অতীতে উত্তরাখণ্ডের চার ধাম, অর্থাৎ যমুনোত্রী, গঙ্গোত্রী, কেদারনাথ ও বদ্রীনাথ যাত্রা একসঙ্গে সম্পন্ন করার জন্য একটা পায়ে চলা পথ ছিল। বহু ধর্মপ্রাণ মানুষ এ পথেই চার ধাম যাত্রা করতেন। বর্তমানে হিমালয়ের অন্তঃপুরে অনেক স্থানেই গাড়িপথ পৌঁছ গিয়েছে। এই চার ধাম যাত্রায় এখন সামান্যই হাঁটতে হয়। গাড়িপথ পৌঁছে গিয়েছে গঙ্গোত্রী ও বদ্রীনাথে। সচরাচর আর কেউ সেই পুরনো দিনের পথে হেঁটে চারধাম যান না। বর্তমানে সে পথের অনেকাংশ বিলুপ্ত হলেও কোথাও তার কিছুটা অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ভাটোয়ারি থেকে ত্রিযুগীনারায়ণ এরই একটা অংশ। গঙ্গোত্রী থেকে কেদারনাথ যাওয়ার জন্য তীর্থযাত্রীরা এক সময়ে এ পথে পাড়ি দিতেন।

হাওড়া থেকে ট্রেনে হরিদ্বার। তারপর বাসে উত্তরকাশী হয়ে ভাটোয়ারির পথে লাতাসরাই-তে নেমে পড়তে হবে।

 

প্রথম দিন লাতাসরাই (১৪৭৮ মি.)-সৌরি গ্রাম (১২১৮ মি.)-দুগাড্ডা-বেলাক খাল (২৯৬৬ মি.)-১৫ কিমি

ভাগীরথীর উপর পুল পেরিয়ে উঠে আসবেন সৌরি গ্রামে। গ্রাম ছাড়িয়ে একটানা চড়াইপথ। পাথর বাঁধান পুরনো পথ। পথ ক্রমে ঢুকে পড়বে গভীর অরণ্যের মাঝে। অসীম নির্জনতা ভেদ করে ভেসে আসবে পাখির কলরব আর বনের সোঁদা গন্ধ। সব মিলিয়ে এ পথে পাবেন অনাবিল আনন্দ। চড়াই ওঠার ক্নান্তি দূর হবে। পথিমধ্যে একটা ঘর দেখতে পাবেন। এ জায়গাটির নাম দুগাড্ডা। ক্রমে র়ডোডেনড্রনের আধিক্য নজরে পড়বে। ছায়া ছায়া পথে উঠে আসবেন বেলাক খালের উপরে। এখানে বকরিওয়ালাদের কয়েকটি ঘর আছে।

থাতিকাটুর গ্রামের পাশ দিয়ে বইছে বালগঙ্গা নদী

দ্বিতীয় দিন বেলাক খাল-পাংরামা (২২০৩ মি)-জানা (২৪৩৯ মি)-থাতিকাটুর (১৫২৪ মি)-১৬ কিমি

চার দিকে ঘন সবুজের সমারোহ দেখতে দেখতে বনের মধ্যে দিয়ে নামতে থাকুন। নেমে আসবেন পাংরামা চারণক্ষেত্রে। মেষপালকদের ঘর আছে। একই রকম পথ ধরে নামা আর নামা। নেমে যাবেন ঝানা চটিতে। গুটিকয়েক ঘর আছে। এর পর ধর্মগঙ্গার উপর পুল পেরিয়ে চলতে হবে ওঠানামা পথে। অনেকটা পথ পেরিয়ে পৌঁছে যাবেন ধর্মগঙ্গা ও বালগঙ্গার সঙ্গমস্থলের কাছে থাতিকাটুর গ্রামে। এখানেই বুরকেদার বা বৃদ্ধকেদার মন্দিরটি। টিহরি থেকে এখানে গাড়িপথেও আসা যায়।

চড়াইপথে ঘুরে আসুন বেনাক খালের ধারে

তৃতীয় দিন থাতিকাটুর-বেলাক খাল (২০৪২ মি)-কালদি (১৩১১ মি)-ভৈরবঘাটি (২৪৯৩ মি)-১৬ কিমি

গাড়িপথ চলে যাবে টিহরী অভিমুখে। চড়াইপথে উঠে আসবেন বেনাক খালের ওপরে। এর পর ঘরবাড়ি ও দোকানপাট আছে। তার পর সহজপথে চলে আসবেন কালদি গ্রামে। গ্রাম ছাড়িয়ে হালকা চড়াইপথে উঠে আসবেন ভৈরবঘাটি। ভৈরবনাথের মন্দির আছে। আছে কালীকমলী ধর্মশালা। বালগঙ্গা ও ভীলঙ্গনা গঙ্গার মাঝে জল বিভাজিকার উপর এই মন্দিরটি।

গাছপালা আর চারণভূমির মধ্য দিয়ে ওঠানামা পথে পৌঁছে যাবেন কিউখোল

চতুর্থ দিন ভৈরবঘাটি-কোপোড়ধার-ঘুত্তু (১৬৭৭মি)- ৮ কিমি

হালকা বনের মধ্যে দিয়ে উৎরাই পথ। নেমে আসবেন এক আপাত সমতল প্রান্তে। তারপর ওঠানামা পথে পৌঁছে যাবেন কোপোড়ধার নামক জায়গায়। এ পথে লোকজনের চলাচল নজরে পড়বে। এর পর একটানা নেমে আসবেন একটা নালার ধারে। নালাটি পেরিয়ে আরও নীচে নেমে আসবেন টিহরী-ঘুত্তু বাসপথের উপরে। ভীলঙ্গনার ডানতটের এই গাড়িপথে বেশ খানিকটা এগোলেই ঘুত্তুর জনবসতি।

পাহাড়ি শোভায় মোড়া থাতিকাটুর গ্রামের পথে

পঞ্চম দিন ঘুত্তু (১৫২৪ মি)-গওয়ানা (১৬৭৭ মি)-গোয়ানমাণ্ডা (২১৩৪ মি)-পাওয়ালি কাঁটা (৩৯৬৩মি.)-১৬ কিমি

পুল পেরিয়ে চলে আসতে হবে ভীলঙ্গনার বামতটে। পূর্ব দিক থেকে নেমে আসা গওয়ানা গাডের উপর পুল পেরিয়ে গওয়ানা গ্রামটিকে বাঁ দিকে রেখে শুরু হবে চড়াই পথ। অতীতে প্রচলিত কথা ছিল যে ‘পাওয়ালি কা চড়াই হাতি কা লড়াই’, অর্থাৎ এক দিনে ১৬ কিমি পথে উঠতে হবে প্রায় সাত হাজার ফুট। একটানা চড়াই ভেঙে উঠে আসবেন গোয়ানমাণ্ডা খড়কে। পাহাড়ের ঢালে সামান্য গাছপালা আছে। দুফাণ্ডা খড়ক হয়ে উঠে আসবেন পাওয়ালি কাঁটায়। পাস সংলগ্ন বিস্তীর্ণ চারণভূমি। সেই সুন্গর প্রান্তরের মধ্য দিয়ে কয়েক পা নামলেই কালীকমলীর চটি ও কয়েকটি ঘর আছে।

 

ষষ্ঠ দিন পাওয়ালি কাঁটা-রাজখড়ক (৩৮১০মি)–তালি (৩৮৭১মি)-কিউখোল খাল (৩৬৫৯মি)-মুগ্গু চটি (৩০৪৯মি)-১২ কিমি

পাওয়ালি কাঁটা জায়গাটি অতীব সুন্দর। এখান থেকে উত্তরদিকে একসারি তুষারাবৃত পর্বতচূড়া দেখা যাবে। সকালটা এখানে কাটিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। সুন্দর চারণভূমির মধ্য দিয়ে প্রায় সমতল পথে রাজখড়ক হয়ে নেমে আসবেন তালি বুগিয়ালে। এ জায়গাটিও খুব সুন্দর। অল্প অল্প গাছপালা আর চারণভূমির মধ্য দিয়ে ওঠানামা পথে কিউখোল পথে পৌঁছে যাবেন। এখান থেকে উৎরাই পথ। নামার পথে মেষপালকদের ঘর দেখতে পাবেন। নেমে আসবেন মুগ্গু চটিতে। এখানে রাত কাটানোর নামমাত্র ব্যবস্থা আছে।

বেলাক খাল থেকে নজরকাড়া পাহাড়ের শোভা

সপ্তম দিন মুগ্গু চটি-ত্রিযুগীনারায়ণ (১৯৮২মি)-৭কিমি

রডোডেনড্রন বনের মধ্য দিয়ে সুন্দর প্রশস্ত পথে নেমে আসবেন ত্রিযুগীনারায়ণ। এখানে থাকা ও খাওয়ার ভাল ব্যবস্থা আছে। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস যে এখানে শিব ও পার্বতীর বিয়ে হয়েছিল। মন্দির দর্শন করে ১২ কিমি গাড়িপথে নেমে আসবেন শোনপ্রয়াগ। শোনপ্রয়াগ থেকে বাসপথে ফিরে আসবেন হরিদ্বার।

উত্তরকাশী বা ভাটোয়ারি থেকে মালবাহক নিতে হবে। পুরো পথের রসদ এক সঙ্গে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। পথিমধ্যে অনেক জায়গায় রসদ পাওয়া যাবে। এ প্রোগ্রামটি উল্টো ভাবে, অর্থাৎ ত্রিযুগীনারায়ণ থেকে ভাটোয়ারি যেতে পারেন। একই সময় লাগবে।

(লেখক পরিচিতি: আক্ষরিক অর্থেই রতনলাল বিশ্বাস ভূপর্যটক। তাঁর ট্রেকিংয়ের শুরু সেই ১৯৭২ সালে। ট্রেকিংয়ে সেঞ্চুরি করে ফেলেছেন তিনি। এ পর্যন্ত মোট ১০১টি ট্রেকিং সম্পন্ন। ব্যাঙ্কে না ঢুকে পূর্ব রেলে চাকরি নিয়েছিলেন বেড়ানোর নেশায়। শুধু পাহাড়েই নয়, গঙ্গাসাগর থেকে হেঁটে মুম্বইয়ে আরব সাগরের উপকূল পর্যন্ত পৌঁছেছেন রতনলাল, সে যাত্রায় পেরিয়েছেন প্রায় চার হাজার কিলোমিটার। হেঁটেছেন শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ উপকূল ধরেও। ’৭৮ সাল থেকে নেপালে ট্রেক করেছেন পর পর ২৫ বছর। ’৮৭ থেকে ৩০ বছর ধরে যাচ্ছেন লাদাখে। এ পর্যন্ত ট্রেকিং পথ পেরিয়েছেন প্রায় ১৮ হাজার কিলোমিটার। পাশাপাশি চলেছে নিরন্তর ক্যামেরার লেন্সে চোখ রাখা। এ পর্যন্ত লিখেছেন ভ্রমণ সংক্রান্ত আটটি গ্রন্থ। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন বছর তিনেক। কিন্তু পদব্রজে বিশ্ব পরিক্রমার নেশা থেকে অবসর নেবেন, এমনটা স্বপ্নেও ভাবেন না রতনলাল।)