ভাদ্র সংক্রান্তিতে পূজিত হন দেব শিল্পী বিশ্বকর্মা। এই একই দিনে বাংলার বহু ঘরেই পালিত হয় অরন্ধন বা রান্না পুজো। কিন্তু জানেন কি বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে আদতে রান্না পুজোর কোনও যোগ নেই?
হ্যাঁ, বরং রান্না পুজোর সঙ্গে যোগ রয়েছে দেবী মনসার। ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে অর্থাৎ শেষ দিনে পুজো হয় মনসার।
কিন্তু কেন এই সময় দেবী মনসার পুজো হয়? কথিত আছে এক সময় বঙ্গদেশে এক সদাগর ছিল যার ৭ বউ ছিল। এই সদাগরের বউরা সকলে মিলে একদিন সন্ধ্যায় বনের পাশে পুকুরে স্নান করতে যায়।
সেই বনেই থাকত অষ্টনাগ। বনে আগুন লেগে যাওয়ার কারণে তারা মাছ হয়ে পুকুরে ছিল। সদাগরের ছোট বউ পুকুরে এই মাছগুলি দেখতে পেয়ে সেগুলি গামছা দিয়ে ধরে বাড়ি নিয়ে আসেন। ছোট বউ সেগুলি বাড়ি এনে হাঁড়িতে জল দিয়ে রেখে জিইয়ে রাখে। পরদিন দেখে সেই হাঁড়িতে রয়েছে মাছের বদলে সাপ। কিন্তু সে ভয় না পেয়ে সাপগুলি পুষতে থাকে।
এক সময় সাপগুলি ভাবে যে তারা স্বর্গে গিয়ে দেবী মনসাকে সব কথা জানাবে এবং এই ছোট বউকে সাহায্য করবে। যেমন ভাবা, তেমন কাজ। দেবী মনসা তাকে স্বর্গে নিয়ে আসে এবং বলে সে যেন রোজ মনসার পুজো করে এবং অষ্টনাগের জন্য গরম দুধ রাখে। দক্ষিণ দিকে না তাকানোর নির্দেশও দেন।
সেখানে ভালই দিন কাটতে থাকে ছোট বউয়ের। কিন্তু এক সময় তার মনে প্রশ্ন জাগে যে দক্ষিণ দিকে কী আছে? নিষেধ ভুলে সেদিকে তাকায়, দেখে দেবী নাচছে। সেই নাচ মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকে সদাগরের ছোট বউ।
আর এতেই সে ভুলে যায় অষ্টনাগের জন্য দুধ গরম করে রাখতে। দেবীর নাচ শেষ হলে সে তড়িঘড়ি দুধ গরম করে আনে, কিন্তু সেটা খেতে গিয়ে সাপেদের জিভ পুড়ে যায়। তারা রাগের চোটে তাকে কামড়াতে যায়।
সেই সময় দেবী ছোট বউকে অর্ধেক শরীরে গয়না ফিরিয়ে মর্ত্যে ফিরিয়ে দেন। নির্দেশ দেন ফিরে গিয়ে অষ্টনাগের প্রসংশা করতে। বউ এমন অদ্ভুত সাজে ফিরে আসায় সদাগরের বাড়ির সবাই যখন তার এমন অদ্ভুত সাজের কথা জিজ্ঞেস করে তখন সে জানায় তার অষ্টনাগের মতো আট ভাই রয়েছে। এমন ভাই থাকলে কারও গয়নার অভাব হয় নাকি?
এই কথা শুনে, ছোট বউয়ের মুখে নিজেদের প্রসংশা শুনে খুশি হয় অষ্টনাগ। তারা দেবী মনসাকে গিয়ে ফের অনুরোধ করেন যেন তিনি তাকে অনেক গয়না দেন। তখন তিনি নিজের পরিচয় দেন এসে, সঙ্গে ছোট বউকে উপহার দেন অনেক গয়নাও। আর বলেন ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে যেন তার পুজো করা হয়। ভোগ হিসেবে পান্তা ভাত আর মাছের নানা পদ দেওয়ার কথাও বলেন।
এ ভাবেই ধীরে ধীরে মর্ত্যে রান্না পুজোর প্রচলন ঘটে। ছড়িয়ে পড়ে দেবী মনসার মাহাত্ম্যের কথা। (এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ)।