ওটিতে তখন দু’-দু’টি অস্ত্রোপচার চলছে। আচমকা ভিতরে ঢুকে এলেন চার-পাঁচ জন। হতভম্ব চিকিৎসক ও রোগীদের সামনে আঙুল তুলে চিৎকার করে হুমকি দিতে লাগলেন, ‘‘কেন ফর্টিস হাসপাতালে রোগী পাঠাচ্ছেন না? কোনও পরিষেবা নেই সরকারি হাসপাতালে। ভুল চিকিৎসা হয়। ভুল পরীক্ষা হয়। ফর্টিসে রোগী পাঠাতে হবে!’’ বলতে বলতেই ওটি-র যন্ত্রপাতি টানাটানি শুরু করেন তাঁরা। ততক্ষণে ধাতস্থ হয়ে চিকিৎসকেরা রুখে দাঁড়িয়েছেন। শুরু হয়েছে বচসা।

ঘটনার ভিডিও ফুটেজ-সহ ভবানীপুর থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন পিজি-র দাঁতের বিভাগের চিকিৎসকেরা। ৩ মার্চ জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে তাঁরা লিখেছেন— ‘কর্পোরেট হাসপাতালের গুণ্ডাবাহিনীর হাত থেকে আমাদের বাঁচান। যখন-তখন ওরা বিভাগে চড়াও হচ্ছে, হুমকি দিচ্ছে। এমনকী, চিকিৎসকদের ফোন করেও লাগাতার ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’’

পুলিশ সূত্রের খবর, ভিডিওতে যাঁদের দেখা যাচ্ছে, খোঁজ চলছে তাঁদের। দেখা গিয়েছে, এক জন হামলাকারী নিজেকে জনৈক চিকিৎসক এস রায় বলে পরিচয় দিচ্ছেন। জানাচ্ছেন, তিনি ফর্টিস-এর চিকিৎসক। সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে তিনিই পিজি-র চিকিৎসকদের হুমকি দিয়ে রোগীদের ফর্টিসে রেফার করতে বলছেন। যখন পিজি-র এক জন জানাচ্ছেন, তাঁরা কর্পোরেট হাসপাতালে রোগী রেফার করতে পারেন না, তখন সেই ব্যক্তি তাঁর উদ্দেশে গালিগালাজও করছেন।

আরও পড়ুন:  শুধরে নেওয়া হবে, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বললেন অ্যাপোলো-কর্ত্রী

২২ ফেব্রুয়ারি টাউন হলে বেসরকারি হাসপাতালের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকের পরেও এই ধরনের ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে পিজি এবং স্বাস্থ্য দফতরে। ইতিমধ্যে কর্পোরেট হাসপাতালের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলির বিচারের জন্য সরকার হেল্‌থ রেগুলেটরি কমিশনও গড়েছে। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর, কমিশন কাজ শুরু করলেই এই ঘটনাটি সেখানে রেফারের কথা ভাবা হচ্ছে।

যদিও ফর্টিস কর্তৃপক্ষের দাবি, ঘটনার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নেই। হাসপাতালের মুখপাত্রের কথায়, ‘‘সরকারি হাসপাতাল থেকে আমরা কেন রোগী চাইব? এটা ষড়যন্ত্র। কেউ আমাদের নাম খারাপ করার জন্য এ রকম করছে।’’ আরও দাবি, ফুটেজে এস রায় নামে যে ‘চিকিৎসককে’ দেখা গিয়েছে, এমন কেউ তাঁদের হাসপাতালের সঙ্গে জড়িতই নন।

পিজি-র দাঁতের বিভাগের চিকিৎসকেদের আবার অন্য রকম দাবি। তাঁরা বলছেন, বেশ কয়েক বছর ধরে তাঁদের বিভাগ থেকে কর্পোরেট হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগী ভাঙিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি চক্র কাজ করছিল। তাতে পিজি-র কিছু লোকও জড়িত ছিল‌। এক চিকিৎসকের কথায়, ‘‘সেই চক্র এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, তাঁরা দাঁতের গোটা বিভাগকে নড়বড়ে করে রেখেছিল। অস্ত্রোপচারের দামি চেয়ার ফেলে রাখা হয়েছিল। দুর্ঘটনা বা চোট সংক্রান্ত ক্ষত, ক্যানসারের ক্ষতের অস্ত্রোপচার এখানে হতোই না। দালাল মারফত সেই কেসগুলি এখানকার আউটডোর থেকে কর্পোরেট হাসপাতালে পৌঁছে যেত।’’

এই বছরের শুরুতে চিকিৎসকদের একাংশ এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। প্রতিবাদের মুখে কর্তৃপক্ষ বিভাগীয় প্রধানকেই বদলি করে দেন। তার পর থেকে এই বিভাগে জটিল সার্জারিও শুরু হয়েছে। আগে যেখানে মাসে একটিও বড় সার্জারি হতো না, সেখানে ফেব্রুয়ারিতে ৩২টি সার্জারি হয়েছে। এর মধ্যে বড় সার্জারির সংখ্যা ১৩টি। দাঁতের চিকিৎসকদের বক্তব্য, এতদিন গড়ে ৩৫-৪০টি কেস তাঁদের বিভাগ থেকে কর্পোরেট হাসপাতালে যেত, সেটা কমেছে। তাই সন্দেহ, কর্পোরেট হাসপাতালের নিযুক্ত দালালেরাই এই ভাবে ভয় দেখাতে শুরু করেছে।