পাঁচ কিলোমিটার হনহনিয়ে হেঁটে এসে চপারে উঠে বসে গিয়েছেন দলনেত্রী। ততক্ষণে হাঁফাতে হাঁফাতে গলদঘর্ম হয়ে উল্লাস ময়দানে ঢুকলেন দলের জেলা সভাপতি (গ্রামীণ) স্বপন দেবনাথ। তাঁর পিছনে বর্ধমান দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী রবিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় ও বর্ধমান উত্তরের প্রার্থী নিশীথ মালিক। তাঁদের অবশ্য দাঁড়িয়ে থাকার মতো ক্ষমতাও ছিল না। অনেক নেতা-কর্মী আবার মাঝপথেই কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন।
সোমবার বিকেলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদযাত্রার কথা আগেই জানতেন শহরবাসী। জানতেন জেলার বিভিন্ন প্রান্তের নেতারাও। ফলে দুপুর থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পা মেলানোর জন্য ভিড় জমিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু মাঠে নেমে দেখা গেল, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের দম ফুরিয়ে যাওয়ার জোগাড়। শেষমেশ, অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, মুখ্যমন্ত্রী হাঁটলেন, বাকিরা সব দৌড়লেন। মিঠিলে হাঁটতে হাঁটতেই বর্ধমানের পর্যবেক্ষক অরূপ বিশ্বাস এক গাল হেসে বলেন, “বর্ধমান গ্রামীণের ১৬টা আসনেই আমাদের জয় নিশ্চিত হয়ে গেল।”
এ দিন সকাল থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর পদযাত্রাকে ঘিরে বর্ধমান শহর সেজে উঠেছিল। পুরসভার কাছে স্পন্দন মাঠ থেকে জিটি রোড ধরে উল্লাস ময়দান পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তায় হাঁটলেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাস্তার দু’ধারে বিভিন্ন জায়গায় সকাল থেকে মাইকে প্রচারের গান বাজাচ্ছিলেন তৃণমূল কর্মীরা। কোথাও ব্যান্ড বাজছিল। দুপুরের পর থেকেই বর্ধমান শহর ছাড়াও বিভিন্ন এলাকা থেকে গাড়ি করে দলীয় কর্মীরা স্টেশন এলাকায় জড়ো হচ্ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীকে দেখতে স্থানীয় মানুষও রাস্তার দু’ধারে ভিড় জমাতে শুরু করেন। রাস্তার বিভিন্ন বাড়ির ছাদে সকাল থেকে পুলিশ মোতায়েন করে রাখা ছিল। নীল-সাদা বেলুন, শঙ্খ বাজিয়েও নেত্রীকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ছিলেন অনেকে।
সোমবার কেতুগ্রামের মুড়গ্রাম-গোপালপুর অঞ্চলে তৃণমূল প্রার্থী শেখ সাহানেওয়াজের সমর্থনে প্রচারে আসেন বেশ কয়েকজন তারকা। ছবি: অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়।
পান্ডুয়া, মেমারি সভা শেষ করে ৪টে ২০ মিনিট নাগাদ মুখ্যমন্ত্রীর চপার নামে। সেখানে দাঁড়িয়েছিলেন অরূপ বিশ্বাস, স্বপন দেবনাথ, আসানসোল দক্ষিণের প্রার্থী তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়, বর্ধমান-দুর্গাপুরের সাংসদ মমতাজ সঙ্ঘমিতা, বর্ধমান পূর্বের সাংসদ সুনীল মণ্ডলেরা। এঁদের সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় নেতা উত্তম সেনগুপ্ত, খোকন দাস, গোলাম জার্জিস, প্রসেনজিৎ দাসেরাও। চপার থেকে নেমেই সটান জিটি রোডে চলে আসেন তৃণমূল নেত্রী। সেখানে একটি গাড়ি নীল-সাদা বেলুন দিয়ে সাজানো ছিল। কিন্তু সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে তিনি হাঁটা শুরু করে দেন দ্রুত গতিতে। পুলিশ আগে থেকেই দড়ি দিয়ে রাস্তার দু’ধার ব্যারিকেড করে দিয়েছিল।
প্রথম থেকেই তৃণমূল নেত্রী এত দ্রুত হাঁটছিলেন যে, সামনে থাকা সাংবাদিক,নেতাদের বারবার ঠেলতে বাধ্য হচ্ছিলেন পুলিশের কর্তারা। অরূপ বিশ্বাসকেও দেখা গিয়েছে রাস্তা থেকে লোকজনকে সরিয়ে দিতে। এর মধ্যেই দিদি হাঁটার গতি শ্লথ করে দেন পার্কাস মোড়ের কাছে। সেখানে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের সঙ্গে হাত মেলান। ফের হাঁটা শুরু হয়। কার্জন গেটের কাছেও দাঁড়িয়ে হাত মেলান, ছাদে থাকা লোকজনের উদ্দেশে হাত নাড়েন। তারপর গোটা রাস্তা জুড়ে কখনও হাত নেড়েছেন, তো কখনও হাত মিলিয়েছেন। অনেকে আবার ব্যারিকেড টপকে দিদির কাছে গিয়ে প্রণাম করেছেন, কেউ কেউ ফুল ছুড়েছেন। এক তরুণী তো রীতিমতো পুলিশ, নেতাদের, ব্যারিকেড টপকে দিদির কাছে পৌঁছে একটি খাম তুলে দেন। সেই খাম হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন মুখ্যমন্ত্রী। তারপর ব্যারিকেডের কাছে গিয়ে বেশ কয়েকজন তরুণীর সঙ্গে কথাও বলেন। গোটা রাস্তা জুড়ে মুখ্যমন্ত্রীর মুখে হাসি আর নমস্কার করতে করতে গিয়েছেন। ব্যারিকেডের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন, “কেমন আছেন? ভাল তো?” তবে রাস্তা যত এগিয়েছে, তাঁর সঙ্গে পদযাত্রা শুরু করা নেতাদের আর দেখা যায়নি। যাঁরা শেষ পর্যন্ত ছিলেন, গলদঘর্ম হয়ে তাঁদের মুখ শুকিয়ে গিয়েছে।
মিছিল শুরু হওয়ার পর থেকে ভিড় সামলাতে কার্যত হিমসিম খেতে হয়েছে পুলিশ সুপার গৌরব শর্মা ও অন্যান্য আধিকারিকদের। রাস্তা দিয়ে বারেবারে ছুটতে দেখা গিয়েছে পুলিশ সুপারকে। তবে শেষ পর্যন্ত কোনও রকম অশান্তি ছাড়াই পদযাত্রা শেষ হওয়ায় স্বস্তি পেয়েছেন পুলিশ কর্তারা। সে জন্য মুখ্যমন্ত্রী চপারে উঠতেই পুলিশ সুপারকে এক একজন আধিকারিকের দিকে হাত বাড়িয়ে বলতে শওনা যায় ‘ওয়েল ডান’।
তবে এত কিছুর মধ্যেও কাঁটা কিন্তু রয়েই গিয়েছে। মিছিলের মাঝেই তৃণমূলের এক নেতা হাঁফাতে হাঁফাতে বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী রাস্তায়। কিন্তু নীলপুরের পর রাস্তার দু’ধারে লোকসংখ্যা কিন্তু আশানুরূপ ছিল না। এটা কিন্তু চিন্তার ব্যাপার।” আবার দিদির সঙ্গে হাঁটতে গিয়ে নেতারা দম হারিয়ে ফেলায় রাস্তার দু’ধার থেকে শোনা গিয়েছে, “ক্ষমতা পেয়ে ভাইয়েরা গাড়ি ছাড়া কোথাও যান না, তাই দিদির সঙ্গে হাঁটতে পারছেন না।”
মুখ্যমন্ত্রীর পদযাত্রাকে কটাক্ষ করে সিপিএমের জেলা কমিটির সম্পাদক অচিন্ত্য মল্লিক অবশ্য বলেন, “মানুষ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন বুঝতে পেরেই তিনি পদযাত্রা করছেন। তাতে লাভ কিছু হবে না।”