কৃষি, শিল্প, পরিকাঠামো থেকে শুরু করে আর্থিক বৃদ্ধি। অর্থনীতির স্বাস্থ্য বিচারের অনেক মাপকাঠিতেই পশ্চিমবঙ্গ জাতীয় হারকে পিছনে ফেলে দিয়েছে বলে ফের দাবি করলেন অর্থ, শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী অমিত মিত্র। কিন্তু একই সঙ্গে, তাঁর ‘স্বীকারোক্তি’, রাজ্য সম্পর্কে এই সমস্ত ভাল খবরের অধিকাংশই শিল্পমহল জানে না। বিধানসভায় কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু জরুরি এই তথ্যগুলি না কি পৌঁছয়ইনি সম্ভাব্য লগ্নিকারীদের কানে।
স্বাভাবিক ভাবেই শিল্পমহলের প্রশ্ন, তবে আর এত ঘটা করে শিল্প সম্মেলন করে লাভ কী? কী লাভ এত কমিটি গড়ে? বিনিয়োগের আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে রাজ্যকে তুলে ধরতে এ সব খবরই যদি শিল্পমহলের কানে পৌঁছে দেওয়া না-যায়, তবে আর লগ্নি আসবে কী ভাবে?
বৃহস্পতিবার বণিকসভা বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্সের সভায়, রাজ্যের অর্থনীতি সম্পর্কে আশার ছবি আঁকার চেষ্টা করেছেন অমিতবাবু। দাবি, করেছেন, ‘‘নতুন পদ্ধতিতে মাপা বৃদ্ধির হার (২০১৪-’১৫) দেশে যেখানে ৭.৫%, সেখানে রাজ্যে তা ১০.৮%।’’ একই ভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রেও রাজ্যের এগিয়ে থাকার পরিসংখ্যান পেশ করেছেন তিনি। কিন্তু যত বারই তা করেছেন, প্রায় তত বারই তাঁর বক্তব্য শুরু হয়েছে শিল্পমহলের সেই খবর না-জানার সম্ভাবনা ধরে নিয়ে। প্রায় প্রত্যেক বারই তিনি বলেছেন, ‘‘আপনাদের অনেকেই হয়তো জানেন না...।’’
এক শিল্পকর্তার সরস টিপ্পনি, ‘‘প্রথমত একই পরিসংখ্যানের চর্বিত চর্বণ অনেকেরই জানা। আর যদি জানা না-হয়, তবে তো অভিযোগের আঙুল সরকারের দিকে ওঠার কথা।’’ অনেকেরই প্রশ্ন, ঝুলিতে এত সব ভাল তথ্য থাকতেও লগ্নিকারীদের সামনে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে রাজ্য এত দিন তা জানাতে তৎপর হয়নি কেন?
অমিতবাবু বলেছেন, ‘‘আপনারা অনেকেই জানেন না যে, গত চার বছরে রাজ্য কতটা এগিয়েছে।’’ আবার কখনও দাবি করেছেন, ২০১০-’১১ সালে পরিকল্পনা খাতে খরচ যেখানে ১৪,১৬৫ কোটি টাকা ছিল, সেখানে ২০১৪-’১৫ সালে তা হয়েছে ৪৪,০৭৪ কোটি। তবে একই সঙ্গে মেনে নিয়েছেন, ‘‘বিধানসভায় এ সব তথ্য পেশ করা হয়েছে। কিন্তু আপনাদের জানানো হয়নি!’’
আর এ জন্যই ধন্দে পড়ে যাচ্ছেন শিল্পপতি ও বণিকসভার প্রতিনিধিরা। তাঁদের প্রশ্ন, তবে কি মন্ত্রী মেনেই নিচ্ছেন যে কমিটি গড়া, শিল্প সম্মেলন আয়োজন, লগ্নি আনতে বিদেশ যাত্রা, এই সব কিছুর পরেও শিল্পমহলের সঙ্গে কোথাও ব্যবধান সেই থেকেই গিয়েছে?
রাজ্যের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরায় খামতির কারণে বহু বার অভিযোগের মুখে পড়েছে পূর্বতন বাম সরকার। বলা হয়েছে, বন্ধ-জঙ্গি শ্রমিক আন্দোলন-জমি জট ইত্যাদি কারণে তৈরি হওয়া মলিন ভাবমূর্তিই এ রাজ্যে বড় শিল্প আসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিআইআই থেকে শুরু করে উপদেষ্টা সংস্থা পিডব্লিউসি, আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং— সকলের রিপোর্টেই বারবার উঠে এসেছে এই মলিন ভাবমূর্তির সমস্যার ছবি।
ফলে এ দিন অমিতবাবুর কথা শুনে অনেকের প্রশ্ন, মন্ত্রীই যদি বলেন যে রাজ্যের ভাল পরিসংখ্যানগুলি আপনারা হয়তো জানেন না, তা হলে সেখানে কেউ লগ্নি করবে কেন? কী ভাবে মোরামত হবে ভাবমূর্তি?
এবং রাজ্যের ইতিবাচক দিক যে রয়েছে তা বলছে শিল্পমহলও। এ দিনই বেঙ্গল চেম্বারের নবনিযুক্ত প্রেসিডেন্ট অম্বরীশ দাশগুপ্ত বলছিলেন, ‘‘শিল্পায়নের জন্য মেধাসম্পদ থেকে শুরু করে যাবতীয় উপকরণ রাজ্যে মজুত। তা তুলে ধরতে প্রয়োজন সঠিক ব্র্যান্ডিং।’’
অমিতবাবু আবার জানান, সাধারণ শিল্পের জন্য যেমন এক-জানালা ব্যবস্থা (শিল্পসাথি মডেল) চালু করা হয়েছে, তেমনই তৈরি করা হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের জন্যও। এক মাসের মধ্যেই তা ঘোষণা করা হবে বলে তাঁর দাবি।