Delhi Consumer Court Verdict

বিমা করিয়েই হারিয়ে গেল ১৮ লক্ষের সোনা! টাকা দিতে চাইল না বিমা সংস্থা, আদালতের নির্দেশে ৪৩ লক্ষ পাচ্ছেন দিল্লির বাসিন্দা

১২ বছর ধরে আইনি লড়াই চালিয়েছিল সোনা হারানো পরিবারটি। হারিয়ে যাওয়া সোনার অলঙ্কারের তৎকালীন মূল্য ছিল ১৮ লক্ষ টাকা। ১৬ বছর পর চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি এক যুগান্তকারী রায় দেয় ক্রেতা সুরক্ষা কমিশন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:০৬
Share:
০১ ১৭

কয়েক দিন আগে দুবাইয়ের একটি ঘটনা সংবাদ শিরোনামে এসেছিল। ভুল করে প্রায় ১৮ লক্ষ টাকার সোনা ফেলে দিয়েছিল এক পরিবার। তেমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল ১৬ বছর আগে, ২০১০ সালে। জানুয়ারির এক শীতের দুপুরে দিল্লির বাসিন্দা প্রবীণ শর্মা স্কুটারে চেপে নরেলা থেকে রওনা হয়েছিলেন চাঁদনী চৌকের দরীবা কালাঁর দিকে। সোনা, রুপো এবং মূল্যবান পাথরের গয়না কেনাবেচার জন্য প্রসিদ্ধ এই দরীবা কালাঁ। সেই বাজারে যাওয়ার সময়ে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন স্ত্রীর গয়না।

০২ ১৭

সে দিন একটি থলিতে ভরা গয়না পকেটে পুরে দরীবা কালাঁর একটি সোনার দোকানে যাচ্ছিলেন প্রবীণ। বিকেল ৩টের দিকে তিনি বুঝতে পারেন থলিটি তাঁর পকেট থেকে রাস্তায় কোথাও পড়ে গিয়েছে। গয়না হারানোর বিষয়টি বুঝতে পেরে দ্রুত থানায় অভিযোগ করেন তিনি। নন কগনিজ়েবল বা ছোটখাটো অপরাধের জন্য লিখিত অভিযোগের আকারে এটি জমা নেয় বাওয়ানা থানার পুলিশ।

Advertisement
০৩ ১৭

সৌভাগ্যবশত সেই হারিয়ে যাওয়া গয়নাগুলির বিমা করানো ছিল। প্রবীণের স্ত্রী গয়না-সহ বিভিন্ন গৃহস্থালির জিনিসপত্রের জন্য একটি পারিবারিক বিমা করিয়ে রেখেছিলেন। তাই সোনা খোয়া যাওয়ার পরদিন বিমা সংস্থাতেও ঘটনাটি জানান প্রবীণ। প্রয়োজনীয় সমস্ত বিবরণ জমা দেন। অলঙ্কার হারিয়ে যাওয়ার কথা শোনার পর বিমাসংস্থাটি প্রাপ্য অর্থ না দিতে চেয়ে বেঁকে বসে।

০৪ ১৭

বিমা সংস্থাটির যুক্তি ছিল, ২০০৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর গ্রাহক তাদের থেকে এই বিমাটি কিনেছিলেন। চুরির ঘটনা তার খুব অল্প সময়ের (১৩ দিনের মাথায়) মধ্যে ঘটেছিল। সংস্থাটি গ্রাহকের অবহেলার কথাও উল্লেখ করে দাবি তোলে যে, প্রবীণ বিমা করানো জিনিসপত্রের প্রতি যথেষ্ট খেয়াল রাখতে পারেননি। স্কুটারে চেপে গয়না নিয়ে চাঁদনী চৌক যাওয়ার পথে যা ঘটেছিল তার যে বর্ণনা বিমার দাবিদার অর্থাৎ প্রবীণ দিয়েছিলেন, সে নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছিল সংস্থা।

০৫ ১৭

প্রবীণ জানিয়েছিলেন, তিনি প্রথমে নরেলায় একটি জমি দেখতে গিয়েছিলেন। তার পর উল্টো দিকে চাঁদনী চৌকে গয়নার দোকানে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। দু’টি জায়গার মধ্যে অন্তত ৩০ কিলোমিটারের দূরত্ব।

০৬ ১৭

বিমা সংস্থা এই ঘটনার তদন্তের জন্য এক জন জরিপকারী নিয়োগ করে। তিনি ২০১০ সালের ১৮ মার্চ সংস্থার কাছে একটি রিপোর্ট জমা দেন এবং ক্ষতির পরিমাণ ১৭ লক্ষ ৭৫ হাজার ৫২০ টাকা নির্ধারণ করেন। তবে, জরিপকারী তাঁর রিপোর্টে উল্লেখ করেন যে, সোনার গয়না হারানোর পরিস্থিতি যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হচ্ছে না তাঁর।

০৭ ১৭

উল্লেখ্য, প্রবীণ গয়না হারানোর পরদিন, অর্থাৎ ২০১০ সালের ৮ জানুয়ারি ঘটনাটি সম্পর্কে বিমা সংস্থায় জানান। কিন্তু বিমা সংস্থা ১৬ জানুয়ারি জরিপকারীকে নিয়োগ করেছিল। অর্থাৎ, ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পরে।

০৮ ১৭

বিমার টাকা না পেয়ে ক্ষুব্ধ প্রবীণ ক্রেতা সুরক্ষা কমিশনে অভিযোগ জানিয়ে আসেন ২০১০ সালে। জেলার কমিশন প্রবীণের পক্ষে রায় দেয়। তারা বিমা সংস্থাকে ২০১০-এর এপ্রিল থেকে ৯ শতাংশ বার্ষিক সুদ-সহ ১৭.৭৫ লক্ষ টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এ ছাড়াও হয়রানি এবং আইনি খরচের জন্য অতিরিক্ত ৫০,০০০ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দেয়। সেই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে সংস্থাটি দিল্লি রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা কমিশনের দ্বারস্থ হয়।

০৯ ১৭

১২ বছর ধরে আইনি লড়াই চালিয়েছিল কয়েক লক্ষ টাকার সোনা হারানো পরিবারটি। ১৬ বছর পর, চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি এক যুগান্তকারী রায় দেয় রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা কমিশন। বিমার দাবিদার প্রবীণের পক্ষেই গিয়েছে আদালতের রায়। জেলা কমিশনের আদেশ বহাল রেখেছে রাজ্য কমিশন। বিমা সংস্থার আবেদন খারিজ হয়েছে। বলা হয়েছে যে, দুর্ঘটনা বা দুর্ভাগ্যের কারণেই প্রাপ্য অর্থ (কভারেজ) দেয় বিমা সংস্থা।

১০ ১৭

কেস নম্বর এফএ/১০৭২/২০১৪-এর রায়দানের সময় রাজ্য কমিশন জানিয়েছে, বিমায় অলঙ্কার সম্পর্কিত সমস্ত ধরনের ঝুঁকির জন্য ক্ষতিপূরণের উল্লেখ করা হয়েছিল। তাতে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতি বা অসাবধানতাবশত ক্ষতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। রাজ্য ক্রেতা কমিশন জানিয়েছে যে, বিমা করানোর সময় সংস্থার প্রতিনিধি সমস্ত কিছু মূল্যায়ন করেছিলেন।

১১ ১৭

তিনি জিনিসপত্র মূল্যায়ন করে রিপোর্ট গ্রহণের পরে এবং গয়না কেনার বিল না থাকার বিষয়ে সচেতন থাকার পরেই বিমার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তাই গ্রাহকের ক্ষতি হওয়ার পরে গয়নার মালিকানা, মূল্যায়ন বা অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে না বিমা সংস্থা, এমনটাই জানিয়েছে কমিশন।

১২ ১৭

বিমা সংস্থা গ্রাহকের আচরণ নিয়ে যে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল তাও খারিজ হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, সংস্থা যে সন্দেহ এবং ব্যক্তিগত ধারণার উপর ভিত্তি করে ক্ষতির সত্যতা অস্বীকার করছে, তার কোনও দৃঢ় প্রমাণ নেই। সংস্থার সন্দেহের দাবির উপর ভিত্তি করে তারা গ্রাহককে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। দৃঢ় প্রমাণ ছাড়া শুধু অনুমানের উপর ভিত্তি করে প্রাপ্য টাকা দিতে অস্বীকার করা যাবে না বলে জানিয়ে দেয় কমিশন।

১৩ ১৭

ক্ষতির পরে গয়নার মূল্য বা অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহ উত্থাপন স্পষ্টতই অযৌক্তিক বলে মনে করছে কমিশন। কারণ, গ্রাহক বিমা করার সময় সংস্থার বলা প্রয়োজনীয় সমস্ত নিয়ম মেনেছিলেন। সোনার গয়নার জন্য এক জন লাইসেন্সপ্রাপ্ত মূল্যায়নকারীকে দিয়ে গয়নার দাম ও অন্যান্য মূল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন। সেগুলি গ্রহণ করার পরেই সংস্থা বিমার অনুমোদন দেয়। চুরি যাওয়ার পর যিনি জরিপ করেছিলেন এবং বিমা সংস্থা কখনওই এই মূল্যায়ন রিপোর্টের বিরোধিতা করেনি।

১৪ ১৭

কমিশন ক্ষতিপূরণ উল্লেখ করার সময় জানিয়েছে, প্রায় সাড়ে ১৫ বছর ধরে ৯ শতাংশ সরল সুদ ধরলে সুদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৫.১৭ লক্ষ টাকা। আর গয়নার দাম ১৭ লক্ষ ৭৫ হাজার ৫২০ টাকা। সব মিলিয়ে মোট ৪২ লক্ষ ৯২ হাজার ৭১৯ টাকা বিমাসংস্থাকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সঙ্গে ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ।

১৫ ১৭

সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে চুরি, ক্ষতি, অগ্নিকাণ্ড বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দামি সম্পদ যেমন সোনা-রুপোর গয়না, তৈজসপত্র, রক্ষা করার জন্য বিমা (জুয়েলারি ইনশিয়োরেন্স) অপরিহার্য। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার সময় হারিয়ে যাওয়া বা ডাকাতি হলে সুরক্ষা দেয় এই বিমাই। বাড়ি কিংবা ব্যাঙ্কে লকারে রেখে দিলেও যে ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে না তা পুরোপুরি নিশ্চিত করে বলা সম্ভব না।

১৬ ১৭

তাঁদের মতে, গ্রাহক যখন বিমা করতে যাবেন তখন অবশ্যই খেয়াল রাখা উচিত যে সম্পদ মূল্যায়নের কাগজপত্র ও বিমার শর্ত যেন অগ্রাধিকার পায়। যাচাই করে নেওয়া উচিত, পরে বিমা সংস্থা প্রযুক্তিগত অজুহাত ব্যবহার করে যেন দাবি অস্বীকার করতে না পারে।

১৭ ১৭

সমস্ত ধরনের ঝুঁকিকে সুরক্ষা দেবে এমন একটি বিমা বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞেরা। এই ধরনের বিমা অলঙ্কার বা মূল্যবান জিনিসপত্রকে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতি থেকে বাঁচায়। সেখানে সাধারণ বিমাগুলি কেবল চুরি বা আগুন লাগার মতো নির্দিষ্ট ঘটনাগুলিতে কভারেজ দেয়।

ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement