সাঁড়াশি আক্রমণ।
এক দিকে, টানা দু’মাস সরাসরি কমলো দেশের শিল্পোৎপাদন। অন্য দিকে, ফের মাথাচাড়া দিল মূল্যবৃদ্ধি। এই নিয়ে টানা ছ’মাস। পৌঁছে গেল ১৭ মাসের মধ্যে সবচেয়ে উঁচুতে। তার উপর অর্থনীতি এই জোড়া ধাক্কা খেল এমন দিনে, যখন দেশের অর্থনীতির পোক্ত ভিতের উপরে আস্থা রাখতে বললেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। দিনের শেষে তাই ওই দাবি নিয়ে ফের প্রশ্ন তুললেন বিশেষজ্ঞরা।
শুক্রবার কেন্দ্রের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডিসেম্বরে ফের সঙ্কুচিত হয়েছে শিল্প। সরাসরি শিল্পোৎপাদন কমেছে ১.৩%। তার থেকেও খারাপ খবর মূলধনী পণ্য এবং উৎপাদন শিল্পের বেহাল দশা। মূলধনী পণ্য সাধারণত ব্যবহার হয় অন্য পণ্যের উৎপাদনে। তাই আগামী দিনে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা কেমন হবে, তার আঁচ মেলে মূলধনী পণ্যের উৎপাদন-পরিসংখ্যানে। দেখা যাচ্ছে, ডিসেম্বরে তা কমেছে ১৯.৭%। কল-কারখানায় উৎপাদনের হাল ফিরছে বলে এ দিনও দাবি করেন জেটলি। অথচ তথ্য দেখাচ্ছে, আলোচ্য মাসে সেখানেও উৎপাদন কমেছে ২.৪%। চোখে পড়ার মতো ভাল ফল শুধু দীর্ঘ দিন ব্যবহারের উপযোগী ভোগ্যপণ্যের। উৎপাদন বেড়েছে ১৬.৫%।
এর পাশাপাশি অস্বস্তির কাঁটা হিসেবে উদয় হয়েছে খুচরো বাজারে মূল্যবৃদ্ধির হার। জানুয়ারিতে আগের বছরের ওই একই সময়ের তুলনায় জিনিস-পত্রের দাম বেড়েছে ৫.৬৯%। মূল্যবৃদ্ধির যে হার ২০১৪ সালের অগস্টের পরে সব থেকে বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল্যস্ফীতির এই হার আশঙ্কাজনক নয়। কিন্তু এ ভাবে মুখ তোলা অর্থমন্ত্রীর কাছে ভাল খবরও হতে পারে না। কারণ একে এই হার ১৭ মাসে সব থেকে বেশি। তার উপর তা বেড়েছে মূলত খাদ্যপণ্যের দাম চড়ার কারণে। তাই এখনও তা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের লক্ষ্যমাত্রার (৬%) মধ্যে থাকলেও, শিল্পকে চাঙ্গা করতে এখনই সুদ কমানো শক্ত হবে তাদের পক্ষে।
বৃহস্পতিবার ধস নেমেছিল ভারতের শেয়ার বাজারে। ৮০৭ পয়েন্ট খুইয়েছিল সেনসেক্স। তারপরে এ দিন লগ্নিকারীদের আশ্বস্ত করতে জেটলি বলেন, টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতির প্রভাব ভারতে পড়ছে ঠিকই। কিন্তু তা বলে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তাঁর যুক্তি, দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত। তার উপর আস্থা রাখতেই পারেন লগ্নিকারীরা। এ প্রসঙ্গে কল-কারখানায় উৎপাদন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে বলেও দাবি করেন তিনি। আগের দিন ৭.৬% বৃদ্ধির পূর্বাভাস তুলে ধরে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বলে দাবি করেছিলেন কেন্দ্রীয় আর্থিক বিষয়ক সচিব শক্তিকান্ত দাসও।
অর্থনীতির উজ্জ্বল মুখ তুলে ধরে দিল্লি যতই আশ্বাস দিক, এ দিন প্রশ্ন উঠেছে তার সারবত্ত্বা নিয়ে। শিল্পমহল এবং বণিকসভাগুলিরও দাবি, কল-কারাখানায় চাকা দ্রুত ঘোরাতে অবিলম্বে পদক্ষেপ করুক কেন্দ্র।
৮ ফেব্রুয়ারি বৃদ্ধির পূর্বাভাসে কেন্দ্র দেখিয়েছিল, এ বছর কল-কারখানায় উৎপাদন আগের বারের (৫.৫%) থেকে বাড়বে অনেক দ্রুত (৯.৫%)। তখনই প্রশ্ন ওঠে, প্রতি মাসে যে শিল্প-সূচক কেন্দ্র প্রকাশ করে, তার বড় অংশ জুড়ে থাকে কল-কারখানায় পণ্য তৈরি বৃদ্ধির প্রভাব। বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, বিপুল ফারাক দেখা যাচ্ছে এই দুই হিসেবের মধ্যে। পূর্বাভাস অনুযায়ী জোয়ার এসেছে উৎপাদন শিল্পে। আর শিল্প সূচককে সত্যি মানলে কল-কারাখানায় উৎপাদন এখনও ঝিমিয়ে!
নভেম্বরের পরে ডিসেম্বরেও শিল্পে সঙ্কোচন (বিশেষত কল-কারখানায় উৎপাদনের বেহাল দশা) সেই প্রশ্নকে জোরালো করেছে। ফের জিজ্ঞাসা চিহ্ন ঝুলিয়েছে ৭.৬% বৃদ্ধির দাবির উপরেও।
অনেকের মতে, বৃদ্ধি যেটুকু হচ্ছে, তা-ও ভুল পথে হেঁটে। কারণ, লগ্নি কম হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে না স্থায়ী সম্পদ। বদলে ধারের টাকায় ভোগ-ব্যয় হচ্ছে বেশি। যা দ্রুত উস্কে দেবে মূল্যবৃদ্ধিকে। এ দিন পরিসংখ্যানে সেই আশঙ্কাও মিলেছে। দেখা যাচ্ছে, মূলধনী পণ্য উৎপাদন তলানিতে। অথচ লাফিয়ে বেড়েছে দীর্ঘমেয়াদি ভোগ্যপণ্য তৈরি। মাথা তুলেছে মূল্যবৃদ্ধিও। সুতরাং সব মিলিয়ে, এ দিনের পরিসংখ্যান বাজেট তৈরিতে অর্থমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জ অনেকখানি বাড়িয়ে দেবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।