Advertisement
E-Paper

সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছেঁটে আর্থিক সংস্কার

গোটা দেশে ঝড় তুলে সাত নম্বর রেস কোর্স রোডের দখল নিতে আজ দিল্লিতে পা রাখলেন নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদী। আর আজই রাজধানীর রাস্তায় দেখা গেল সুসজ্জিত অটোর গায়ে লেখা, ‘আচ্ছে দিন আ গ্যয়ে হ্যায়। বিদ্যুৎ, জল, পেট্রোল, গ্যাস সব কিছুর দাম এ বার হু হু করে কমবে।’ মোদীর আশা পূরণ করেছে আম জনতা। এ বার মোদীর পালা। শিল্প মহলও তাঁর দিকে তাকিয়ে। তাদের আশা, ভোটবাক্সের মতো অর্থনীতিতেও ‘মোদী ম্যাজিক’-এর দেখা মিলবে।

জয়ন্ত ঘোষাল

শেষ আপডেট: ১৮ মে ২০১৪ ০৩:১৫
গঙ্গা-আরতি। শনিবার বারাণসীর দশাশ্বমেধ ঘাটে। ছবি: পিটিআই

গঙ্গা-আরতি। শনিবার বারাণসীর দশাশ্বমেধ ঘাটে। ছবি: পিটিআই

গোটা দেশে ঝড় তুলে সাত নম্বর রেস কোর্স রোডের দখল নিতে আজ দিল্লিতে পা রাখলেন নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদী। আর আজই রাজধানীর রাস্তায় দেখা গেল সুসজ্জিত অটোর গায়ে লেখা, ‘আচ্ছে দিন আ গ্যয়ে হ্যায়। বিদ্যুৎ, জল, পেট্রোল, গ্যাস সব কিছুর দাম এ বার হু হু করে কমবে।’

মোদীর আশা পূরণ করেছে আম জনতা। এ বার মোদীর পালা। শিল্প মহলও তাঁর দিকে তাকিয়ে। তাদের আশা, ভোটবাক্সের মতো অর্থনীতিতেও ‘মোদী ম্যাজিক’-এর দেখা মিলবে। আর মোদী বুঝতে পারছেন, যে ভোট তিনি পেরিয়ে এলেন, তা আগামিকাল গড়ার ভোট। পুরনো সব স্লোগান বদলে নতুন প্রত্যাশা পূরণের ভোট। কিন্তু ১২০ কোটির আকাশচুম্বী প্রত্যাশার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর হাতে যে কোনও জাদুদণ্ড নেই, সেটাও বিলক্ষণ জানেন মোদী। ১৯৯১ সালে পি ভি নরসিংহ রাও-মনমোহন সিংহ জুটি যে ভাবে আর্থিক বিপ্লব এনেছিলেন, ঠিক সে ভাবেই দ্বিতীয় বিপ্লব সংগঠিত করতে চাইছেন তিনি। তাই মোদী ছ’মাসের মধ্যে অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে বেশ কিছু বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিতে চলেছেন।

কী সেই সিদ্ধান্ত? মোদীর ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, শপথগ্রহণের পরেই দেশের মানুষকে নতুন প্রধানমন্ত্রী জানাবেন, গত দশ বছরে বিপথগামী নীতির ফলে গোটা দেশে যে গভীর ‘গাড্ডা’ তৈরি হয়েছে, তা বোজাতে কিছুটা সময় লাগবে। কিন্তু কোন অভিমুখে ও কী ভাবে তিনি এগোবেন, তার একটি সুনির্দিষ্ট নীল নকশা সে দিনই তিনি পেশ করবেন জনসমক্ষে।

তবে মুখ্যমন্ত্রী মোদী এত দিন কোন পথে চলেছেন, সেটা তো জানাই। একদা তিনি বলেছিলেন, “আমি এক জন অরাজনৈতিক মুখ্যমন্ত্রী।” এ বার লোকসভা ভোটের প্রচারেও তাঁর সব চেয়ে পছন্দের স্লোগান ছিল, ‘কম সরকার আর অনেক বেশি প্রশাসন’। দিল্লির রাজপথ থেকে বারাণসীর জনপথ, রোড শোতে জিপের পাদানিতে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ার রাজনীতিরও আজ ছিল শেষ দিন। তবে এ বার কি মোদী অরাজনৈতিক প্রশাসনিক প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন?

মোদী আজ বলেন, “এ বার আমার প্রধান অগ্রাধিকার উন্নয়ন। অনেকেই বলেন, উন্নয়ন হল একটি সরকারি কর্মসূচি। আমি বলি, না। উন্নয়ন একটি গণ-আন্দোলন। সাধারণ মানুষের কর্মসূচি।” মোদীর মতে, মানুষের প্রয়োজন কী, সেটা না ভেবে সরকার যদি একের পর এক বাড়ি তৈরি করে যায়, সেটা তো উন্নয়ন হতে পারে না। সেই বাড়িটি কার জন্য বানানো হচ্ছে, কেন বানানো হচ্ছে সেটা সার্বিক ভাবে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে দেখতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ মূলত পাঁচটি। মূল্যবৃদ্ধি, আর্থিক ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, লগ্নির পরিবেশ তৈরি, উৎপাদন চাঙ্গা করা এবং শিল্পের জন্য সহজ ঋণের ব্যবস্থা করা। এই পাঁচটি সমস্যার সমাধান করতে পারলে ফের ঘুরতে শুরু করবে আর্থিক বৃদ্ধির চাকা। তবে সবার আগে দরকার হতাশার পরিবেশ কাটানো। কর ব্যবস্থা সম্পর্কেও ভীতি কাটাতে হবে। সেটা হলেই শিল্পপতিরা বিদেশের বদলে এ দেশে লগ্নি করার সাহস পাবেন। ক্রেতারাও বেশি করে কেনাকাটা শুরু করবেন। তৈরি হবে চাহিদা।

বিজেপি শিবিরও বলছে,
• বাজারকে হতাশামুক্ত করাই তাঁর কাজের তালিকায় এক নম্বরে রেখেছেন ভাবী প্রধানমন্ত্রী।
• সেই সঙ্গে বিলগ্নিকরণের জন্য ব্যাপক ব্যবস্থা করা হবে। l শিল্পকে চাঙ্গা করতে দেওয়া হবে সহজ শর্তে ঋণ।
• বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি লগ্নির ব্যাপারে ছাড় মিলবে। জোট শরিক, এমনকী শাসক দল কংগ্রেসের মধ্যে আপত্তির কারণে যে ছাড় দিতে পদে পদে বাধা পেয়েছে মনমোহন সিংহের সরকার।
• কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েও আদায় করতে পারেনি বিদেশি লগ্নিকারীদের আস্থা।

• সংশোধন আনা হবে ইতিমধ্যেই পাশ হওয়া নতুন জমি বিলে, যে বিল জমি অধিগ্রহণের সমস্যা কমানোর বদলে আরও বাড়িয়েছে।

• আর বদলে দেওয়া হবে প্রস্তাবিত পণ্য-পরিষেবা করের চেহারা। রাজ্যগুলির মধ্যে ঐকমত্যের অভাবে যে কর ব্যবস্থা চালু করা যায়নি এখনও।

বিজেপি সূত্রের বক্তব্য, জোগানের সমস্যাও এই মুহূর্তে অর্থনীতির একটা বড় অসুখ। ২০০১ সালের অক্টোবরে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে সেই সমস্যা মেটাতে সংস্কারের পথে হেঁটেছিলেন মোদী। তাঁর ঘনিষ্ঠমহল বলছে, এই সংস্কারের ভাবনাটি হল, মানুষ যাতে আরও বেশি করে পণ্য উৎপাদন করতে পারে এবং যাতে আরও বেশি পরিষেবা সৃষ্টি হয়। তবেই অর্থনীতির বিকাশ ও বৃদ্ধি হবে। কর ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমিয়েই এই বৃদ্ধি হাসিল করা সম্ভব। মোটের উপর সরকারের ভূমিকা কমাতে হবে।

মোদীর নিজের কথায়, “শক্তিশালী রাষ্ট্র বা শক্তিশালী জাতি গঠন করা মানে ভয়ঙ্কর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নয়। হোটেল থেকে হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আবাসন সবই সরকার গড়বে এবং চালাবে, এ এক দীর্ঘলালিত মানসিকতা। এই রাষ্ট্রনির্ভর মানসিকতা থেকে বার হতে হবে। সরকারকে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে বাজার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।”

বস্তুত, সরকারি নিয়ন্ত্রণ হ্রাস শিল্পমহলের দীর্ঘদিনের চাহিদা। আর মোদী যখন নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন, তখন সেই লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রে মনমোহন সিংহের মতো তাঁর কোনও পিছুটান থাকবে না বলেই তাদের ধারণা। সিআইআই সভাপতি অজয় শ্রীরাম আজ বলেন, “সরকারের রাজনৈতিক স্থায়িত্ব থাকায় আর্থিক সংস্কারের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।” জোট রাজনীতির বাধ্যবাধতকা না থাকায় নতুন সরকার ডিজেল বা রান্নার গ্যাসে ভর্তুকি তুলে দেওয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে পারবে বলে শিল্পপতিদের ধারণা।

মোটের উপর সরকারের ভূমিকা খাটো করার এই আর্থিক নীতি নিয়েই চলে আমেরিকার রিপাবলিকান বা ব্রিটেনের টোরি দল। তাদের দর্শন হল, সাধারণ মানুষ জানে কী করে টাকা খরচ করতে হয়। কী ভাবে পুঁজিকে ব্যবহার করতে হয়। সরকারের কাজ হল করের টাকার একটা অংশ গরিব মানুষের স্বার্থে কাজে লাগানো, যাতে সমাজের উন্নয়ন হয়।

কিন্তু বামপন্থী এবং সমাজতন্ত্রীরা মনে করেন, বৃদ্ধির বিষয়টি বাজারের উপর ছেড়ে দিলে অসাম্য বাড়াবে। আর এই মতাদর্শের প্রভাবেই পরিচালিত হয়েছিল ইউপিএ সরকারের আর্থিক নীতি। সেই কারণেই একশো দিনের কাজ, খাদ্য নিরাপত্তার মতো প্রকল্প গ্রহণ করেছিল তারা। নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছিল পুঁজিপতিদের উপরে।

ঘটনা হল, সঙ্ঘ পরিবারের স্বদেশি অর্থনীতির তত্ত্বেও এমন বাম ঘেঁষা প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে গুজরাতে তা থেকে সরে আসার সাহস দেখিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। এ বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গোটা দেশের ক্ষেত্রে সেই সাহস দেখানোর পালা।

দিনভর মোদী

সকাল ৯টা: আমদাবাদ থেকে দিল্লির বিমান।
১০.৩০: দিল্লি বিমানবন্দরে। স্বাগত জানাতে হাজির রাজনাথ-গডকড়ীরা।
১০.৫০: বিমানবন্দর থেকে মোদীর রোড শো শুরু।
দুপুর ১২টা: অশোক রোডে বিজেপি দফতরের সামনে ছোট জনসভা।
১২.২০: ফুলবৃষ্টি, আতসবাজির মধ্যে দলীয় অফিসে ঢুকলেন।
১২.৪০: সংসদীয় বোর্ডের বৈঠক শুরু। হাজির আডবাণী, সুষমাও। আডবাণীকে প্রণাম মোদীর।
১.১৫: রাজনাথ, সুষমা, জেটলির সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজন।
২টো: গুজরাত ভবনের উদ্দেশে রওনা।
৩.৩০: বারাণসী-যাত্রা।
বিকেল ৫.৩০: রাজনাথের সঙ্গে বিশ্বনাথ মন্দিরে পুজো।
সন্ধ্যা ৬.৩০: গঙ্গা আরতি।
রাত ৮টা: দশাশ্বমেধ ঘাটে ঘোষণা: বারাণসীকে আধ্যাত্মিক রাজধানী করব।
৯.৪৫: দিল্লির উদ্দেশে রওনা।

jayanta ghoshal modi
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy