নায়িকার চরিত্রে কখনওই অভিনয় করেননি। চরিত্রাভিনয়কেই নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য স্তরে। শক্তিশালী নারীচরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। তিন বার জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছিলেন সুরেখা সিক্রি। কিন্তু কেরিয়ারের প্রথম ছবিতেই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল সরকার।
১৯৪৫ সালের এপ্রিলে জন্ম সুরেখার। বাবা ছিলেন ভারতীয় বায়ুসেনার পাইলট। মা শিক্ষিকা। ছোটবেলা থেকেই লেখালিখির প্রতি ঝোঁক ছিল সুরেখার। সাংবাদিক হতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কেরিয়ার ভিন্ন খাতে বয়ে গেল তাঁর।
আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ার পর দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামায় (এনএসডি) ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন সুরেখা। সেখানে ভর্তির সুযোগও এসেছিল হঠাৎ। আসলে সৎবোনের শখপূরণ করেছিলেন তিনি।
সুরেখার সৎবোন ছিলেন পরভীন মুরাদ। পরভীনের শখ ছিল অভিনেত্রী হওয়ার। তিনি নিজের জন্য এনএসডি-র ফর্ম এনেছিলেন। কিন্তু পরে মত পরিবর্তন করে চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পরভীন। বাড়িতে পড়ে ছিল এনএসডি-র সেই ফর্ম।
মায়ের কথায় বাড়িতে পড়ে থাকা সেই ফর্ম পূরণ করে আবেদন করেছিলেন সুরেখা। অভিনয়ের খুঁটিনাটি শেখার পর বেশ কয়েক বছর মঞ্চে অভিনয় করেছিলেন তিনি। নাট্যশিল্পী হিসাবে দিল্লির থিয়েটারজগতে কম সময়ের মধ্যেই পরিচিতি তৈরি করে ফেলেছিলেন সুরেখা।
ওম পুরী, রঘুবীর যাদব এবং নাসিরুদ্দিন শাহের মতো বলি তারকার সঙ্গে নাটকের সূত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন সুরেখা। অর্থ এবং বৃহত্তর পরিচিতির জন্য সিনেমার জগতে পা রেখেছিলেন তিনি।
‘কিস্সা কুর্সি কা’ নামের হিন্দি ছবির মাধ্যমে প্রথম বড়পর্দায় অভিনয় সুরেখার। কেরিয়ারের প্রথম ছবি। কিন্তু সরকারের ছাড়পত্র পেল না ছবিটি। ১৯৭৫ সালে দেশের জরুরি অবস্থার সময়ে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল ছবিটির।
‘কিস্সা কুর্সি কা’ ছবিটির প্রতি সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। শোনা যায়, ছবির প্রিন্টও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কয়েক বছর পর সেই ছবিটি অবশ্য প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল।
গোবিন্দ নিহালনির ‘তমস’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেত্রী হিসাবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন সুরেখা। ১৯৯৪ সালে শ্যাম বেনেগাল পরিচালিত ‘মাম্মো’র জন্যও জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন তিনি। তৃতীয় বার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন ২০১৮ সালের ছবি ‘বধাই হো’র সুবাদে।
সুরেখার সৎবোন পরভীন ছিলেন বলি অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহের প্রথম পক্ষের স্ত্রী। পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে বয়সে ১৪ বছরের বড় পরভীনকে বিয়ে করেছিলেন সদ্য কুড়ির কোঠায় পা রাখা অভিনেতা। ১৯৮২ সালে মারা গিয়েছিলেন পরভীন। একই বছর অভিনেত্রী রত্না পাঠককে বিয়ে করেছিলেন নাসিরুদ্দিন।
নাসিরুদ্দিন এবং পরভীনের একমাত্র কন্যা হীবা শাহ। পেশায় অভিনেত্রী তিনি। নাসিরুদ্দিন এবং তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী রত্না ও দুই সৎভাইয়ের সঙ্গে থাকেন হীবা। সুরেখার সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল বোনঝি হীবার।
‘বালিকা বধূ’ নামের জনপ্রিয় হিন্দি ধারাবাহিকে ‘দাদিসা’ চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকমহলের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন সুরেখা। দাদিসার শৈশবের ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখা গিয়েছিল হীবাকে।
মূল বাণিজ্যিক এবং সমান্তরাল— দুই ধরনের ছবিতে অভিনয় করে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন সুরেখা। ২০১৯ সালে মহাবালেশ্বরে শুটিংয়ের সময় স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। বেশ কয়েক মাস শয্যাশায়ী থাকায় অভিনয় থেকে দূরে ছিলেন সুরেখা।
অসুস্থ হলেও হার মানেননি সুরেখা। সুস্থ হয়ে সই করেছিলেন পরবর্তী ছবি, জোয়া আখতারের ‘গোস্ট স্টোরিজ়’-এ। করোনার আবহে ৬৫ ঊর্ধ্ব অভিনেতাদের কাজে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল মহারাষ্ট্র সরকার। সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি সুরেখা।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, চিকিৎসার ব্যয়ভার মেটাতে অর্থের প্রয়োজন ছিল সুরেখার। কিন্তু তিনি অনুগ্রহ বা সাহায্য হিসাবে সেই অর্থ চাননি। সসম্মানে অভিনয় করে পারিশ্রমিক চেয়েছিলেন। সরকারের কাছে প্রবীণ অভিনেত্রীর প্রশ্ন করেছিলেন, ‘‘যদি প্রৌঢ় নেতারা কাজ করতে পারেন, তবে অভিনেতাদের বেলায় নিষেধাজ্ঞা কেন?’’
২০০৯ সালে সুরেখার স্বামী হেমন্ত রেগে প্রয়াত হয়েছিলেন। হেমন্তের মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতি আঁকড়েই বাকি জীবন কাটিয়েছিলেন সুরেখা। ২০২১ সালের জুলাইয়ে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল ৭৫ বছর। তাঁদের একমাত্র পুত্র রাহুল পেশায় একজন শিল্পী। বর্তমানে মুম্বইয়ে থাকেন তিনি।