিয়ে বিক্ষোভ সামলাতে সিআরপি-র লাঠি পর্যন্ত চলেছিল। সেই পরিস্থিতি এড়াতে এ বার জেলা সভাপতিদের প্রার্থী করা হয়নি। প্রার্থীদের বিষয়ে তাঁদের মতামতও নেওয়া হয়নি। জোর দেওয়া হয়েছে সব স্তরের কর্মীদের মতামত এবং সমীক্ষক দলের পরামর্শকে। কিছু ক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়েছে বিজেপির সর্বোচ্চ স্তরের মতামত।
তবুও বিজেপিতে প্রার্থী নিয়ে ক্ষোভের ছবি রাজ্য জুড়েই দেখা যাচ্ছে। এন্টালি, বেলেঘাটার প্রার্থী পছন্দ হয়নি, এই অভিযোগে এ দিন বিজেপির বিধাননগরের দফতরে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন কর্মীদের একাংশ। এক সময়ে দলের বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয় বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, সাধারণ সম্পাদক লকেট চট্টোপাধ্যায়, শশী অগ্নিহত্রীকে। তাঁদের সামনেই বেলেঘাটার দলীয় কর্মী অভিজিৎ সরকার বলেছেন, “আমার ভাইকে খুন করেছিল তৃণমূল। সেই দলের বিরুদ্ধে লড়তে এই প্রার্থী চাই না! এ তো তৃণমূলকে সুযোগ করে দেওয়া।” সূত্রের খবর, দলের মধ্যে শ্যামপুকুর, টালিগঞ্জ, যাদবপুরেও প্রার্থী নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে রয়েছে। দলীয় দফতরে বিক্ষোভ সামাল দেওয়ার সময়েই রাজ্য সভাপতি শমীক কার্যত হুঁশিয়ারির স্বরে বলেছেন, “এটা বিজেপি। এখানে এই সব চলে না! আমরা আপনাদের কথা শুনলাম। ভেবে দেখব, কী করা যায়। একটা সময় পর্যন্ত সহ্য করছি! এর পরে ব্যবস্থা নেব।”
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দুর জেলা পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরি, ভগবানপুর, মহিষাদলেও বিজেপির প্রার্থী-অসন্তোষ সামনে এসেছে। শুভেন্দু এ দিন দুপুরে মহিষাদলে বিজেপির জেলা নেতা বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত, মহিষাদল থেকে সুভাষ পাঁজাকে প্রার্থী করায় জেলা কমিটি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন বিশ্বনাথ। শুভেন্দু বলেছেন, “উনি (বিশ্বনাথ) প্রার্থী হবেন বলে আশাবাদী ছিলেন। না হওয়ায় দুঃখ পেয়েছেন। সেই সুযোগে মহিষাদল থানার ওসি ও তৃণমূলের নেতা ওয়টস্যাপে ফোন করে ওঁকে তৃণমূলে যোগ দিতে বলেছেন। তবে কাল থেকে বিশ্বনাথ ও সুভাষ এক সঙ্গে প্রচার করবেন।” পরে মহিষাদল থানায় গিয়ে পূর্ব মেদিনীপুরে ‘অন্য রকম ভোট’ করাবেন বলে দাবি করেছেন শুভেন্দু। এরই মধ্যে বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের স্ত্রী, প্রার্থী-প্রত্যাশী রিঙ্কু মজুমদার প্রশ্ন তুলেছেন, “যদি অধিকারী ও সিংহ (অর্জুন) পরিবার থেকে একাধিক প্রার্থী হতে পারেন, তা হলে আমি কেন নই?”
এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষের কটাক্ষ, “বিজেপি প্রার্থীদের দলের কর্মীরাই বিশ্বাস করেন না। দিকে দিকে বিজেপির পরিবারবাদ, আদি বনাম তৎকাল, কোন্দলের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।”
বিজেপির ‘মতুয়া-গড়’ বলে পরিচিত এলাতেও ‘অসন্তোষ’ সামনে এসেছে। অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক সুখেন্দ্রনাথ গায়েন বলেছেন, “সঙ্ঘাধিপতি শান্তনু ঠাকুরের মাধ্যমে মহাসঙ্ঘের সাংগঠনিক নেতৃত্বের মধ্যে থেকে কয়েক জনকে প্রার্থী করার জন্য বিজেপির কাছে আবেদন জানানো হয়েছিল। তা মানা হয়নি। এই বারে আমরা সাংগঠনিক ভাবে মতুয়াদের কিছু বলছি না। তাঁরা যাঁকে খুশি ভোট দেবেন!’’ বনগাঁ উত্তর ও দক্ষিণের দুই বিধায়ক, এ বারেও বিজেপি প্রার্থী যথাক্রমে অশোক কীর্তনিয়া, স্বপন মজুমদারেরা ‘মতুয়া সেজেছেন’ বলেও অভিযোগ করেছেন সুখেন্দ্রনাথ। যদিও অশোক বলেছেন, “গত লোকসভা ভোটে শান্তনু ঠাকুরের হয়ে প্রচার করার সময়ে মনে হয়নি, আমি মতুয়া নই?” স্বপনের প্রতিক্রিয়া, “সুখেন্দ্রনাথ ভোটে দাঁড়াতে ও টিকিট বিক্রি করে টাকা কামাতে চেয়েছিলেন। পাননি বলে বিজেপিকে ‘ব্ল্যাকমেল’ করতে চাইছেন।” নদিয়ার রানাঘাট দক্ষিণ, জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ির দুই বিধায়ককে নিয়ে অসন্তোষ সামনে এসেছে। রানাঘাটে জেলা দফতরের সামনে বিক্ষোভ, টায়ার জ্বালিয়ে জাতীয় সড়ক অবরোধ, ময়নাগুড়িতে জেলা নেতৃত্বকে তালা বন্ধ করে রাখার ঘটনা ঘটেছে। নাগরাকাটা, জলপাইগুড়ি সদর, হরিণঘাটা, কাটোয়া, কালনা, আলিপুরদুয়ার, বারাসত, বড়ঞা, খড়গ্রাম, ফরাক্কা, বলাগড়, সাঁকরাইল, চাকুলিয়া, করণদিঘির মতো নানা জায়গাতেও হয়েছে প্রার্থী-বিক্ষোভ।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক অবশ্য বলেছেন, “অভিমান, আবেগ থাকবে। এটাই প্রমাণ করছে, একটা দল যখন সমাজের সব স্তরের মানুষকে নিয়ে লড়তে চাইছে, তখন চিকিৎসক থেকে শুরু করে গৃহবধূ, সবাই বিজেপির প্রার্থী হতে চাইছেন। একমাত্র লক্ষ্য, এক জোট হয়ে তৃণমূলকে হারানো।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)