ছবি: সংগৃহীত।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার (ফরেক্স) বাঁচাতে এক বছর দেশবাসীকে সোনা কেনায় লাগাম পরানোর আর্জি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আর্জি জানিয়েছেন, এক বছর যাতে দেশবাসী হলুদ ধাতুর মোহ ত্যাগ করেন। গত সপ্তাহে মোদীর এই আবেদনের পর বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। প্রশ্ন উঠছে, তা হলে বিয়ের গয়নাও কেনা যাবে না? দিওয়ালিতে উৎসবের কেনাকাটা নয়? উপহার হিসাবে সোনার মুদ্রা নয়? এমন একটি দেশে এ সব কথা অবাস্তব শোনাতে পারে যেখানে বিয়ে, ঐতিহ্য এবং পারিবারিক সঞ্চয়ের সঙ্গে সোনা ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। এক বছর সোনা কেনা নিষিদ্ধ, তেমন কথা বলেননি প্রধানমন্ত্রী। তিনি দেশবাসীর কাছে আর্জিই জানিয়েছেন কেবল।
কিন্তু এই আবহে এই প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে, সত্যিই যদি দেশবাসী এক বছর সোনা কেনা বন্ধ করেন, তা হলে কী হবে? অর্থনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, স্বল্প মেয়াদে এর প্রভাব তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। ‘ইনফোমেরিকস রেটিংস’-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ মনোরঞ্জন শর্মা সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে-কে বলেছেন, ভারতের জ্বালানি-বহির্ভূত আমদানি করা পণ্যগুলির মধ্যে সোনা অন্যতম। এর ক্রয়ে বড় ধরনের হ্রাস অর্থনীতির বাহ্যিক ভারসাম্যের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্য ভাবে কমাতে পারে। তাঁর কথায়, “যদি ভারতীয় পরিবারগুলি এক বছরের জন্য সোনা কেনা বন্ধ করে দেয়, তা হলে চলতি কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি ব্যাপক ভাবে কমে আসবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি কমলে তা বাহ্যিক অর্থায়নের চাপও কমাবে। আস্থা বাড়াবে বিনিয়োগকারীদের। ভারতীয় রুপিও শক্তিশালী হবে। রুপি শক্তিশালী হলে তা আমদানিজনিত মুদ্রাস্ফীতির চাপও কমাতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। কারণ, ভারত অপরিশোধিত তেলসহ অনেক পণ্য ডলারে কেনে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানিয়েছেন, সোনা আমদানির জন্য প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়। চলতি হিসাবের ঘাটতি কমলে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারও রক্ষা করা সম্ভব হবে। স্বর্ণ আমদানি উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পেলে ভারতের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি জিডিপির ০.৪–০.৬ শতাংশে সঙ্কুচিত হতে পারে, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
ভারতের পারিবারিক সঞ্চয়ের ধরন ইতিমধ্যেই ভৌত সম্পদ থেকে সরে গিয়ে আর্থিক পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। পারিবারিক সঞ্চয়ে ভৌত সম্পদের অংশ ২০১২ সালের ৫৫ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে প্রায় ৩৮-৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ২০২৫ সালের শুরুর দিকে মিউচুয়াল ফান্ডে এসআইপি (এসআইপি) বাবদ মাসিক অর্থপ্রবাহ ২৫,০০০-২৬,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। ডিম্যাট অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ১৮ কোটি অতিক্রম করেছে। ফলে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভারতের বার্ষিক সোনা কেনার খরচের ২০ শতাংশও যদি শেয়ার বাজার এবং মিউচুয়াল ফান্ডের দিকে সরে যায়, তবে তা পুঁজি বাজারকে আরও গভীর করবে। ভারতীয় ব্যবসার জন্য মূলধনের খরচ কমিয়ে আর্থিক ব্যবস্থাকে কাঠামোগত ভাবে শক্তিশালী করতে পারে।