E-Paper

জোটেনি শ্রমিকের স্বীকৃতি, ভোটের আলোয় আজও ম্লান গৃহকর্মীদের ভবিষ্যৎ

আরও একটি নির্বাচনের আগে উঠে আসছে এ রাজ্যের গৃহসহায়িকা ও পরিচারিকাদের প্রতি অন্যায়, বঞ্চনা, অসম্মানের এমনই নানা দিক। তাঁদের দীর্ঘ দিনের বিভিন্ন দাবির পূরণ না হওয়া আসন্ন নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে কিনা, তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ২১ মার্চ ২০২৬ ০৮:৩৩

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

কখনও টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে আভেনে বসানো দুধ উথলে ওঠার জন্য! কখনও কাজ হারাতে হয়েছে ফ্ল্যাটের শৌচাগার ব্যবহার করার ‘অপরাধে’। কখনও আবার ছাঁটাই হতে হয়েছে অসুস্থ থাকায় তিন দিন কাজে যেতে না পারায়। গৃহকর্তা বলে দিয়েছেন, ‘‘শরীর খারাপ এক দিনের বেশি হতে পারে না।’’ বাড়িতে কিছু পাওয়া না গেলে বা টাকাপয়সা কোনও কারণে খুঁজে না পেলে থানায় নিয়ে গিয়ে বসিয়ে রাখার ঘটনা অসংখ্য।

আরও একটি নির্বাচনের আগে উঠে আসছে এ রাজ্যের গৃহসহায়িকা ও পরিচারিকাদের প্রতি অন্যায়, বঞ্চনা, অসম্মানের এমনই নানা দিক। তাঁদের দীর্ঘ দিনের বিভিন্ন দাবির পূরণ না হওয়া আসন্ন নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে কিনা, তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। অভিযোগ, অন্যায়ের শিকার হয়ে পুলিশে গেলেও সুরাহা হয় না। কারণ, এমন কাজের চুক্তিপত্র থাকে না। ফলে, প্রমাণ করা যায় না যে, চুক্তিভঙ্গ হয়েছে। দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পরেও সরকার কিছু করে না বলে অভিযোগ। শ্রমিক হিসাবে মর্যাদাই দেওয়া হয় না গৃহসহায়িকা, পরিচারিকাদের। সেই সূত্রেই চালু করা হয়নি গৃহসহায়িকা, পরিচারিকাদের ন্যূনতম মজুরি। অথচ, কেরল, তামিলনাড়ু, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশার মতো একাধিক রাজ্যে গৃহশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা হয়েছে। কেরল-সহ চারটি রাজ্যে গৃহশ্রমিকদের কল্যাণ পর্ষদও চালু হয়েছে। শুরু হয়েছে পেনশন প্রকল্প। কিন্তু এ রাজ্যে গৃহশ্রমিকদের ক্ষেত্রে নিশ্চিত হয়নি স্বাস্থ্যের সুরক্ষা। মেলে না পেনশন, মাতৃত্বের ছুটি বা সন্তানকে ক্রেশে রেখে কাজে যাওয়ার সুযোগ। অধরা থেকে যায় বৈধ ঠিকানাও। কারণ, এমন গৃহশ্রমিকদের বসবাসের অধিকাংশ বস্তিই অবৈধ। যাঁরা শহরের বাড়িগুলি সচল রাখেন, তাঁরাই আজীবন গৃহহীন হওয়ার ভয়ে থেকে যান।

যদিও নব দত্তের মতো শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের দাবি, এ রাজ্যে কর্মরত মেয়েদের বৃহত্তম গোষ্ঠী হল গৃহশ্রমিক মেয়েরা। শিল্প, কৃষি ও খনিতে নিয়োগ যত কমেছে, তত ভিড় বেড়েছে গৃহশ্রমে। কেন্দ্রীয় ই-শ্রম পোর্টালেই এ রাজ্যের ৫২ লক্ষ গৃহশ্রমিকের নাম উঠেছে। গোটা দেশে সংখ্যাটা প্রায় পাঁচ কোটি। দেশের অন্য কোথাও পশ্চিমবঙ্গের মতো গৃহশ্রমিকের কাজের উপরে নির্ভরতা নেই বলে তাঁদের দাবি। তবু ‘আধুনিক’, ‘প্রগতিশীল’ অনেক পরিবারেই গৃহসহায়িকাকে সোফা বা খাওয়ার টেবিলে বসতে দেওয়া হয় না। তাঁরা মেঝেতে বসেন, আলাদা থালা-বাসনে খান। আবাসনে বাবুদের লিফ্‌টেও তাঁদের ওঠা বারণ। পাশাপাশি বসে পুজোর ভোগ খাওয়ারও সুযোগ হয় না। শৌচাগারে গিয়ে জলের কল খুলে রেখে শৌচকর্ম সারতে হয়, যাতে ধরা পড়ে যেতে না হয়!

‘পশ্চিমবঙ্গ গৃহ পরিচারিকা সমিতি’র সদস্যদের দাবি, ‘‘আমরা ঝি নই, দাসী নই, ন্যূনতম মজুরির শিডিউলে অন্তর্ভুক্ত হতে চাই।’’ সংগঠনের সদস্যা স্বপ্না ত্রিপাঠী বললেন, ‘‘তবু কোনও সরকারই আমাদের শ্রমিক বলে মানতে রাজি হয় না। ইউনিয়ন-বদ্ধ শ্রমিক না হলে শ্রম দফতর কথা বলে না। তাই বহু চেষ্টা করে ২০১৮ সালে একটি ইউনিয়ন নথিভুক্ত করেছি। এখন ইউনিয়নের নবীকরণ করা হচ্ছে না। শ্রম কমিশনে দরবার করে ন্যূনতম মজুরি ঠিক করার কমিটি তৈরি করানো গিয়েছিল। ঘণ্টা-প্রতি মজুরি নির্ধারণ করার ফর্মুলাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তার পরে আর কিছু হয়নি। উল্টে, এক মন্ত্রী বলে দিয়েছেন, তোমাদের নিয়ে কিছু করলে ঘরে ঘরে মানুষ বিরুদ্ধে চলে যাবে। তার চেয়ে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে নাম লেখাও।’’ স্বপ্নার প্রশ্ন, টাকা হয়তো কিছু পাওয়া যাবে। কিন্তু অসংগঠিত ক্ষেত্রের এই লক্ষ লক্ষ মেয়ের শ্রমিক পরিচয়টা কি থাকবে? ‘পশ্চিমবঙ্গ গৃহ পরিচারিকা সমিতি’র সম্পাদক বিভা নস্করের মন্তব্য, ‘‘শ্রমিকের স্বীকৃতি না দিলে অধিকারের দাবি তোলার জমিটাই তো থাকে না। যে অ-সুরক্ষার বিপুলতার মধ্যে দিন কাটাতে হয়, সেখানে সামাজিক সুরক্ষার কয়েকশো টাকা কতটুকু?’’

অনলাইন সংস্থায় তো নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকে কাজের সুযোগ মিলছে? পরিচারিকা, গৃহসহায়িকাদের বড় অংশেরই দাবি, ‘‘ঘণ্টার হিসাবে কাজ করানোর নামে যে টাকা সংস্থাগুলি কেটে নিচ্ছে, তার উপরে সরকারেরই নিয়ন্ত্রণ নেই। অনলাইন সংস্থার বঞ্চনায় ভুগছেন অ্যাপ-নির্ভব বাইক, গাড়ির চালকেরা। পরিচারিকারা সেই তালিকাতেই যুক্ত হচ্ছেন।’’

ভোটের বাজারে কি তবে সুরাহার কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না? শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের কর্মী নব বললেন, ‘‘ভোটার মধ্যবিত্ত হোন বা বিত্তবান— সরকার কারও সমর্থন হারাতে চায় না। তাই গৃহশ্রমিকের দাবি মানা হয় না। গরিবের সংখ্যা হয়তো বেশি, কিন্তু বঙ্গ-রাজনীতিতে মধ্যবিত্তের প্রভাব তার চেয়েও বেশি।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Domestic Help West Bengal Assembly Election Domestic Workers

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy