নির্বাচনে একটি ভোটের গায়ে লেখা থাকে না, তা পুরুষের না নারীর, হিন্দুর না মুসলমানের, ধনীর না দরিদ্রের। এটাই গণতন্ত্রের জৌলুস। মানবিক সংবিধানের সৌন্দর্য।
রাজ্যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়েছে। শুরু হবে প্রচার। তার পরে গণতন্ত্রের ‘ভোট-উৎসব’। ইতিহাস সাক্ষী, তা দেশের সিদ্ধান্ত হোক আর বাড়ির, নারীর প্রতিনিধিত্ব আজও অনেকাংশেই ছায়ার মতো। নির্বাচনের সময় প্রায়ই দেখা যায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মহিলাদের প্রার্থী করছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিসরে নারীদের প্রতিনিধিত্ব কম ছিল। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, কাগজে-কলমে প্রতিনিধিত্ব বাড়লেও তা কতটা কার্যকর, আর কতটা প্রতীকি?
গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে পুরসভা বা বিধানসভা, বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, নারী প্রার্থী নির্বাচিত হলেও প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁরা প্রায়শই আড়ালে চলে যান। সামনে থাকে তাঁদের অন্য পরিচয়, অমুকের স্ত্রী, অমুকের কন্যা বা অমুকের বোন। ক্ষমতার আসল নিয়ন্ত্রণ থাকে পরিবারের পুরুষ সদস্য বা দলের স্থানীয় পুরুষ নেতাদের হাতে। ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে নারী-ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়, তা অনেক সময়ই হয়ে ওঠে ‘প্রক্সি রাজনীতি’র আরও এক নাম। এই প্রবণতা নতুন নয়।
কোথাও কোথাও নারী প্রার্থীদের জন্য আসন সংরক্ষিত থাকার ফলে, বহু নারী প্রথম বার রাজনৈতিক পরিসরে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছেন। এটি অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি। কিন্তু সেই সুযোগ কার্যকর ক্ষমতায় রূপান্তরিত করার জন্য যে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিকাঠামো প্রয়োজন, তা অধিকাংশ জায়গাতেই তৈরি হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই নারী প্রতিনিধিরা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীন ভূমিকা নিতে পারেন না।
তবে এই ছবির মধ্যে অন্য বাস্তবতাও রয়েছে। অনেক নারী জনপ্রতিনিধি আছেন, যাঁরা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁরা প্রমাণ করেছেন, সুযোগ ও প্রশিক্ষণ পেলে নারীরাও সমান দক্ষতার সঙ্গে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন। সমস্যা নারীর সক্ষমতায় নয়, সমস্যা সেই সামাজিক মানসিকতায়, যা এখনও নারীর রাজনৈতিক উপস্থিতিকে সন্দেহের চোখে দেখে।
অতএব প্রশ্নটি শুধু নারীদের প্রার্থী করা নিয়ে নয়, বরং তাঁদের প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিয়ে। রাজনৈতিক দলগুলির দায়িত্ব শুধু প্রার্থী ঘোষণা করা নয়, তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসরে সক্রিয় ভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। পাশাপাশি প্রয়োজন রাজনৈতিক শিক্ষা, প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক স্বীকৃতি।
মুখে যতই নারী ক্ষমতায়নের কথা বলা হোক, আমাদের সমাজব্যবস্থা আজও ‘ক্ষমতা’ ও ‘নারী’ দু’টি শব্দকে পাশাপাশি গ্রহণে সক্ষম নয়। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ‘ক্ষমতাবান নারী’ মানেই ব্যাঁকা চোখে তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা হবে। সমান অধিকারের প্রশ্ন তো শুধু মৌখিক বা কাগুজে অক্ষর হয়ে থাকতে পারে না, তার বাস্তবিক প্রয়োগ চাই। নারীকে তার সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়ার স্বাধীনতা দিতে হবে। তবেই সমান অধিকার বা পুরুষতন্ত্রের থাবার নিচে আটকে পড়া নারী, মুক্ত আকাশের কল্পনা করতে পারবে।
গণতন্ত্র তখনই পূর্ণতা পায়, যখন প্রতিনিধিত্ব শুধু প্রতীকি স্থানে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব ক্ষমতায় রূপ নেয়। নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণও সেই পথে এগোলে পুরুষতান্ত্রিকতার আস্ফালন থেকে বেরিয়ে একটি সুষম সমাজব্যবস্থার চিত্র আঁকা যেতে পারে। অন্যথায় নির্বাচনের ময়দানে নারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়লেও, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পুরুষতন্ত্রের আধিপত্য অটুটই থেকে যাবে।
সংস্কৃতি কর্মী, জলপাইগুড়ি
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)