১, ২, ৩....২০, ২২, ২৪....

সংখ্যাটা বেড়েই চলেছে। সৌজন্যে, সাগরের ‘রেডিওয়ালারা’।

মেলা শুরুর পর থেকে ২৪ জন হারিয়ে যাওয়া মানুষকে খুঁজে বের করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরেছেন তাঁরা। গত কয়েক বছর ধরেই এই কাজটা করে আসছে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাব’।

এ বার ৩৮ জন সদস্যের ভরসায় কাজে সাগরমেলার প্রান্তরে নেমে পড়েছেন তাঁরা। নীল রঙের টি শার্ট, তাতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা ‘হ্যাম’। সবার হাতে একটা করে ভিএইচএফ (ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি) ওয়াকিটকি। কচুবেড়িয়া, লট ৮, নামখানা, চেমাগুড়িতে হোগলা পাতার ঘরে হ্যাম রেডিওর কন্ট্রোল রুম। মূল কন্ট্রোল রুমটি গঙ্গাসাগরে প্রশাসনিক কার্যালয়ের পাশে। পুলিশ বা জেলা প্রশাসনের ওয়্যারলেস ব্যবস্থা গোটা গঙ্গাসাগর মেলা জুড়ে ঠিকমতো কাজ করে না কখনওই। ফলে কোথায় যানজট, কোথায় বেশি ভিড়, কোথায় কে আহত হল, জলের ট্যাঙ্ক ফাঁকা হল বা কল নষ্ট হয়ে আছে— এ সব তথ্যই প্রশাসন আর মেলা কমিটির কাছে দ্রুত পৌঁছচ্ছে হ্যাম রেডিও মারফত। যেহেতু মোবাইল পরিষেবাও এখানে দুর্বল, তাই বহু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক যোগাযোগেও সাহায্য করছে হ্যাম।  এই নিয়ে টানা ২৪ বছর!

চোখ যায়, যদ্দূর থিকথিকে ভিড়। বাঁশের খুঁটিতে অ্যালুমিনিয়ামের চোঙা। থেকে থেকে ঘোষণা হচ্ছে, ‘‘দেবদত্ত যোশী। বয়স ৫২। ঠিকানা মহেন্দ্রনগর নেপাল। গৌরী সোনি। বয়স ৬৫ জব্বলপুর মধ্যপ্রদেশ। চন্দন পান্ডে। বয়স ৬৫ ধানবাদ ঝাড়খন্ড...।’’ চোঙার আওয়াজ ভিড়ে মিশে যায়, হারিয়ে যাওয়া লোকগুলোর মতোই।

প্রতি বছর গঙ্গাসাগর মেলায় পূণ্য অর্জনে এসে হারিয়ে যান বহু মানুষ। কখনও সংখ্যাটা পাঁচশো, কখনও তারও বেশি। পুলিশ-প্রশাসন, মেলা কমিটির অনুসন্ধান কেন্দ্রে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকেন কেউ কেউ। কেউ আবার দিকভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ান। কার অত সময় আছে নাকি জনে জনে মানুষ খোঁজার!

কিন্তু ওঁরা খোঁজেন। বাতাসে ইথার তরঙ্গে ভর করে রেডিও ক্লাবের সদস্যেরা মেলা শুরুর দিন থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোকে খুঁজে বের করেন। নেহাতই স্বেচ্ছাশ্রম, শখের রেডিওর ব্যবহারের নেশা থেকে।

নেপাল ভূমিকম্প, হুদহুদ, আয়লার মতো অনেক বিপর্যয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছেন এই শখের রেডিও অপারেটররা। নিজেদের তৈরি করা অ্যান্টেনায় বাতাসের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চ তরঙ্গে ভর করে কথা পৌঁছে যায় দূর থেকে দূরে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হ্যাম সদস্যদের কাছে। এরপরে হারানো মানুষকে খোঁজার কাজটা নেহাতই তাঁদের নজরদারি আর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব!

বাকি সব ক্ষেত্রে সরকারি স্বীকৃতি মিললেও গঙ্গাসাগরের এই স্বেচ্ছাশ্রমের কোনও স্বীকৃতি পাননি হ্যাম রেডিও এই স্বেচ্ছাকর্মীরা। ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাবের কর্তা অম্বরীশ নাগ বিশ্বাস বলেন, ‘‘এই ক’দিনের ২৪ জনকে তাঁদের পরিজনের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছি। যাঁদের বাড়ির লোকদের খোঁজ এখনও মিলছে না অথচ তাঁরা অসুস্থ, হাসপাতালে ভর্তি করানো হচ্ছে সেখানে অন্য কেউ দায়িত্ব নিতে না চাইলে আমাদের সদস্যেরা বন্ড সই করে তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করাচ্ছেন। কিন্তু প্রশাসন যদি তাঁদের সহযোগী হিসাবে আমাদের স্বীকৃতি দিত, তবে আরও উৎসাহ পেতাম।’’

দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসক পিবি সালিম বলেন, ‘‘এ বছর গঙ্গাসাগর মেলা অ্যাপ প্রথম চালু হল। পরের বছর থেকে নিশ্চয়ই এরকম স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার নাম অন্তর্ভূক্ত করার ব্যাপারটি আমরা দেখব।’’ কচুবেড়িয়া পুলিশ ক্যাম্পের দায়িত্বে রয়েছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার চন্দ্রশেখর বর্ধন। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা হ্যাম রেডিওর সদস্যদের কাছ থেকে যথেষ্ট সাহায্য পাচ্ছি। তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশের কাজ সহজ করে দিচ্ছেন।’’ এই স্বীকৃতি আর হারিয়ে ফেরা মানুষগুলোর আনন্দাশ্রু— এটুকুই পাথেয় রেডিওয়ালাদের।