হুগলির হরিপাল কিংবা বীরভূমের লাভপুরে পুজো হয় এক ব্যতিক্রমী মাতৃরূপের— ‘সবুজ কালী’-র।
হুগলি জেলার সুপ্রাচীন গ্রাম হরিপালের শ্রীপতিপুর। এই গ্রামের অধিকারী পরিবারে প্রায় ৭৪ বছর ধরে পূজিতা হয়ে আসছেন সিদ্ধেশ্বরী কালী মাতা, যাঁর বর্ণ সবুজ। এই কাহিনির কেন্দ্রে আছেন বটকৃষ্ণ অধিকারী— এক দরিদ্র গোঁড়া বৈষ্ণব পরিবারের সন্তান, যাঁর মন ছিল বৈরাগ্যের দিকে। মাঠে-ঘাটে, শ্মশানে ঘুরে বেড়াতেন। বিবাহ হলেও সংসারে তাঁর মন বসেনি।
এক সন্ন্যাসীর নির্দেশে তিনি শ্মশানে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেন। এর পর স্বপ্নাদেশে মা কালীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু ঘোর বৈষ্ণব পরিবারে কালীপুজো? সমাজ মানতে চায়নি। বটকৃষ্ণ সব বাধা পেরিয়ে ঘট স্থাপন করলেন।
স্বপ্নে দেখা সেই রূপেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মা সিদ্ধেশ্বরী কালীর মূর্তি— সবুজ গাত্রবর্ণের দেবী।
সেই থেকে রটন্তী কালীপুজোর তিথিতে হয় মা সবুজ কালীর আরাধনা। এখানকার কালী বৈষ্ণব রূপিণী— নেই বলির প্রথা, নেই মদের ভোগ।
বরং মায়ের প্রিয় ইলিশ মাছ আর জুই ফুলেই সম্পূর্ণ হয় উৎসব।
পুজোর রাতে বাঁশির সুরে ভরে ওঠে অধিকারী বাড়ির আঙিনা— কারণ, এই মা কৃষ্ণ ও কালীর যুগল রূপ।
অন্য দিকে, বীরভূমের লাভপুরে ‘সবুজ কালী’ বিরাজ করছেন যোগমায়া আশ্রমের কাছে এক ছোট্ট মন্দিরে। এখানে যে খড়্গটি দেখা যায়, তা কেবল অসুর নিধনের প্রতীক হিসেবেই উপস্থিত।
এখানেও নেই পশুবলি— চালকুমড়ো দিয়েই হয় প্রতীকী বলি। দেবীর পাশে স্থাপিত গোপালের মূর্তি মনে করায় প্রথম উপাসক গোপাল সেবককে— যিনি নাস্তিক হয়েও আজ পূজিত দেবীর কৃপায়।
বোলপুর থেকে লাভপুর বাস স্ট্যান্ডের কাছাকাছি, যোগমায়া আশ্রমের কাছে গেলেই এই মন্দিরের খোঁজ মিলবে। পুজো পরিক্রমার এই সময়ে বাংলার এই দুই প্রান্তে সবুজে মোড়া এই দেবী যেন চিরাচরিত বিশ্বাসের পথে এক অন্য সুর বেঁধে দেয়, যেখানে ভয় নয়, বরং মা-এর কল্যাণময়ী রূপ। (এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ)।