US Under Sea Drone

টর্পেডো ছুড়ে শত্রুকে নাস্তানাবুদ, জল থেকে উঠে এসে ড্রোনহামলা! ‘টু- ইন-ওয়ান ব্রহ্মাস্ত্রে’ চমকাচ্ছে আমেরিকা

নৌযুদ্ধের যাবতীয় অঙ্ক বদলে ফেলতে এ বার ‘পরজীবী’ ড্রোন তৈরি করল আমেরিকার জনপ্রিয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাণকারী সংস্থা লকহিড মার্টিন। সমুদ্রের গভীরে থেকে একাধিক অভিযান ওই মানববিহীন যানটি পরিচালনা করতে পারবে বলে জানা গিয়েছে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:৫১
Share:
০১ ১৮

পরজীবীর মতো রণতরী বা ডুবোজাহাজের গায়ে লেগে থাকা। সেখান থেকেই ব্যাটারি চার্জিং। তার পর সুযোগ বুঝে শত্রুঘাঁটিতে চোরাগোপ্তা আক্রমণ! গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়ে নতুন বছরের গোড়ায় আরও এক ‘ব্রহ্মাস্ত্র’কে ফের প্রকাশ্যে আনল আমেরিকা। রুশনির্মিত সীমাহীন পাল্লার সমুদ্রের নীচের ড্রোনের পাল্টা জবাব দিতেই কি এই হাতিয়ার তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র? এর জবাব পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন দুনিয়ার তাবড় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।

০২ ১৮

ত প্রায় চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বার বার রণাঙ্গনের ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠেছে পাইলটবিহীন যান বা ড্রোন। গোড়ার দিকে যা কেবলমাত্র আকাশের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ ছিল। পরে সমুদ্রের নীচের মানববিহীন যান ব্যবহার করা শুরু করে মস্কো ও কিভের নৌবাহিনী। সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটির সাহায্যে চোখের নিমেষে ইউক্রেনীয় রণতরী ধ্বংস করেছে ক্রেমলিন। আবার রুশ অধিকৃত ক্রাইমিয়ার সেতুকে এর সাহায্যে নিশানা করতে দেখা গিয়েছে কিভের জলযোদ্ধাদের।

Advertisement
০৩ ১৮

রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে আরও এক ধরনের ড্রোন ব্যবহার হয়েছে। এর পোশাকি নাম আনম্যানড সারফেস ভেহিকেল বা ইউএসভি। মূলত শত্রুর জাহাজ, হেলিকপ্টার, এমনকি লড়াকু জেটকে নিশানা করতে এগুলির জুড়ি মেলা ভার। তা দেখে বিশ্লেষকদের অনেকেই ভেবেছিলেন, ড্রোনের লড়াইয়ে বেশ পিছিয়ে পড়েছে আমেরিকা। ঠিক তখনই সমুদ্রের নীচের মানববিহীন ‘গুপ্তঘাতক’দের সামনে এনে শক্তি প্রদর্শন করল যুক্তরাষ্ট্র। তা নিয়ে দুনিয়া জুড়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছে।

০৪ ১৮

মার্কিন নৌবাহিনীর বহরে শামিল হতে চলা সমুদ্রের নীচের ওই ড্রোনটির পোশাকি নাম মাল্টি-মিশন অটোনোমাস আন্ডারসি ভেহিকেল বা এমএমএইউভি। এটি তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় প্রতিরক্ষা সংস্থা লকহিড-মার্টিন। জলের নীচ থেকে উঠে এসে আর পাঁচটা পাইলটবিহীন যানের মতো শত্রুর উপর হামলা চালাতে পারে ওই হাতিয়ার। আবার একে জলের নীচের ক্ষেপণাস্ত্র বা টর্পেডোর মতো করেও ব্যবহার করতে পারবেন আমেরিকার নৌসেনা কমান্ডারেরা।

০৫ ১৮

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতর (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সূত্রে খবর, সমুদ্রের গভীরে দিব্যি গোপনে ঘুরে বেড়াতে পারে লকহিড-মার্টিনের ওই ড্রোন। শিকারের জন্য অপেক্ষা করা তার অন্যতম সহজাত প্রবৃত্তি। এক কথায় ওত পেতে বসে থেকে আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা রয়েছে সংশ্লিষ্ট এমএমএইউভির। পাশাপাশি, শত্রুকে ধোঁকা দেওয়া, নজরদারি এবং হামলার জন্য প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনগুলিতেও একে মার্কিন নৌবাহিনী ব্যবহার করতে পারবে বলে জানা গিয়েছে।

০৬ ১৮

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, আগামী দিনে ভারত-প্রশান্ত বা আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে বিস্তীর্ণ এলাকায় টহলদারি চালাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে ওই ড্রোন। সমুদ্রের গভীরের কৌশলগত এলাকাগুলির মানচিত্র তৈরিতেও এগুলিকে ব্যবহার করতে পারবে আমেরিকা। শুধু তা-ই নয়, মাল্টি-মিশন অটোনোমাস আন্ডারসি ভেহিকেলের সাহায্যে খুব অল্প কর্মীকে কাজে লাগিয়ে সেন্সর বিছোনো বা গুপ্তচরবৃত্তির কাজ চালানো ওয়াশিংটনের পক্ষে অনেক বেশি সহজ হবে, বলছে ওয়াকিবহাল মহল।

০৭ ১৮

সমুদ্রের নীচের এই ড্রোনটিকে ইতিমধ্যেই যুগান্তকারী আবিষ্কার বলে দাবি করেছে নির্মাণকারী মার্কিন সংস্থা লকহিড মার্টিন। তাদের কথায়, এটা আসলে একটা ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ মোডের সাবমার্সিবল। হাতিয়ারটিতে আলাদা করে ডুবোজাহাজ বা রণতরী বইতে হবে না। সেগুলির গায়ে এঁটুলি পোকার মতো সেঁটে থাকবে ওই মানববিহীন যান, যা তার ব্যাটারিকে চার্জ পেতে সাহায্য করবে। ফলে দীর্ঘ সময় সমুদ্রের গভীরে থাকতে পারবে একাধিক মিশনে ব্যবহারযোগ্য ওই ড্রোন।

০৮ ১৮

এই ড্রোনের ব্যাপারে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন লকহিড মার্টিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সেন্সর্‌স, এফেক্টরস অ্যান্ড মিশন সিস্টেমসের জেনারেল ম্যানেজার পল লেমো। তাঁর কথায়, ‘‘আধুনিক যুদ্ধের কথা মাথায় রেখে এই হাতিয়ারটির নকশা তৈরি করা হয়েছে। অস্ত্রটা একই সঙ্গে লুকিয়ে পড়তে পারে, আবার যে কোনও পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে তার। এর সাহায্যে আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে আমাদের বাহিনী।’’

০৯ ১৮

সমুদ্রের নীচে কাজ করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মানববাহিনী যানটিকে উইংম্যান ড্রোন হিসাবেও ব্যবহার করতে পারবে মার্কিন ফৌজ। অর্থাৎ, লড়াকু জেটের সঙ্গে উড়ে গিয়ে হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে মাল্টি-মিশন অটোনোমাস আন্ডারসি ভেহিকেলের। লকহিড মার্টিনের দাবি, এর রক্ষণাত্মক ভঙ্গিটিও ভারি চমৎকার। শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজেদের ড্রোনকে রক্ষা করার শক্তিও আছে সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটির।

১০ ১৮

সূত্রের খবর, আগামী দিনে একটি রণতরী বা ডুবোজাহাজে থাকবে এই ধরনের একাধিক ড্রোন। সমুদ্রের নীচের যানগুলির ‘মাদারশিপ’ হিসাবে কাজ করবে তারা। অপারেশন শেষ হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট রণতরী বা ডুবোজাহাজের গায়ে সুনির্দিষ্ট হ্যাঙ্গারে ফিরে আসবে ওই এমএমইইউভি। কোয়াড-থ্রাস্টার প্রোপালশন সিস্টেম, স্বায়ত্তশাসিত কম্পিউটার এবং অত্যাধুনিক সেন্সরের সাহায্যে ওই ড্রোনগুলি তৈরি হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

১১ ১৮

নবনির্মিত ড্রোনগুলির একটি ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই প্রকাশ করেছে লকহিড-মার্টিন। সেখানে সমুদ্রের গভীরে থেকে সংশ্লিষ্ট মানববিহীন যানকে একটি পঞ্চম প্রজন্মের স্টেল্‌থ শ্রেণির এফ-৩৫ লড়াকু জেটকে তথ্য পাঠাতে দেখা গিয়েছে। তার উপর ভিত্তি করে শত্রুর জাহাজে নিখুঁত নিশানায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারছে ওই যুদ্ধবিমান। তবে সমুদ্রের নীচের ড্রোনের গতিবেগ বা পাল্লা সংক্রান্ত কোনও তথ্য প্রকাশ করেনি ওই মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থা।

১২ ১৮

দ্য ইউরেশিয়ান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ড্রোনটিতে মোট দু’টি টিউব রয়েছে। এর একটির মাধ্যমে টর্পেডো হামলা চালাতে পারে ওই মানববিহীন যান। আর একটির সাহায্যে আকাশে উড়ে গিয়ে অন্যান্য পাইলটবিহীন যানের মতো কাজ করতে পারে ওই ‘ব্রহ্মাস্ত্র’। ড্রোনটির পিছন এবং পাশের দিকে দু’টি করে প্রপেলার লাগানো রয়েছে।

১৩ ১৮

গত বছরের (পড়ুন ২০২৫) অক্টোবরে একটি সামরিক হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে নতুন যুগের হাতিয়ার সম্পর্কে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি বলেন, ‘‘পরমাণু শক্তিচালিত স্বয়ংক্রিয় মনুষ্যবিহীন সাবমার্সিবল যান ‘পোসাইডন’ পরীক্ষায় সাফল্য মিলেছে। এর পাল্লা সীমাহীন।’’ তার ওই মন্তব্যের পরেই দুনিয়া জুড়ে পড়ে যায় হইচই।

১৪ ১৮

রুশ হাতিয়ার ‘পোসাইডন’-এর নির্মাণকারী সংস্থা হল রুবিন ডিজ়াইন ব্যুরো। ২০১৫ সালে এর নকশা তৈরির কাজ শুরু করে মস্কো। ২০২৩ সালে প্রথম বার এ ব্যাপারে সাফল্য পায় ক্রেমলিন। মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট নেটোর (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) দাবি, ২০২৪ সাল থেকে পুতিন নৌবাহিনীর বহরে রয়েছে সংশ্লিষ্ট হাতিয়ার। যদিও সংশ্লিষ্ট অস্ত্রটির ব্যাপারে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ্যে আনেনি পূর্ব ইউরোপের ওই দেশ।

১৫ ১৮

রুশ নৌবাহিনীতে ‘পোসাইডন’-এর কোড নাম স্টেটাস-৬। নেটো-ভুক্ত দেশগুলির কাছে সংশ্লিষ্ট অস্ত্রটি আবার ক্যানিয়ন নামে পরিচিত। প্রথাগত বিস্ফোরক এবং পরমাণু হাতিয়ার, দু’ধরনের ওয়ারহেড বহনেরই সক্ষমতা রয়েছে ‘পোসাইডন’-এর। সমুদ্রের হাজার মিটার গভীরে সর্বোচ্চ ১০০ নটিক্যাল মাইল গতিবেগে ছুটতে পারে পুতিনের এই অস্ত্র, যেটা ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ থেকে ১৮৫ কিলোমিটার।

১৬ ১৮

রুশ প্রেসিডেন্টের ‘পোসাইডন’ আস্ফালনের কয়েক মাসের মাথায় যুক্তরাষ্ট্র সমুদ্রের নীচের নতুন ড্রোন বাজারে আনায় স্বাভাবিক ভাবেই দু’টি অস্ত্রের মধ্যে তুলনা টানা শুরু হয়ে গিয়েছে। যদিও সাবেক সেনাকর্তাদের বড় অংশেরই দাবি, দু’টি হাতিয়ার দু’ধরনের। ফলে অভিযানভেদে যে তাদের জাত চেনা যাবে, তা বলাই বাহুল্য।

১৭ ১৮

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র বা নেটো-ভুক্ত কোনও রাষ্ট্রের পরমাণু হামলার কথা মাথায় রেখে ‘পোসাইডন’ তৈরি করেছেন পুতিন। বিমানবাহী রণতরী-সহ একগুচ্ছ যুদ্ধজাহাজকে উড়িয়ে দেওয়া, নৌসেনা ঘাঁটি বা গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে হামলার জন্য একে ব্যবহার করতে পারে ক্রেমলিন। তবে এর সাহায্যে গুপ্তচরবৃত্তি বা সমুদ্রের গভীরে বিস্তীর্ণ এলাকায় নজরদারি সম্ভব নয়। কেবলমাত্র ডুবোজাহাজ থেকেই ছোড়া যায় এই ‘পোসাইডন’।

১৮ ১৮

অন্য দিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সমুদ্রের নীচের ড্রোনটি পরজীবীর মতো রণতরী এবং ডুবোজাহাজ দু’টি জায়গাতেই আটকে থাকতে সক্ষম। সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটি ব্যাটারিচালিত হওয়ায় এর পাল্লা সীমাহীন নয়। তা ছাড়া এর সাহায্যে কোনও পরমাণু আক্রমণ শানাতে পারবে না আমেরিকা। তবে ড্রোনটিকে জল ও আকাশ দু’জায়গায় ব্যবহারের সুযোগ পাবে তারা।

সব ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement