সুলতানি আমলের টাঁড়ার খাজা নেই। হারিয়ে গিয়েছে মনোহরা। আধুনিকতার ধাক্কায় উধাও মনাক্কাও। কিন্তু সেই সুলতানি আমল থেকেই মালদহে এখনও দিব্যি রয়েছে রসকদম্ব। বাংলার মিষ্টি মেলায় কলকাতার রসগোল্লা কিংবা মুর্শিদাবাদের ছানাবড়াকে বরাবর টেক্কা দিয়েছে মালদহের এই মিষ্টি। সুলতানি আমলের রসকদম্বের কদর এখন রাজ্য, দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও।

পশ্চিমবঙ্গ রসগোল্লার পেটেন্ট পাওয়ার পর মালদহ যাতে রসকদম্বের পেটেন্ট পায় সেই দাবি উঠেছে মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী মহলে। দেখতে ঠিক কদম ফুলের মতো, তাই নাম রসকদম্ব। মিষ্টির ভেতরে ছোট্ট রসগোল্লা। ওপরে ক্ষীরের প্রলেপ। গায়ে জড়ানো পোস্ত মাখানো চিনি। পোস্তর দাম বেড়ে যাওয়ায় ইদানিং শুধু চিনির দানা ব্যবহার শুরু হয়েছে। মালদহের কোনও অনুষ্ঠানে রসকদম্ব থাকবে না এমনটা কেউ ভাবতেই পারে না। বন্ধু বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গেলে এই মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে যাওয়া এখানকার প্রথা। পুজো এবং অন্য সামাজিক অনুষ্ঠানে রসকদম্বের চাহিদা এতটাই বেড়ে যায় যে কারিগরদের ঘুম ছুটে যায়।

কথিত আছে প্রায় পাঁচশো বছর আগে সুলতান হোসেন শাহের আমলে প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড়ে পা রাখেন মহাপ্রভূ চৈতন্য দেব। গৌড়ের কেলি কদম্ব গাছের ছায়ায় দুই শিষ্য রূপ ও সনাতনকে দীক্ষা দেন তিনি। সেই কদম্ব গাছ থেকেই মালদহে রসকদম্ব মিষ্টির সূচনা বলে জনশ্রুতি।

আরও পড়ুন:

অনেক লড়াইয়ের পর রসগোল্লার স্বীকৃতি, খুশি বাংলা

বাসিন্দাদের দাবি, মালদহে সবচেয়ে পু্রানো মিষ্টি টাঁড়ার খাজা। ১৬০০ খ্রীস্টাব্দে প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড়ের শেষ সুলতান ছিলেন সুলেমান করবানি। করবানির বংশধরেরা রাজধানীকে টাঁড়ায় সরিয়ে নেন। সেই সময় জয়নগর থেকে এক মৌলবী টাঁড়ায় এসে খাজা তৈরি শুরু করেন। সুলতানি আমলের সেই খাজা এখন আর তৈরি হয় না। আঙুরের মতো দেখতে মনাক্কা মিষ্টিও নেই। নেই ছোট কুলের মতো দেখতে মনোহরাও। কিন্তু এখনও আছে শুধু রসকদম্ব। রসগোল্লা, চমচম, গোলাপজামুন, দিলখুশের ভিড়ে আজও সেরা মিষ্টি এই রসকদম্ব। নাম রসকদম্ব। কিন্ত রস নেই। স্বাদে অতুলনীয়।

দুধ এবং চিনি এই মিষ্টির প্রধান উপকরণ। মালদহ শহরের রাজমহল রোড কিংবা নেতাজি সুভাস রোড বা মনস্কামনা রোডের দু’ধারে প্রতিটি মিষ্টির দোকানে রসকদম্বের চাহিদা তুঙ্গে। এখনও অনেকেই বাজার সেরে বাড়িতে এক প্যাকেট রসকদম্ব নিয়ে যান। আট থেকে আশি- সবারই পছন্দের মিষ্টি। মালদহ জেলা সদরের রাজমহল রোডের এক প্রখ্যাত মিষ্টি দোকানের কর্ণধার সুবোধ কুণ্ডু বলেন, ‘‘রাজ্য মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের সম্মেলনে ও সভায় আমরা রসকদম্বের পেটেন্টের ব্যাপারে সরব হয়েছিলাম। কিন্তু পরে তা চাপা পড়ে যায়। রসগোল্লার পেটেন্ট এখন বাংলা পেল আমরা চাই রসকদম্বের পেটেন্ট মালদহ পাক।’’ মালদহ মার্চেন্টস চেম্বার অব কমার্সের সম্পাদক উজ্জ্বল সাহা বলেন, ‘‘মালদহ মানে যেমন আম, তেমনি মালদহের মিষ্টি মানে রসকদম্ব। সেই মিষ্টির পেটেন্ট পেতে মালদহ দাবি করবেই।’’ সাংসদ মৌসম নূরও বলেন,‘‘ রসকদম্ব মালদহেরই পেটেন্ট হওয়া উচিত।’’