আটটা বছর অতিক্রান্ত। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বিশ্বের প্রাচীনতম ক্রিয়াশীল গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ আসনে নিজের কার্যকাল শেষ করলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে তাঁর নির্বাচনটাই ছিল একটা সন্ধিক্ষণ। আধুনিক আমেরিকার ইতিহাস এক নতুন বাঁকে পৌঁছে গিয়েছিল সে দিন। আজও কিন্তু আমেরিকা আবার এক সন্ধিক্ষণে উপনীত। বারাক ওবামা হোয়াইট হাউজকে বিদায় জানাচ্ছেন বলে এ ক্ষণ এক উল্লেখযোগ্য সন্ধিক্ষণ, তা নয়। আসলে আট বছর আগে যে দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্ব মানবতার দিকে তাকিয়ে বারাক ওবামাকে প্রেসিডেন্ট পদে বেছে নিয়েছিল আমেরিকা, আজ ঠিক তার বিপ্রতীপ কোনও এক দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিশ্বের দিকে তাকিয়ে রয়েছে আমেরিকাবাসী, রায়ও দিয়েছে তার উপর দাঁড়িয়েই।

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অবশ্য বিদায়ের মুহূর্তেও সেই আট বছর আগের বারাক ওবামাই। জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণে বিশ্ব মানবতার উচ্চারণই শোনা গেল তাঁর কণ্ঠে। আর সেই উচ্চারণের সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে কোনও এক বিন্দুতে যেন মিলে গেলেন বিদায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট। দরজা-জানলাগুলো খুলে দিতে বলতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আলো আসার, মুক্ত বাতাস আসার পথ করে দিতে বলতেন। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও তাঁর শেষ ভাষণে মার্কিন জাতিকে দরজা-জানলাগুলো খুলে রাখার পরামর্শ দিয়ে গেলেন।

ওবামা তাঁর দেশকে মনে করিয়ে দিলেন, আমেরিকা কোনও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর নয়। যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে দেশান্তরী হওয়া মানুষ, অভিবাসী মানুষ, ভাগ্যান্বেষী মানুষ মিলে মার্কিন জাতিকে তার বর্তমান আকারে পৌঁছে দিয়েছে। ওবামা তাঁর দেশকে মনে করিয়ে দিলেন, আজ যাঁরা নিজেদের খাঁটি মার্কিন বলে দাবি করছেন, তাঁরাও এক সময় মার্কিন ভূখণ্ডে আগন্তুকই ছিলেন।

বিশ্বায়নের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা আমেরিকা। কিন্তু সে মতাদর্শের ঠিক বিপ্রতীপে অবস্থান যাঁর, ঈষৎ দ্বিধান্বিত ভাবে হলেও, সেই ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমেরিকা বেছে নিয়েছে। তাই আমেরিকা আজ বিপরীত দিশায় হাঁটতে শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেই প্রতীত হয়। মার্কিন জাতিকে ইতিহাসের এই মোড়টা সম্পর্কেই সতর্ক করলেন ওবামা। এই মোড় থেকে বিপজ্জনক বাঁকটা না নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে গেলেন তিনি। আমেরিকার দরজা-জানলাগুলোকে আগের মতোই চির-উন্মুক্ত রাখতে বলে গেলেন।

আট বছর আগে গোটা আমেরিকার প্রতিনিধি হিসেবে এ বিশ্বকে ওবামা বলেছিলেন, ‘ইয়েস, উই ক্যান’ অর্থাৎ ‘হ্যাঁ, আমরা পারি।’ আজ তার প্রতিদানে ওবামার হয়ে কি গোটা আমেরিকা এ বিশ্বকে আর এক বার বলতে পারবে, ‘হ্যাঁ, আমরা পারি’? উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম।