বিরাট কোহালি ও অনুষ্কা শর্মার বিয়ে আমাদের ‘ফিলস’ দিচ্ছে। ‘রিলেশনশিপ গোলস’ তো আগেই ছিল, এ বার ‘ওয়েডিং গোলস’ও তৈরি হয়ে গেল এই জুড়ির সৌজন্যে। আর অনুষ্কার সাজ-পোশাক তো ‘অন ফ্লিক’ ছিল। খরচাপাতি নিয়ে কেউ কেউ কথা তুলছেন বটে। কিন্তু ওই যে ‘ইয়োলো’!

বাড়ির টিনএজার বা কলেজপড়ুয়াটিকে এ হেন কথাবার্তা বলতে শুনেই থাকেন নিশ্চয়ই। আর এমন সব কথার অর্থ কী, তা জানতে চাইলে অপারগতা বোঝাতে আপনার অষ্টাদশীটি হয়তো বিশেষ একটি ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছে ‘‘উফ্ মা, আই কান্ট ইভ্‌ন!’’ এতে বিষয়টির উপর কোনও রকম আলোকপাত হওয়া তো দূর, উল্টে আরও ঘেঁটে গেছেন আপনি!

বোঝাই যাচ্ছে যে আপনি যথেষ্ট ‘ওক’ অর্থাৎ সচেতন নন। তাই ওই আলোচনা থেকে আপনি বোঝেননি যে ‘ফিলিংস’-এর ছোট রূপ ‘ফিলস’ বা ‘অন ফ্লিক’ মানে অনুষ্কার পোশাক অসাধারণ ছিল। আর ‘ইয়োলো’ (YOLO) হচ্ছে ইউ অনলি লিভ ওয়ান্স-এর সংক্ষিপ্ত রূপ।

এ সবই হল গত কয়েক বছরের ভাষাগত ট্রেন্ড। শহুরে, ফ্যাশন সচেতন অল্পবয়সীদের নিজেদের মধ্যে কথা বলার পছন্দের ভাষা। বেশ কয়েক বছর ধরে ব্যবহার হলেও ২০১৭-এ শব্দগুলি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। এক সময়ে এসএমএস লেখার জন্য যেমন পরিচিত বহু শব্দ ছোট রূপ পেয়েছিল, তেমনই সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক ব্যবহার এবং মিম-এর ছড়াছড়ির যুগে এমন নতুন শব্দেরা ঢুকে পড়ছে অল্পবয়সীদের ভাষায়।

ট্রেন্ডিং যা কিছু

• ফ্যাম (Fam): পরিবারের মতোই ঘনিষ্ঠ কেউ

• টিবিএইচ (TBH): টু বি অনেস্ট

• গুচ্চি: ভাল কোনও জিনিস

• শিপ: রিলেশনশিপ-এর ছোট রূপ

• সিপ টি: নিজের কাজ নিয়ে মাথা ঘামানো

• কেক (Kek): জোরে হাসা

• লিট (Lit): খুব ভালো

• টিএমআই (TMI): টু মাচ ইনফরমেশন

কখনও একটি শব্দের কিছুটা অংশ, কখনও কয়েকটির আদ্যক্ষর নিয়ে গঠিত সংক্ষিপ্ত রূপ, কখনও আবার একেবারেই নতুন কোনও শব্দে বা পরিচিত শব্দের অন্য রকম ব্যবহারে যেন অপরিচিত হয়ে উঠছে রোজকার ভাষাই। ভাষাবিদ পবিত্র সরকারের মতে, কিশোর-কিশোরী বা কলেজপড়ুয়াদের ভাষায় কিছু নিজস্ব শব্দ প্রতি প্রজন্মেই লক্ষ করা যায়। যেমন ল্যাদ, গুপি বা হুব্বার মতো কিছু শব্দ বেশ কয়েক বছর আগে জনপ্রিয় হয়। এখন সেগুলি নানা বয়সের মানুষের মধ্যেই বহুল প্রচলিত হয়ে উঠেছে। তবে আগে এই ধরনের শব্দ অনেক সময়েই সীমাবদ্ধ থাকত নির্দিষ্ট ভৌগোলিক জায়গায়। শিবপুরের ক্যাম্পাসে প্রচলিত শব্দের সঙ্গে তফাৎ ছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষার। কিন্তু এখন ইন্টারনেটের দাক্ষিণ্যে একই সুতোয় বাঁধা পড়ে যাচ্ছে বেভারলি হিলস থেকে বালিগঞ্জ। কিম কারদাশিয়ানের টুইটের ভাষা ছড়িয়ে পড়ছে এ শহরের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের দল বা ‘স্কোয়াড’-এও। অনেকেই আবার বন্ধুদের থেকে পিছিয়ে পড়ার ভয় থেকেও ব্যবহার করছেন শব্দগুলি। আর সেই ভয় বোঝাতেও তরুণ প্রজন্মের কাছে রয়েছে নতুন শব্দ— ‘ফোমো’ (FOMO) অর্থাৎ ফিয়ার অব মিসিং আউট।

ভাষার এমন কারিকুরিতে অবশ্য মাঝেমধ্যেই ঘাবড়ে যাচ্ছেন বাবা-মায়েরা। নিজেদের জীবাশ্মের মতোই পুরনো বলে মনে হচ্ছে কারও কারও। কিছু দিন আগেই ফেসবুকে মেয়ের বন্ধু-তালিকায় সামিল হয়েছেন কাবেরী বসু। কয়েক দিন পর দেখলেন, মেয়ে স্টেটাস দিয়েছে ‘বিয়ন্সে ইজ দ্য গোট’। মার্কিন গায়িকাকে নিয়ে এমন মনোভাবের কারণ জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে অবশ্য ভুল ভেঙেছে কাবেরীদেবীর। বিদ্বেষ নয়, ওই বার্তা আসলে প্রংশসার। ‘গোট’ (GOAT) গ্রেস্টেস্ট অব অল টাইম-এর সংক্ষিপ্ত রূপ।

ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পড়ুয়া ইমন বৈদ্য জানাচ্ছেন, তাঁরা এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করতে পছন্দ করেন কারণ এগুলি দ্রুত টাইপ করা যায়। বানানও বেশ সহজ। যুগলদের মধ্যে ‘বে’ (BAE অর্থাৎ বিফোর এনিওয়ান এলস) শব্দটি বহুল প্রচলিত। তেমনই জনপ্রিয় ‘গোলস’। যে কোনও বিষয়ে কাম্য পরিস্থিতি বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার হয়। চাকরি, বিয়ে, পোশাক বা ভ্রমণ— সবের সঙ্গেই জুড়ে যেতে পারে ‘গোলস’। মা-বাবারা বোঝেন এই শব্দগুলো? ইমন জানাচ্ছেন, ছেলেমেয়েদের মুখে শুনতে শুনতে কিছু শব্দ বুঝতে পারেন বাবা-মায়েরাও। শব্দগুলো আর কত ছোট হবে, তা নিয়ে তাঁদের তরফে ছদ্ম উদ্বেগের প্রকাশও ঘটে থাকে মাঝেমধ্যে। ইংরেজির শিক্ষিকা মানালি মুখোপাধ্যায় জানান, পডুয়াদের থেকে নতুন নতুন শব্দ শুনতে তাঁর ভালই লাগে। অর্থটা তারাই বুঝিয়ে দেয়। তবে এই ধরনের শব্দ কখন, কোথায় ব্যবহার করা উচিত, তা নিয়ে একটু সচেতন থাকাই ভাল বলে মত মানালির।

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ভাষা পরিবর্তনশীল। মানুষের মুখে মুখে ভাষা বদলায়। বিশুদ্ধপন্থীরা পছন্দ না-ও করতে পারেন, তবে এই পরিবর্তন আটকানো যায় না। যুগের তো একটা ধর্ম আছে। অনেক সময়ে এই সব নতুন শব্দ শুনে মজাই লাগে। আমাদের তরুণ বয়সেও নিজেদের মধ্যে কথা বলার জন্য বিশেষ কিছু শব্দ ব্যবহার করতাম। তবে এগুলি বেশির ভাগই তেমন স্থায়ী হয় না, বহুল প্রচলনও দেখা যায় না।’’

কয়েক বছর আগেও ক্যাম্পাসে কান পাতলে ভেসে আসত কুল, ঝাড়ি বা অ্যাপোর মতো শব্দ। কিন্তু সে সবের দিন গিয়েছে। সেগুলি এখন আর যথেষ্ট ‘লিট’ নয়। নতুন বছরে হয়তো নতুন অনেক শব্দও পুরনো হবে। বেশি ব্যবহারের জেরে আকর্ষণ হারাবে কিছু কিছু শব্দবন্ধ। আর নতুনতর শব্দ নিয়ে মেতে উঠবে জেন জেড।