ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হল কৃষিব্যবস্থা, শতকরা ৭০ ভাগ ভারতীয় কৃষিজীবী— এই তথ্য সেই কোন ছোটবেলা থেকে জেনে আসছি। আজও এই পরিসংখ্যান সে ভাবে আমূল বদলায়নি। গাঁধী বুঝেছিলেন ভারতের সে দিনের কৃষি অর্থনীতির কাঠামো ধ্বংস হলে নতুন ভারত নির্মাণ অসম্ভব হয়ে যাবে। স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য গাঁধীর মডেলকে অনেকের একটু বেশি রক্ষণশীল বলে মনে হত। নেহরু আবার কৃষির পাশাপাশি দ্রুত শিল্পায়নের চেষ্টাও করেন। ভারতের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও কখনও কৃষি আবার কখনও শিল্পের আধিপত্য দেখা গেছে। এই ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টাতেই গত ৭০ বছর ধরে এগিয়েছে ভারতীয় অর্থনীতি।

আজ এত বছর পর মধ্যপ্রদেশে মন্দসৌর-এ কৃষকদের উপর পুলিশের গুলি চলল। মধ্যপ্রদেশ এমন এক রাজ্য যেখানে গত পাঁচ বছরে কৃষিবিকাশ হয়েছে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভাবে। ২০১৪ সালে তো সেখানে শতকরা ২৫ ভাগ কৃষিবিকাশের হার ছিল যেখানে গোটা দেশে কৃষি বিকাশের হার ছিল ৪। এ হেন উৎপাদনের পরও কৃষকরা যদি তাঁদের পণ্যের উপর উচিত দাম না পান, না পান ক্রেতা, তবে তো কৃষিসঙ্কট থাকবেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃষিঋণ মকুবের বিষয়। দীর্ঘ দিনের জমে থাকা কৃষিঋণ কৃষকদের জীবনযাপনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। উত্তরপ্রদেশে কৃষিঋণ মকুবের ঘোষণা করে দেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। এর ফলে একই দাবি উঠেছে পঞ্জাব, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্নাটকে। আসলে কৃষকদের বিষয় নিয়ে ভারতের রাজনীতিকরা যে ভাবে রাজনীতি করেন সে ভাবে কি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন?

বস্তুত, ভারতের অনেক রাজ্যেই কৃষি উৎপাদন খারাপ হয়নি। তা সত্ত্বেও অতি উৎপাদনের সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে কৃষককে। ফলে অভাবী বিক্রির (ডিসট্রেস সেল) পথে হাঁটতে হচ্ছে তাঁদের। ঋণ নিতে হচ্ছে। এরই মধ্যে আরও বড় একটি সমস্যা এসে হাজির হয়েছে। দেশের বহু বড় বড় অর্থনীতিবিদ মনে করেন, মোদী সরকারের পুরনো নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের ফলে কৃষিক্ষেত্রে বড় রকমের প্রভাব পড়েছে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে কৃষকদের।

পুলিশের হাতে ধৃত বিক্ষোভে সামিল এক কৃষক।  ছবি: পিটিআই।

কৃষকদের মধ্যেও অবশ্য প্রকারভেদ আছে। হরিয়ানায় জাঠ-জোতদার-জমিদার-কুলাক কৃষক, উত্তরপ্রদেশের পশ্চিম অংশের ধনী, ট্রাক্টর চালানো চাষি আর ওড়িশার কালাহান্ডির চাষির সমস্যা তো এক নয়। অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও ওড়িশার প্রত্যন্ত গ্রামে আজও কৃষকেরা আত্মহত্যা করে চলেছেন। রাষ্ট্রীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরো অনুসারে ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ৩,১৮,৫২৮ কৃষক ভূমিপুত্র আত্মহত্যা করেন। ২০০১ থেকে ২০১১-র মধ্যে ৯০ লাখ কৃষক নিজের জমি ছেড়ে শহরে পালিয়ে গেছেন। প্রত্যেক দিন ভারতের নানা গ্রাম থেকে হাজার হাজার গ্রামবাসী শহরে পালিয়ে চলে আসে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গণদেবতার অনিরুদ্ধ কামারের মতো।

আসলে সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিক্ষেত্রেও আধুনিকতা প্রয়োজন। শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে কৃষিজমি সে ভাবে থাকতে পারে না যা আগে ছিল। তাই কৃষকদের কৃষি পেশা থেকে অন্য পেশায় রূপান্তরিত করার একটা দায়ও কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের হাতে। সিঙ্গুরে টাটার গাড়ি কারখানা পত্তনের সময় বলা হত সমাজতন্ত্রেও কৃষি থেকে শিল্প অভিমুখে সমাজ এগিয়েছে। এটাই হল সামাজিক সত্য। সমাজতন্ত্রী চিনেও এমনটা হয়েছে। কৃষকদের আন্দোলন রাজ্যে রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। এই আন্দোলন নিয়ে কংগ্রেস বনাম বিজেপি’র ‘তু তু ম্যায় ম্যায়’ এটা কাঙ্খিত নয়। আসলে কৃষকদের সমস্যার আশু সমাধান হওয়া প্রয়োজন।

ইতিহাসের পাতায় আমরা অনেক দুর্ভিক্ষ মন্বন্তর দেখেছি। বাংলায় প্রথম দুর্ভিক্ষ কমিশন গঠন করেছিল ব্রিটিশ। ভারতের প্রথম বাঙালি গোয়েন্দাকর্তা ভোলানাথ মল্লিক তাঁর লেখা বই My years with Neheru-তে বলেছেন, নেহরু ১৯৩৪ সালে মধুবনীতে ভয়াবহ ভূমিকম্প হওয়ার পর যে ভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছিলেন তা অনবদ্য। ওই সময় ভোলানাথ মল্লিক মধুবনী মহকুমার অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিন্টেন্ডেন্ট অফ পুলিশ ছিলেন। এই সময় গোটা বিহারে এক ভয়াবহ খাদ্যসঙ্কট হয়। ভোলানাথ মল্লিক লিখেছেন, আমি তখন ব্যাচেলার পুলিশম্যান। আমার নিজের বাড়িটাও ভেঙে গেছিল। কিন্তু গোটা রাজ্যের চাষিদের চাষের খুব ক্ষতি হয়। নেহরু সে দিন চাষাবাদের উন্নতির জন্য সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। মহাত্মা গাঁধীও নিজে ১৯৩৪ সালের ৩১ মার্চ নিজে মধুবনীতে আসেন। প্রাচীন ভারতের ঘটনা, কিন্তু বোঝা যায় তখন ভারতের প্রশাসন কত সংবেদনশীল ছিল।

ব্রিটিশরাজ চলে গেছে। এসেছে স্বরাজ। নিজের অধিকার। তবু ভারতীয় কৃষকদের আন্দোলনে পুলিশের গুলি চলেছে। গণতন্ত্রের বিকাশ তবে কোন পথে?