দক্ষিণেশ্বরের কাছে আড়িয়াদহে গঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে এক প্রাচীন শিব মন্দির। এই মন্দিরের শিবলিঙ্গটি 'বুড়ো শিব' নামে পরিচিত। এটি শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনাস্থল দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি থেকে খুব কাছেই।
বুড়ো শিব মন্দিরের উৎপত্তির ইতিহাস আজও রহস্যে ঢাকা! জনশ্রুতি এবং ফলকের দাবি অনুসারে, এই মন্দিরের বয়স ২০০০ বছরেরও বেশি। ফলকে উল্লেখ আছে, এই শিবলিঙ্গের পুজো নাকি বাণ রাজার আমল থেকে শুরু হয়েছিল! বাণ রাজার আমল বলতে প্রাচীনত্ব বোঝানো হয়।
এই শিবলিঙ্গটি স্বয়ম্ভূ (স্বয়ং উৎপন্ন) বলে পরিচিত! প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, এলাকার এক ব্রাহ্মণের গরু রোজ জঙ্গলে যেত। সেই গরু ফিরে এলে দেখা যেত তার সমস্ত দুধ শেষ! ব্রাহ্মণ এক দিন অনুসরণ করে দেখেন, গরুটি একটি শিলাখণ্ডের উপরে দুধ ঢেলে দিচ্ছে!
সেই রাতেই ব্রাহ্মণ স্বপ্নে মহাদেবের দর্শন পান! মহাদেব তাঁকে শিলাখণ্ডটি সরিয়ে গঙ্গার তীরে মন্দির নির্মাণের নির্দেশ দেন! ব্রাহ্মণ দরিদ্র হওয়ায় স্থানীয় জমিদার রাজা সুধারাম ঘোষালকে বিষয়টি জানান। রাজার নির্দেশে তাঁর ভাই দেওয়ান হরনাথ ঘোষাল ১৭০৮ সালে মন্দিরটি নির্মাণ করেন।
এই শিবলিঙ্গের গঠন প্রচলিত শিবলিঙ্গের মতো নয়। এটি একটি বড় প্রক্ষিপ্ত পাথরের খণ্ড। জনশ্রুতি বলে, রাজা হোসেন শাহের আমলে মহেশ্বর স্বপ্নে মন্দির তৈরির নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশ অনুসারে, এই মন্দিরটির কোনও চূড়া নেই। এটি ভক্তদের কাছে খুবই জাগ্রত স্থান হিসাবে বিবেচিত হয়।
এই মন্দিরের ইতিহাসের সঙ্গে ব্রিটিশ বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংসের (১৭৭২-১৭৮৫) নামও জড়িয়ে আছে। কথিত, হেস্টিংস ছিলেন হিন্দু ধর্ম ও অলৌকিক বিশ্বাসে অবিশ্বাসী। তিনি বুড়ো শিবের অলৌকিক কাহিনি শুনে তা ভাঙার জন্য এসেছিলেন। শিবলিঙ্গটি গঙ্গার জলে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
হেস্টিংসের নির্দেশে কর্মীরা শিবলিঙ্গটি মাটি থেকে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু যতই খোঁড়া হয়, ততই শিবলিঙ্গের তল মাটির গভীরে যেতে থাকে! দিনের পর দিন খোঁড়ার পরেও শিবলিঙ্গের শেষ খুঁজে পাওয়া যায়নি! কর্মীরা ক্লান্ত হয়ে হাল ছেড়ে দেন।
বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংস এই ঘটনা দেখে অবাক হন। তিনি হিন্দু দেবতার অলৌকিক ক্ষমতা দেখে নিজের ভুল বুঝতে পারেন। এর পরে তিনি শিবলিঙ্গটিকে আর সরাতে পারেননি। এই অলৌকিক কাহিনি আজও বুড়ো শিবের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে।
বুড়ো শিবের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসেরও যোগ আছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং এই বুড়ো শিবের পুজো করেছিলেন। তিনি এই স্থানে সাধনা করতে আসতেন। স্বামী বিবেকানন্দ-সহ অনেক সন্ন্যাসীও এই মন্দিরে এসেছিলেন।
এই বুড়ো শিবের কাছে প্রার্থনা করলে নাকি ইচ্ছা পূরণ হয়। উত্তর ২৪ পরগনার অত্যন্ত জনপ্রিয় এই মন্দিরটি আজও অসংখ্য ভক্তের ভিড় টানে। এটি বাংলার এক গভীর ধর্মীয় ঐতিহ্য বহন করে। (এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ)।