যাদবপুরের উপচার্য ত্রিগুণা সেন দেশের শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভোটে হারিয়ে বিখ্যাত, ইংরেজির বিশিষ্ট অধ্যাপিকা মালিনী ভট্টাচার্যও সিপিএমের সাংসদ হন। সেই বাম না থাকলেও, যাদবপুর আছে যাদবপুরেই। নানা বাম মতাদর্শের মেলামেশার পরিসর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতির ঝাঁঝটি ফিকে হয়নি। দেশের এক নম্বর রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয় যাদবপুরের ডাকসাইটে অধ্যাপক, শিক্ষক নেতা বা গবেষক থেকে প্রাক্তনী, অনেকেই এ ভোটেও আকর্ষক চরিত্র হয়ে উঠেছেন।
আফরিন বেগম। —নিজস্ব চিত্র।
অনেকে অবশ্য বলছেন, লড়লেও মহাভারতের কর্ণের মতো পরাজয়ই বামেদের ভবিতব্য। কিন্তু, বালিগঞ্জের সিপিএম প্রার্থী আফরিন বেগম ওরফে শিল্পীর সপ্রতিভ, সতেজ উপস্থিতি অনেক নৈরাশ্যবাদীকেও স্বপ্ন দেখাচ্ছে। সমাজমাধ্যমে শঙ্খ ঘোষের কবিতার আশাবাদ মেলে ধরেছেন যাদবপুরের ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা এই নবীনা। ‘আবার সুখের মাঠ জলভরা / আবার দুঃখের ধান ভরে যায়/ এমন বৃষ্টির দিন মনে পড়ে/ আমার জন্মের কোনও শেষ নেই!’
শিক্ষাতত্ত্বের গবেষক, ২৯ বছরের আফরিন বলছেন, “আমাদের অস্তিত্ব নস্যাৎ করা হলেও আমরাই গরিব, খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার নিয়ে লড়ছি। বিজেপি, তৃণমূলের প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা বা গরিব সংখ্যালঘুকে এসআইআরের নামে বেনাগরিক করার চেষ্টার বিরুদ্ধে বাম শক্তিই সত্যিকারের ভরসা।”
বালিগঞ্জ এলাকার মেয়ে আফরিনের বাবার বেকবাগানে চা-পাতার পুরনো দোকান। তারকেশ্বরের কাছের গ্রামের পরিবারটি অনেক দশক কলকাতার সঙ্গে জড়িয়ে। যাদবপুরে পাঁচ বছর দর্শনের পাঠ নিয়ে এখন শিক্ষাতত্ত্ব বিভাগের গবেষক নিজের নির্মাণের জন্য কৃতজ্ঞ মাস্টারমশাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের দাদা-দিদিদের কাছে। বলছেন, “আমি ভোটে লড়ছি শুনে আমার গাইড স্যরও দু’মাসের ছুটি দিয়ে মন দিয়ে লড়াইটা লড়তে বলেছেন!”
পার্থপ্রতিম বিশ্বাস। —নিজস্ব চিত্র।
টালিগঞ্জের সিপিএম প্রার্থী, পেশায় কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক পার্থপ্রতিম বিশ্বাসও গত চার দশক ধরে পুরোপুরি ‘মেড ইন যাদবপুর’। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকারের জন্য জুটা-র লড়াকু শিক্ষক নেতা তিনি। ২০০৬ এবং ২০১১-য় টালিগঞ্জে ওজনদার অরূপ বিশ্বাসের কাছে হারলেও ২০২৬-এ প্রার্থী হিসেবে তাঁরই প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। পার্থ বলছেন, “২০১১-য় আমরা ক্ষয়িষ্ণু শক্তি ছিলাম। এ বার তৃণমূলই ক্ষয়িষ্ণু, শেষ মুহূর্তে অস্থির হয়ে নতুন ভাতা দিচ্ছে। বিজেপিও ২০১৯-এর পর থেকে পিছু হটছে।” বালিগঞ্জে গত উপনির্বাচন থেকে কিছুটা উলটপুরাণেই বামেরা দু’নম্বরে উঠে আসে। আর টালিগঞ্জ একটি ব্যতিক্রমী কেন্দ্র। যেখানে ২০২১ সালেও জারি ছিল ত্রিমুখী লড়াই।
মানস ঘোষ। —নিজস্ব চিত্র।
রাসবিহারী কেন্দ্রের বাম সমর্থিত সিপিআই (এম এল) প্রার্থী, যাদবপুরের আর এক অধ্যাপক চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগের মানস ঘোষের লড়াইটা অনেকেই তুলনায় আরও কঠিন বা দুঃসাধ্য বলে ধরছেন। এক বার অশোক মিত্র ছাড়া কোনও বাম প্রার্থীই কখনও রাসবিহারীতে সুবিধা করতে পারেননি। কিন্তু বর্ণময় ব্যক্তিত্ব মানসের সম্মোহন একটু আলাদাও। নাগরিকত্ব বিরোধী গণআন্দোলন, বিহারের ভোট থেকে রাহুল গান্ধীর ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’, সংবিধান রক্ষার যে কোনও আন্দোলনে তিনি আছেন। মানসের স্পষ্ট মত, “তৃণমূলের জনমোহিনী দক্ষিণপন্থা নয়, বাম ঐক্যই বিজেপির বিরুদ্ধে দেশ বাঁচানোর লড়াই।”
শ্রীরামপুরের তৃণমূল প্রার্থী তন্ময় ঘোষও কিন্তু গণআন্দোলনের কর্মী এবং যাদবপুরে ২০০৩-এর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রাক্তনী। তিনি আবার মনে করেন, সংসদীয় পথে বিজেপির বিরুদ্ধে সাংবিধানিক আদর্শ ও ধর্মনিরপেক্ষতার লড়াইয়ে তৃণমূলের রাজনীতিই পথ।
বিজেপির চোখে, ‘‘যাদবপুর মানেই শহুরে নকশাল বা দেশ বিরোধী। রাবণের দশ মাথার মতো বিজেপির বিরুদ্ধে এককাট্টা।’’ দেশের ঘা-খাওয়া মানুষের জন্য আওয়াজ তবু যাদবপুর থেকে উঠছে। এসআইআরে দেশবাসীকে বেনাগরিক করা নিয়ে যাদবপুরের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তনী লাবণী জঙ্গীর একটি তথ্যচিত্র সদ্য শিক্ষাঙ্গনে দেখানো হয়েছে। লাবণীও কৃষ্ণনগর দক্ষিণ কেন্দ্রে বাম সমর্থিত সিপিআই (এম এল) প্রার্থী।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)