চার দিকে সমুদ্র ঘিরে রেখেছে ছোট্ট এই দ্বীপভূমিকে। একের পর এক অসাধারণ সাগরবেলা। অসাধারণ সব বিচ। শুধু কি বিচ? রয়েছে চার্চ, আর পাম, নারকেল গাছের অপরূপ বাহার। এক সময় এই দ্বীপেই রাজপাট চালিয়েছেন পর্তুগিজরা। আজও বেশ কিছু পরিবার রয়ে গিয়েছে। ভাবছেন গোয়া? না, রং নাম্বার! শান্ত, নির্ঝঞ্ঝাট, নিপাট এক নিস্বর্গ। যার আনাচেকানাচে শুধুই উপচে পড়া সৌন্দর্য। আরবসাগর তার এক অঙ্গে অনেক রূপের বাহার ছড়িয়ে রেখেছে। কোথাও শান্ত বালিকার মতো ফেনার নূপুর পায়ে লুটিয়ে পড়ে। আবার  কোথাও সাগর মিশেছে দূর আকাশের সীমানায়। এই দ্বীপের নাম দিউ।

সোমনাথ দর্শন সেরে পর দিন কাকভোরে গাড়ি ভাড়া করলাম। উনা যাওয়ার রাস্তায় গাড়ি ছুটে চলেছে। রাস্তার দু’পাশে ছায়ামাখা গাছের সারি। পাতার ফাঁকে নরম আলোর খেলা দেখতে দেখতে এগিয়ে চলা। সবুজ ফসলের বাহারি ক্ষেতে কোথাও বজরা, তুলো, কোথাও সর্ষের হলদেটে রঙের ঢেউ। আবার কোথাও এক্কেবারে রুখাশুখা। ঘণ্টা দেড়েকের জার্নি, চলে এলাম কোডিনাড়। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর অদ্ভুত প্রাকৃতিক বৈচিত্র চোখে পড়ল। সমুদ্রের নোনাজল ঢুকে বিস্তীর্ণ জমিন নোনা জলা। নীল আকাশের নীচে ঘনকালো রাস্তার ধারে বিশাল তোরণদ্বারে লেখা ‘ওয়েলকাম টু দিউ’। চেকপোস্টে গাড়ির চেকিং, খোঁজখবর নেওয়ার পর যাওয়ার ইঙ্গিত। ঢুকে পড়লাম আরবসাগরের ঘেরাটোপে ৪০ বর্গকিমির এক দ্বীপভূমিতে।

দিউ ফোর্ট

ঘন নীল আকাশের নীচে ঝকঝকে, তকতকে রাস্তাঘাট, ঝাউ, পামের সারি সারি গাছ, নিজেদের ছায়া ফেলে ঘিরে রেখেছে। এখানে আজও বেশ কিছু পর্তুগিজ পরিবার রয়ে গিয়েছে। তবে গুজরাতি ভাষার চল রয়েছে। রাস্তার ডিভাইডারে সারি সারি লাল আর গোলাপি ফুলের বাহার। ডান দিকের ছবির মতো সাজানো ছোট্ট দিউ এয়ারপোর্ট। দেশের নানান প্রান্তের ছোট ছোট ফ্লাইট এখানে ওঠানামা করে। ইতিহাস বলছে, ১৫৩১ সালে পর্তুগিজরা দিউ আক্রমণ করে। ১৫৩৯ সালে ‘ডম জোয়াও ডি কাস্ট্রো’র নেতৃত্বে পর্তুগিজরা দিউ দখল নেন। তার পর থেকেই সমুদ্রেঘেরা এই ভূখণ্ডকে পূর্বে দুর্গ আর পশ্চিমে শহর দিয়ে ঘিরে ফেলেন। এ বার চলে এলাম, সমুদ্রে পাড় ঘেঁষা বন্দর রোড়ে। এখানে অলিগলিতেই নানান হোটেল। এক দিকে হোটেল, মাঝে মিশকালো রাস্তা। তার ও পাশে সমুদ্র। সারি সারি ট্রলার দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি হোটেলের সঙ্গেই লাগোয়া ব্যালকনি। রেস্তোরাঁও রয়েছে। মেনুতে নানান সি-ফুড, পর্তুগিজ, গোয়ানিজ, চাইনিজ-সহ নানা প্রদেশের খাবারের সম্ভার। গ্রেভি পমফ্রেট মাছ, ডাল, জিরা রাইস অর্ডার দিলাম। কিছুক্ষণ বাদে, ভাপানো পমফ্রেটের উপর ছড়ানো লাল টম্যাটো, চিলি, ক্যাপসিকাম সমেত নানান মশলার সঙ্গতে পুরু গ্রেভির আস্তরণ। পর্তুগিজ ডিশ। স্বাদে অসাধারণ। লাঞ্চ সেরে নিলাম। এ বার দিউ-কে দেখে নেওয়ার পালা।

আজ দিউ-র দুর্গ দেখে নেব। ট্রলারের সারিকে পেছনে ফেলে চলেছি। দূর থেকে চোখে পড়ল সাগরের মাঝে জাহাজ আকৃতির এক বিশাল ইমারত। বন্দর রোডের একেবারে শেষ প্রান্তে দিউ ফোর্ট। ১৫৩৫-’৪১ সালে আরবসাগরের ধারে ৫৬৭৩৬ বর্গমিটারের বিশাল দুর্গটি গড়ে তোলেন পর্তুগিজরা। যার চার দিকে পরিখা দিয়ে ঘেরা। জোয়ারের জল এই পরিখায় চলে আসে। দু’টি পথ চোখে পড়ল। একটা চলে গিয়েছে দুর্গের অন্দরমহলে, অন্যটি জেটির দিকে। লম্বা জেটির কাছে যেতেই দেখা মেলে আরবসাগরের। এই জেটিতেই পর্তুগিজরা জাহাজ নোঙর করতেন। দুর্গ প্রাকারের গায়ে আছড়ে পড়ছে অশান্ত সাগরের ঢেউ। সাগরের মাঝে নোঙর করা জাহাজের আদলে দাঁড়িয়ে আছে ফোর্ট ডি মার বা পানিকোঠা।

পানিকোঠা

এই পানিকোঠাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখেই সেলফি প্রেমীদের ভিড়। এ বার দুর্গের অন্দরমহলে প্রবেশ করলাম। একপাশে দিউ সেন্ট্রাল জেল। উর্দিধারীদের কড়া প্রহরা। দুর্গের মাথায় চলে আসতেই ধরা দিল প্রকৃতির অনাঘ্রাত সৌন্দর্য। তিন দিকে নীলচে আরবসাগরের ঢেউ বারে বারে আঘাত করে দুর্গ প্রাকারের প্রাচীরে। আবার ফিরে ফিরে যায়। আর পুবপাড় ঘিরে রয়েছে কালাপানি বা ব্যাকওয়াটার। দুর্গের নানান পরিত্যক্ত কক্ষ, মিউজিয়াম, কালো-সাদা বাতিঘর— এই সবে মেখে আছে ইতিহাসের গন্ধ। দেখতে দেখতে ঘণ্টা দেড়েক সময় পেরিয়ে গেল। এ বার চলে এলাম বন্দর রোডের জেটি ঘাটে। এখানে টিকিট কেটে, লাইফ জ্যাকেট চাপিয়ে চড়ে বসলাম বোটে। ঢেউয়ের দোলার দুলকি চালে চললাম পানিকোঠার দিকে। সংস্কারের কাজ চলছে, তাই প্রবেশ নিষেধ। গোটা দুর্গকে এক চক্কর লাগিয়ে আবার জেটিতে ফিরে এলাম। প্রতিবেশী রাজ্য গুজরাতে উষ্ণ পানীয় নিষিদ্ধ। শুধু খানা নয়, পিনাতেও দিউ বেশ উদার। পরদিন ব্রেকফাস্ট সেরে চলে এলাম দিউর সেন্ট ফ্রান্সিস চার্চে । ১৫৫৩ সালে পর্তুগিজরা এই চার্চটি নির্মাণ করেন। সাদা রঙের গির্জার কাঠের কাজ অপরূপ। পাশেই সুন্দর মিউজিয়াম দেখে নিলাম। সেন্ট পলস চার্চের সংস্কার চলছে।

কাছেই গঙ্গেশ্বর শিবমন্দির। জুতো খুলে রেলিং বেয়ে পাথরের খাঁজে নামতেই আরবসাগর যেন ফুঁসে ওঠে। দুরন্ত ঢেউ পাণ্ডবদের প্রতিষ্ঠিত পাঁচ শিবলিঙ্গকে বারে বারে ধুয়ে দিয়ে যায়। মন্দিরের পতাকা পতপত করে উড়তে থাকে। এখান থেকে আরবসাগকে দেখতে অসাধারণ লাগে। হাওয়ার দাপটে ক্ষয়িত পাথরের অপরূপ শিল্পকর্ম দেখে মন জুড়িয়ে যায়। শহর থেকে ৬ কিমি দূরে।

এ বার চলে এলাম আইএনএস কুখারি মেমোরিয়ালে। শহর থেকে ৩ কিমি দূরে। আইএনএস কুখারি হল ভারতীয় নৌবাহিনীর এক যুদ্ধজাহাজ। ১৯৬১ সালে ‘অপারেশন বিজয়’-এর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে  যার ভূমিকা ছিল অগ্রণী। ১৭১ জন সেনা জওয়ানের বলিদানে ১৯৬১-র ১৯ ডিসেম্বর দিউ স্বাধীন হয়। সেই জাহাজের রেপ্লিকা আর শহিদ স্মারক সঙ্গে পাহাড়চূড়োয় সুন্দর পার্ক আর সমুদ্রের দুরন্ত ভিউ চোখে পড়ল।

এ বার চলে এলাম জলন্ধর বিচ। বিচ লাগোয়া পাহার চুড়োয় পবিত্র চণ্ডীকা মন্দির। ডিম্বাকৃতি সৈকত পাথুরে হওয়ার কারণে স্নানের উপযুক্ত নয়। পাহাড়ের টিলায় সামার হাউসকে ঘিরে ফুলের বাগিচা আর সফেন সমুদ্রের পারে আছড়ে পড়ার দৃশ্য অসাধারণ। দিউতে আরও বেশ কয়েকটি বিচ রয়েছে। তাই তো দিউকে অনেকেই বিচের আইল্যান্ড-ও বলেন।

রয়েছে চক্রতীর্থ (১ কিমি), ঘোঘলা (২ কিমি)। তবে এই সব বিচ পাথুরে হওয়ার কারণে একেবারেই স্নানের উপযুক্ত নয়।

লাঞ্চ সেরে চলে এলাম শহর থেকে ৮ কিমি দূরের নাগোয়া বিচে। দিউর সবচেয়ে সুন্দর সৈকত। সাদা বালির অশ্বখুরাকৃতির সৈকত ২ কিমি দীর্ঘ। আফ্রিকাজাত হোক্কা গাছের সঙ্গে মিশেছে নারকেল গাছ। দেখলাম শান্ত নীল সমুদ্রে নানান ওয়াটার স্পোর্টসের রমরমা।

পানিকোঠা

ওয়াটার স্কুটার, প্যারাসেলিং, স্কুবা ডাইভিং, ওয়াটার স্কি, বাইকিং, কায়াকিং, ব্যানানা রাইডিংয়ের রমরমা। আকাশের ঠিকানায় রংবেরঙের বিশাল প্যারাসেলিং প্রেমীদের ওঠাপড়া, কেউ আবার সমুদ্রস্নানে মেতে আছেন। দিউর একমাত্র এই সৈকতই স্নানের উপযুক্ত। ও দিকে সাদা বালিতে ডেকচেয়ারে শুয়ে সানবাথ নিচ্ছেন বেশ কিছু বিদেশি। ছোট ছোট ঢেউয়ে নাগোয়া সৈকত যেন এক ছবি আঁকা সাগরপাড়। নারকেল আর ঝাউয়ের ফাঁক দিয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্য অনেক দিন মনে থেকে যাবে। যাঁরা ঝাঁকিদর্শনে দিউ ঘুরে যান, তাঁরা অন্তত দু’দিন দিউ কাটিয়ে যান। অল্পচেনা এই সৈকতভূমি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

কী ভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে ট্রেনে অথবা বিমানে আমদাবাদ। সেখান থেকে ২২৯৫৭ সোমনাথ এক্সপ্রেসে সোমনাথে নেমে গাড়িতে দিউর দূরত্ব ৯০ কিমি। বাসেও আসা যায়। গাড়িতে ড্রপ চার্জ ২,২০০-২,৬০০ টাকা। বাসে ১২০ টাকা।

কোথায় থাকবেন: এখানে থাকার প্রচুর হোটেল। হোটেল রাজ প্যালেস (০২৮৭৫-২৫২২৪০), ভাড়া ২,০০০-৩,৫০০ টাকা। হোটেল সম্রাট (৯৮৩১০-৪৬০০৩) ভাড়া ২,০০০-২,৬০০ টাকা। হোটেল গ্যালাক্সি (৯৮৩০৮৭০৬৩৫), ভাড়া ১,২০০-২,২০০ টাকা। হোটেল প্রিন্স (৯৮৩০১৫২১৬৯), ভাড়া ১,৫০০–১,৮০০ টাকা।

(লেখক পরিচিতি: ক্লাস নাইনে পড়াকালীন পাড়াতুতো মামার সঙ্গে মাত্র ৭০০ টাকা পকেটে নিয়ে সান্দাকফু ট্রেক। সুযোগ পেলেই প্রিয় পাহাড়ে পালিয়ে যাওয়া। বছরে বার কয়েক উত্তরবঙ্গের অল্পচেনা ডেস্টিনেশনে যাওয়া চাই। কুয়াশামাখা খরস্রোতা নদী কিংবা চলমান জীবনছবিতে ক্লিক, ক্লিক। চলতি পথে মেঠো গানের সুর শুনলেই ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়া। লাদাখে গর্তে সেঁধিয়ে যাওয়া মারমটের ছবি তুলতে ভিজে মাটিতে সটান শুয়ে অপেক্ষায় থাকা— এই নিয়েই ক্যামেরা আর কলম সঙ্গী করে ২২টা বছর। প্রকৃতির টানে ছুটে বেড়ানোটা থামেনি।)

ছবি: লেখক