চেন্নাই সিটি ২   :    মোহনবাগান ১

একত্রিশ মাস আগে ২০১৫-র পয়লা জুনের রাত। মোহনবাগানকে তেরো বছর পরে আই লিগ চ্যাম্পিয়ন করে কলকাতা ফিরেছিলেন সঞ্জয় সেন।

শোনা যায়, সেই রাতেই নাকি তাঁকে কোচ করার জন্য বাড়িতে ছুটে গিয়েছিলেন ইস্টবেঙ্গল কর্তারা। চেতলা নিবাসী বঙ্গসন্তান সে দিন নাকি লাল-হলুদ শিবিরের কর্তাদের ফিরিয়ে দেন। বলেন, ‘‘মোহনবাগান সমর্থকরা আজ যে সম্মান দিল তার পরে এই মুহূর্তে ইস্টবেঙ্গলে যেতে পারব না।’’

২ জানুয়ারি, ২০১৮। আড়াই বছরে অনেকটাই বদলে গিয়েছে সঞ্জয় সেনের মোহনবাগান-ইনিংস। মোহনবাগান সমর্থকদের একদা প্রিয় ‘সঞ্জয় স্যার’ সপ্তাহখানেক আগেই শুনে ফেলেছিলেন, ‘গো ব্যাক সঞ্জয় সেন’। মঙ্গলবার চেন্নাই সিটি এফসি ম্যাচে হারের পর সাংবাদিক সম্মেলন চলাকালীন তাঁকে লক্ষ্য করে ছুটে এল সমর্থকদের ছোড়া ইটের টুকরো। মোহনবাগানকে আই লিগ, ফেডারেশন কাপ দেওয়া কোচের মুখে তখনও হাসি। বলেন, ‘‘অবাক হচ্ছি না। এগুলো নিশ্চয়ই প্রাপ্য। সমর্থকদের হয়তো আমাকে আর পছন্দ নয়। তাই আর এখানে কোচিং করানোর মানসিকতা নেই।’’

ডার্বি জয়ের পরে পর পর তিন ম্যাচে ড্র। তার পরে হার। মোহনবাগান কোচ বলেন, ‘‘তৈরি হয়েই এসেছিলাম আজ। ঘরের মাঠে হারলেই পদত্যাগ করব ভেবেছিলাম। তাই সব ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে নিজেই সরে যাচ্ছি।’’ মজার ব্যাপার এটাই, চলতি মরসুমে সঞ্জয় সেন মোহনবাগানে কোচিং করাচ্ছেন মোটে দু’মাস। তার আগে মরসুমের প্রথম থেকে এই দল চালিয়েছেন তাঁর সহকারী শঙ্করলাল চক্রবর্তী। কলকাতা লিগ ও সিকিম গভর্নর্স গোল্ড কাপে তিনিই ছিলেন দলের দায়িত্বে। সনি নর্দে, দিপান্দা ডিকা, ফৈয়জ-রা বাদে গোটা দল তিনিই চালিয়েছেন। ব্যর্থতার জন্য সমর্থকরা তাঁকে নিশানা বানাননি। বরং এ দিন তিনি তাঁবু ছাড়লেন সমর্থকদের জয়ধ্বনির মধ্য দিয়েই।

বিধ্বস্ত: হারের পরে হতাশায় মাঠেই বসে পড়লেন সবুজ-মেরুনের তারকা ডিকা। ছবি : সুদীপ্ত ভৌমিক

তা হলে কি পর্দার আড়ালে অন্য অঙ্ক? সাংবাদিক সম্মেলনে প্রশ্ন করলে সঞ্জয় বললেন, ‘‘এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারব না।’’

আসলে গত কয়েক মাস ধরেই কাতসুমি, গার্সিয়াকে ছেড়ে দেওয়া নিয়ে কোনও না কোনও ভাবে মোহনবাগান জনতার নিশানায় পরিণত হয়েছিলেন সঞ্জয় সেন। তার উপর তাঁর আনা বিদেশি দিয়েগো ফেরিরা দলে ছাপ ফেলতে না পারায় আরও বিরাগভাজন হয়েছিলেন বিদায়ী মোহনবাগান কোচ। সেখান থেকেই সঞ্জয়-বিদায় নাটকের সূত্রপাত। তার উপর দলের নিউক্লিয়াস সনি নর্দে চোটের জন্য মাঠের বাইরে বসে। ‘কলার বোন’ ভেঙে দলের জাপানি ফুটবলার ইউতা কিনোয়াকি তাঁর দেশ জাপানে ফিরে এই পরিস্থিতিতে সঞ্জয়ের ত্রাতা হতে পারতেন গত আই লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা দিপান্দা ডিকা এবং আনসুমানা ক্রোমা। কিন্তু দলের দুঃসময়ে এই দু’জনও পেনাল্টি ছাড়া গোল করতে ভুলে গিয়েছিলেন।

মোহনবাগান কোচও এ দিন কেন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে কেন সৌরভ দাসকে নামাতে গেলেন তা বোধগম্য হয়নি। তাঁর পা থেকে বল কেড়ে নিয়েই জাঁ মিশেল জোয়াকিম-কে দিয়ে প্রথম গোলটা করান মুরিলো। দ্বিতীয়ার্ধে, ভেনিয়ামিন শুমেকো-র গোলের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান। স্বভাবতই ম্যাচ সেরা তিনি।

প্রথমার্ধের ছত্রিশ মিনিটে চেন্নাইয়ের প্রদীপ মোহনরাজ বক্সের মধ্যে গোলমুখী বলে হাত লাগানোয় পেনাল্টি পেয়েছিল মোহনবাগান। রেফারি লাল কার্ড দেখান মোহনরাজ-কে। সেখান থেকে ক্রোমা সমতা ফেরালেও। ছাপ্পান্ন মিনিট দশজনের চেন্নাই সিটি এফসি-র বিরুদ্ধে কোনও গোল করতে পারেনি মোহনবাগান। উল্টে গোল হজম করে কোচের পদত্যাগের পথই প্রশস্ত করেন ক্রোমা, ডিকা-রা। সাত ম্যাচে দশ পয়েন্ট নিয়ে তাঁরা লিগে এখন চার নম্বরে।

মোহনবাগান: শিল্টন পাল,  অভিষেক দাস, রানা ঘরামি, কিংগসলে ওবুমনেমে, রিকি লাল্লাওমাওমা, আজহারউদ্দিন মল্লিক, (নিখিল কদম), শিল্টন ডি’সিলভা (মননদীপ সিংহ), সৌরভ দাস (সুরচন্দ্র সিংহ), শেখ ফৈয়াজ, আনসুমানা ক্রোমা, দিপান্দা ডিকা।