প্রতিবাদের অভিঘাত, না সুচিন্তিত, সুপরিকল্পিত নাট্যরঙ্গ? হরিয়ানায় ভয়াবহ সংখ্যালঘু-নিধনের প্রতিক্রিয়ায় দেশব্যাপী বিক্ষোভের পর দিনই যে প্রধানমন্ত্রী তাঁহার মৌন ভাঙিয়া ‘গোরক্ষার নামে হিংসা’র নিন্দা করিলেন, গো-ভক্তির নামে মানুষনিধনকে অন্যায় বলিলেন, তাহা আপাতদৃষ্টিতে আশ্বাসজনক হইতে পারে, কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর ভারতে আপাতদৃষ্টির দৌড় যৎসামান্য। গত তিন বৎসরে একের পর এক সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায়, দেখা গিয়াছে, বাক্‌পটু প্রধানমন্ত্রী সচরাচর হিরণ্ময় নীরবতা পালন করেন। খ্রিস্টানদের উপর হিন্দু সঙ্ঘীয়দের আক্রমণ, আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গদের উপর অত্যাচার, দাদরির যুবক আখলাক হইতে হরিয়ানার বালক জুনেইদ পর্যন্ত মুসলিম নিধন, গোহত্যার গুজব কিংবা অভিযোগের ভিত্তিতে একের পর এক দরিদ্র গ্রামবাসীকে প্রহার ও হত্যা, কোনও কিছু তাঁহার ঐশ্বরীয় নিস্পৃহতায় টোল পড়াইতে পারে নাই। তিনি যেন সর্বদাই অন্য কোনও তলে বিচরণ করিতেছেন, সংখ্যালঘু নাগরিকদের উপর সুবিচারের দায়িত্ব যেন তাঁহার উপর বর্তায় না! গোরক্ষার নামে আজ পর্যন্ত কতগুলি গণপিটুনি, এমনকী গণনিধন ঘটিয়াছে, তাহার হিসাব রাখাও প্রায় অসম্ভব। অথচ প্রধানমন্ত্রী বার বার গোরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলিয়াছেন, এক বারও গোরক্ষার নামে ব্যাপক অনাচারের নিন্দা করেন নাই! শেষ পর্যন্ত নাগরিক প্রতিবাদের ঠিক পর দিন যে ‘মোদীয়’ ঐতিহ্য ভাঙিয়া একটি বার্তা প্রধানমন্ত্রীর মুখে ধ্বনিত হইল, ইহাতে চতুর চিত্রনাট্যের আভাস অতি স্পষ্ট।

মঞ্চের নাটক মঞ্চেই শেষ হয়। প্রধানমন্ত্রীর ভর্ৎসনাবাক্য প্রচারিত হইবার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঝাড়খণ্ডের রামগড়ে আবারও গোঘাতক সন্দেহে এক মুসলিম প্রৌঢ় গণপিটুনিতে নিহত হইলেন। পুলিশ ও প্রশাসন আসগর আনসারিকে বাঁচাইবার চেষ্টা করিল না। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য রামগড়ের পুলিশ বা প্রশাসন শুনিয়াছিল কি না জানা নাই, কিন্তু সম্ভবত গোটা দেশের হিন্দুত্ব-উন্মাদদের মতো তাহারাও বিলক্ষণ জানে যে, এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা প্রধানত আলংকারিক, বাস্তবে মূল্যহীন। মুখে যাহাই বলা হউক, কাজে গোরক্ষকদের আস্ফালন আটকাইবার সাধ্য কাহারও নাই। বোতল হইতে দৈত্য এক বার বাহির হইলে তাহাকে ভিতরে ঢুকাইবার সাধ্য স্বয়ং মোদীরও নাই। সাধ আছে কি? দৈত্যকে বোতলে ঢুকাইবার ইচ্ছাটিও মোদীর আছে কি না, তাহা নিশ্চয়ই একটিমাত্র বার্তা হইতে প্রমাণ হয় না। এত দিনের নীরবতা বনাম এক দিনের বার্তা বলিয়া দেয়, প্রকৃত মতটি সেই নীরবতার মধ্যেই ধরা রহিয়াছে।

এই অনুমান ভুল কি ঠিক, তাহা প্রমাণ করিবার দায় প্রধানমন্ত্রীরই। তিনি বার্তা দিয়াছেন, বার্তা প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা তাঁহার পরবর্তী কর্তব্য। এত বড় দেশে অনাচার আটকাইবার সাধ্য হয়তো তাঁহার নাই, কিন্তু অনাচার ঘটিলে কঠোর পদক্ষেপ লইবার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিবার ক্ষমতা তাঁহার আছে। এখনও সেই নির্দেশ আসে নাই। তাহা আসে কি না, এবং বলবৎ হয় কি না, তাহা দেখিবার জন্য নাগরিকরা প্রতীক্ষায় থাকিবেন। বিজেপির রাজনৈতিক গতিরেখা যদিও বলিতেছে, সঙ্ঘ পরিবারের প্রাণপ্রিয় প্রকল্প গোরক্ষা অভিযানকে উপেক্ষা করিবার কোনও প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর নাই, পরিবারসম্মত রাজনীতির লাইন ধরিয়া হাঁটিতে তিনি আপাতত যুগপৎ বাধ্য ও বদ্ধপরিকর, কেননা ওই পথে যুগপৎ প্রাণের আরাম এবং নির্বাচনী সাফল্য। তাই রাজনীতিকে পিছনে রাখিয়া মানবতা, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি নীতিকে মোদী সামনে রাখিবার ঝুঁকি লইবেন কি? সবরমতী আশ্রমের হাওয়া এবং প্রতিবাদ-ঝড়ে মৌখিক সান্ত্বনাবাক্যটুকু বর্ষিত হইল ঠিকই, তবে কার্যে পরিণত না হইলে তাহা নিতান্ত চোখে-ধুলা মাত্র। ধুলা ইতিমধ্যেই বিস্তর জমিয়াছে।