মনুষ্যজীবনে সবচেয়ে কঠিন কাজ হল এই কথাটি বলা, আমি জানি না। ভোটের সময় আমরা সাংবাদিকরা সবজান্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয়ে পারি না। যতই বলছি, সত্যি কথা বলছি, আমি নিজেই ঠিক বলতে পারছি না যে উত্তরপ্রদেশে কে জিতবে, উত্তরপ্রদেশেই কেউ বিশ্বাস করছে না! দেখুন, আমি সাংবাদিক, আমি একটা নির্বাচন কেন্দ্রে এসেছি। আমি কিন্তু ভোটের ভবিষ্যদ্বাণী করতে আসিনি। এলাম, দেখলাম আর বলে দিলাম অমুক চন্দ্র অমুক জিতবেন! ভোটার আচরণ বোঝার ব্যাপারে এই হাতুড়েপনা অবৈজ্ঞানিক। রাজ্যে ৪০৩টি আসন। আমি এ রাজ্যটাকে পশ্চিমবঙ্গের মতো বুঝি এমনও নয়। নির্বাচনী সমীক্ষা সংস্থাগুলি বিরাট টিম নিয়ে এ সব করে। তাও তাদের সমীক্ষা প্রায়শই মেলে না। চাণক্য নামের সংস্থাটি এ বার তবু অনেকটাই মিলিয়েছে, কিন্তু এই চাণক্যই বিহারের নির্বাচনী সমীক্ষার রায় মেলাতে পারেনি।

যে বার মনমোহন সিংহ প্রধানমন্ত্রী হলেন, সে বার সমস্ত নির্বাচনী সমীক্ষায় বলা হয়েছিল অটলবিহারী বাজপেয়ী ক্ষমতায় আসছেন। এখনও মনে আছে, মনমোহন সিংহের প্রথম বিদেশযাত্রায় সফরসঙ্গী ছিলাম। গন্তব্য ছিল ব্যাঙ্কক। বিমস্টেক-এর সম্মেলন ছিল। সম্মেলনে আন্তর্জাতিক মিডিয়া সেন্টারে সে বার বিদেশি সাংবাদিকেরা আমাদের সঙ্গে নানা ধরনের পরিহাস করছিলেন আমাদের, ভারতীয় মিডিয়ার ভুল ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে। কংগ্রেস যে ২০০-র বেশি আসন পাবে, বাজপেয়ী সরকারের ইন্ডিয়া সাইনিং-ফিলগুড মন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষের তীব্র মতামত ভারতীয় সংবাদমাধ্যম যে টের পায়নি তার জন্য সে দিন আমাদের অনেক উপহাস মেনে নিতে হয়। কিন্তু ব্রেক্সিট নিয়ে মানুষের মত কোন দিকে, তার সমীক্ষা রিপোর্ট কী ভাবে ভুল হল এ বার তা-ও আমরা দেখলাম। হিলারি ক্লিন্টনকে হারিয়ে ট্রাম্প যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হতে পারেন সেটা মার্কিন নির্বাচনী সমীক্ষার ছিল কল্পনার অতীত।

এখানে নির্বাচনী সমীক্ষা নিয়ে প্রাচ্য বনাম পাশ্চাত্যের কোনও তুলনামূলক আলোচনা আমার লক্ষ্য নয়। কে বেশি পারঙ্গম, কে বেশি বৈজ্ঞানিক, এ সব কথাও বলব না। শুধু বলতে পারি, আমরা যখন কোনও রাজ্যে, কোনও নির্বাচনী কেন্দ্রে যাই তখন কী করি? তখন আসলে দেখি নির্বাচনী মুড, কালার, প্রচারের কৌশল, প্রচারের বিষয়বস্তু, কে কী রকম অর্থব্যয় করছে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি যেমন অখিলেশ এবং রাহুল গাঁধীর রোড শো দেখেছি ইলাহাবাদে। সে এক অভাবনীয় স্বতঃস্ফূর্ত ভিড়! সে দিন নবীন প্রজন্মের যে উৎসাহ দেখেছি তা কিন্তু আজও একই ভাবে সত্য। অখিলেশের যে নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ক তাতেও কিন্তু সে ভাবে অবক্ষয় হয়নি। আবার নরেন্দ্র মোদীর জনসভাগুলিতে যে ভিড় পরিলক্ষিত হয়েছে তাও সর্বজনবিদিত।

আসলে নির্বাচনী সমীক্ষা বলে নয়, যে কোনও সমীক্ষা বা সার্ভে একটা বিজ্ঞান। বলতে পারেন ‘ইনকমপ্লিট সায়েন্স’। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমরা চিরকাল এ তর্ক করে এসেছি, পদার্থবিজ্ঞান-গণিতশাস্ত্রও কি অসম্পূর্ণ বিজ্ঞান নয়? আইনস্টাইনের তত্ত্বও হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার তত্ত্বের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ হয়েছিল।

জয়ের আনন্দে মাতোয়ারা বিজেপি সমর্থকরা। ফাইল চিত্র।

বার্ট্রান্ড রাসেল একদা পরিহাসছলে বলেছিলেন, সত্য থেকে আর এক সত্যে নয়। মাঝে মাঝে মনে হয় একটা হাইপোথিসিস থেকে আর এক হাইপোথিসিসের দিকে হাঁটছি আমরা।

‘সার্ভে মেথডোলজি’ এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। বলা হয়, ‘এম্পেরিকাল মেথড’ (emperical method)। ক- কাকটি কালো। খ- কালো। গ- কালো, অতএব, সব কাক কালো। সাদা কাক কোথাও থাকতেও পারে, আমি জানি না। আমার স্যাম্পল নির্বাচনে সেই সাদা কাকটি ছিল না। তাই কত স্যাম্পল নির্বাচিত করা হচ্ছে, কত আয়তন এলাকায়, সেই নমুনা বা স্যাম্পলগুলিতে ভিন্নতা বা বৈচিত্র আছে কতখানি— এ সব বিচার্য বিষয়। আর এই নমুনা নির্বাচনের ভুলেও ফ্যালাসি তৈরি হয়।

তা ছাড়া আমার গবেষণাগার হল সমাজ। স্যাম্পল হল মানুষ। মানুষ সচেতন ভাবে আপনাকে অসত্য বিবৃতি দিতে পারে। মতামত প্রকাশে অনিচ্ছুক মানুষ যদি শতকরা পাঁচ ভাগও থাকে তা হলেও সেই শতকরা পাঁচ ভাগও কোনও দলের পক্ষে বিরাট স্যুইং হতে পারে। ’৭৭ সালে পরাস্ত ইন্দিরা ’৮০ সালে আবার ক্ষমতাসীন। ’৮৯ সালে পরাস্ত কংগ্রেস ’৯১ সালে আবার ক্ষমতায়। ২০০৬ সালে ২৩৫টি আসন নিয়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ক্ষমতাসীন হলেও ২০০৯ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৬টি লোকসভা আসন জিতেছেন। জনমত সততই পরিবর্তনশীল। আর তাই ‘পলিটিক্যাল কনটেক্সচুয়াল রেফারেন্স’ খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটও বদলে বদলে যায়।

মানুষ ঠিক কতটা রেগে গেলে দাঁত কিড়মিড় করবে এই আবেগ বা ক্ষোভ মাপার তো কোনও থার্মোমিটার নেই। তাই ১০০ ডিগ্রিতে জল ফুটবে বলা যায়, কিন্তু ঠিক কতখানি অসন্তোষ হলে মানুষ বিপ্লব করবে তার কার্যকারণের ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় কি? তা হলে তো মার্কসের তত্ত্ব মেনে ব্রিটেনেই বিপ্লব হতে পারত সোভিয়েত ইউনিয়নের বলশেভিক বিপ্লবের আগেই। মনে পড়ছে মার্কিন আচরণ-বিজ্ঞানী ডেভিড ইস্টনের একটা কথা, আমাদের ‘ভ্যালুজ’ বা মূল্যবোধ নামক জিনিসটি ঠিক আমাদের গায়ের কোটের মতো নয় যে গবেষণাগারে ঢোকার আগে সেটিকে হ্যাঙারে ঝুলিয়ে দিয়ে যাব। আমার চাওয়া-পাওয়া মিশে থাকে আমার বিশ্লেষণে। ‘ভ্যালু ফ্রি ফ্যাক্ট’ বলে কিছু হয় কি?

তাই আমরা যে যা চাই ঘটনার মধ্যে তাই দেখতে পাই। মিললে তুক, না মিললে তাক। সত্যাণ্বেষী সাংবাদিককে তাই ন্যায়-অন্যায়, ঔচিত্য-অনৌচ্যিতের বোধকে দূরে সরিয়ে ঘটনার বিশ্লেষণ করতে হয়, তারপর নাড়ি টেপা ডাক্তার হওয়ার চেষ্টা করি। কোনও ইসিজি-সোনোগ্রাফি বা কার্ডিওগ্রাম-ট্রেডমিল পরীক্ষা ছাড়াই ভোটারদের মুড দেখে বলি, মনে হচ্ছে মোদীত্ব খুব শক্তিশালী অথবা অখিলেশের বিরুদ্ধে কটুকথা বিজেপি সমর্থকেরাও বলছে না।

তবে এই অবৈজ্ঞানিক ভাবে তড়িঘড়ি অর্থগৃধ্নুতার শিকার নির্বাচনী সমীক্ষার সংস্কৃতি বোধহয় এ বার বন্ধ করার সময় এসেছে। বেসরকারি সংস্থার স্বাধীনতার নামে নির্বাচন কমিশনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে ভোটের আগেই বিবিধ মতামত ঘোষণায় গণতন্ত্র বিপন্নই হচ্ছে, শক্তিশালী হচ্ছে না।