দেড় দশক আগের এক উত্তাল সময়ে দাঁড়িয়ে এক অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে দেশের এক প্রধানমন্ত্রী মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, রাজা বা শাসকের কাছে রাজধর্মই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, সব প্রজাই সমান রাজার চোখে, বৈষম্য বা ভেদাভেদ কাম্য নয়। সালটা ছিল ২০০২, ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক আগুনে পুড়ছিল গুজরাত। প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী গুজরাতের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, রাজধর্মের বিসর্জনটা উদ্বেগজনক। আজ সে বাজপেয়ীও নেই, সে ভারতও নেই। কিন্তু রয়েছে সে রাম, সে অযোধ্যাও। আর উত্তরপ্রদেশে রয়েছেন যোগী আদিত্যনাথের মতো একজন মুখ্যমন্ত্রী। আদিত্যনাথকে রাজধর্মের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার মতো কেউ কি রয়েছেন? জবাব মেলে না।

অযোধ্যার রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ বিতর্ক বহু বছর ধরে অত্যন্ত সংবেদনশীল গোটা দেশের জন্যই। এই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢালা হলে সমাজে কী ভাবে আড়াআড়ি ফাটল ধরতে পারে এবং সে ফাটল কতটা প্রশস্ত হতে পারে, তার সাক্ষী নব্বই-এর দশকের একটা বড় অংশ। রাম মন্দির-বাবরি মসজিদকে ঘিরে ঘনিয়ে ওঠা সঙ্ঘাত ভারতীয় সমাজে যে গভীর ক্ষতস্থান তৈরি করেছিল, তাতে কালের প্রলেপ কিছুটা পড়েছে হয়তো। কিন্তু ক্ষতস্থান পূরণ হয়নি পুরোপুরি, যন্ত্রণাও মিলিয়ে যায়নি নিঃশেষে। মিলিয়ে যায়নি বলেই বিতর্কিত ভূখণ্ডকে ঘিরে আজও আইন-আদালত, আজও রাজনৈতিক তৎপরতা, আজও সামাজিক টানাপড়েন।

এ হেন অযোধ্যাতেই রামের সুবিশাল মূর্তি চান যোগী আদিত্যনাথ। বিতর্কিত ভূখণ্ডের খুব কাছেই নাকি সেই মূর্তির প্রতিষ্ঠা চান উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী।

অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন করতে হচ্ছে আজ, রাজধর্মের কথা কি এ দেশে বার বার মনে করিয়ে দিতে হয় শাসকদের? অযোধ্যা যে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সরকারি উদ্যোগে সেখানে রামের মূর্তি স্থাপনের প্রস্তাব এক পক্ষকে খুশি করলেও, সমাজের আর একটা ভাগকে যে তা ভারসাম্যের অভাব বোধ করাবে, সে কথা কি একজন মুখ্যমন্ত্রীর বুঝতে অসুবিধা হয়?

আরও পড়ুন: অযোধ্যায় রামের বিশাল মূর্তি গড়ার পথে যোগী আদিত্যনাথ

উত্তরপ্রদেশ প্রশাসনের সাফাই, ধর্মীয় পর্যটন বাড়াতে চান যোগী আদিত্যনাথ। তাই রামচন্দ্রের মূর্তি অযোধ্যায়। উত্তরপ্রদেশের নানা প্রান্তেই এমন নানা মূর্তি স্থাপনের কথা ভাবা হচ্ছে বলে যোগীর পর্যটন বিভাগ দাবি করছে। তা-ই যদি হয়, তা হলে শুধু হিন্দুত্ব-কেন্দ্রিক পর্যটন কেন, ইসলাম-কেন্দ্রিক পর্যটন নিয়েও ভাবা হোক। উত্তরপ্রদেশে মুসলিম জনসংখ্যা নেহাৎ কম নয়। মুসলিম তীর্থস্থানের সংখ্যা বা মুসলিম সংস্কৃতির সাক্ষ্য বহনকারী পর্যটন স্থলের সংখ্যাও উত্তরপ্রদেশে নেহাৎ কম নয়। সেই সব তীর্থস্থান বা পর্যটন কেন্দ্রের জন্যও কি বিশেষ কিছু ভাবা হচ্ছে? তেমন কোনও খবর সামনে তো আসছে না। বরং তাজমহলের মতো স্থাপত্যও যোগীর পর্যটন মানচিত্র থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে এবং অনেকেই বলছেন, মুসলিম সম্রাটের কীর্তি নিয়ে মাতামাতি শাসকের অপছন্দ বলেই তাজমহলের এই হাল।

যোগী আদিত্যনাথ সম্ভবত ভুলে যাচ্ছেন, তিনি শুধু হিন্দুর মুখ্যমন্ত্রী নন, গোটা উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর রাজত্বে প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও যেন চারিয়ে গিয়েছে ভেদাভেদটা আজ। এই ভেদরেখা কিন্তু মঙ্গল বয়ে আনে না, সামাজিক ফাটলটাকে আরও চওড়া করে, পুরনো ক্ষতস্থানটাকে আবার খুঁচিয়ে তোলে। যোগী আদিত্যনাথকে আজ মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, মুখ্যমন্ত্রীর কাছে রাজধর্ম পালনটাই অগ্রাধিকার। কিন্তু মনে করিয়ে দেবেন কে?

জবাব মেলে না।