দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরুর মতো শহরের পাশাপাশি এ বার স্টার্ট-আপ বা সদ্যোজাত সংস্থায় লগ্নির সুযোগ নিতে এগোচ্ছে কলকাতাও। বিত্তবান লগ্নিকারীরা সরাসরি এ ধরনের সংস্থায় পুঁজি ঢেলে তার কিছুটা শেয়ার হাতে নিচ্ছেন, বা উদ্যোগ-পুঁজি (ভেঞ্চার ফান্ড) সংস্থায় বিনিয়োগ করে যোগ দিচ্ছেন দেশ জোড়া স্টার্ট-আপ বিপ্লবে। ভেঞ্চার ফান্ডগুলি তাদের তহবিল খাটায় ওই সমস্ত নতুন সংস্থাতেই।
শেয়ার, সোনা বা জমি-বাড়িকে টক্কর দিয়ে আনকোরা নতুন সংস্থায় লগ্নির এই ঝোঁক হালে সারা দেশেই গতি পেয়েছে। রতন টাটা, নারায়ণমূর্তি, মোহনদাস পাই থেকে শুরু করে অনেকেরই পছন্দের লগ্নি-ঠিকানা এখন স্টার্ট-আপ। সংস্থা শেষ পর্যন্ত নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে কি না, সেই ঝুঁকি ১০০%। তবু ভবিষ্যতে মোটা লাভের আশায় কোটিপতিরা বাজি রাখছেন সেখানে।
বেঙ্গালুরু, দিল্লি, মুম্বইয়ের মতো শহরে লগ্নির এই নতুন দরজার সামনে ইতিমধ্যেই লম্বা লাইন। কলকাতা তুলনায় পিছিয়ে। তবে এখানেও বাড়ছে স্টার্ট-আপে লগ্নিকারীর সংখ্যা। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, দৌড় শুরু হয়েছে ভাল ভাবেই। দু’বছর আগেই তৈরি হয়েছে লগ্নিকারীদের সংগঠন ক্যালকাটা এঞ্জেল নেটওয়ার্ক। যারা শুধু নতুন সংস্থায় পুঁজি ঢালে। তৈরি হয়েছে প্রাইমার্ক আইভেঞ্চার, ট্রাইটন ইনভেস্টমেন্টস-এর মতো উদ্যোগ-পুঁজি সংস্থাও।
তবে স্রেফ রাজ্যে নয়, ভিন্ রাজ্যের উদ্যোগ-পুঁজি সংস্থায়ও টাকা ঢালছেন পশ্চিমবঙ্গের লগ্নিকারীরা। এঁদেরই একাংশ মুম্বইয়ের সংস্থা ইউনিকর্ন ইন্ডিয়া ভেঞ্চার্স সংস্থায় প্রাথমিক তহবিলের ২৫% জুগিয়েছেন। সংস্থার অন্যতম কর্তা ভাস্কর মজুমদারের দাবি, নতুন এই সুযোগ নিতে উৎসাহী কলকাতা। তিনি বলেন, ‘‘প্রথম দফায় কলকাতা থেকে ১২ কোটি টাকা উঠেছে। এর মধ্যে বিত্তবান ব্যক্তিদের পাশাপাশি রয়েছে সিমপ্লেক্স-এর মতো সংস্থাও।’’
ঝুঁকির কথা মানছেন প্রাইমার্ক আইভেঞ্চারের প্রধান সিদ্ধার্থ পাসারি। তাঁর যুক্তি, ‘‘সব নতুন সংস্থাই লাভের মুখ দেখবে না। তবুও নতুন ভাবনা-চিন্তা ও মেধা-সম্পদ দেখে স্টার্ট-আপে লগ্নি করা হয়। কারণ ৫টির মধ্যে একটি বাজিমাত করতেই পারে।’’ ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ১২টি সংস্থায় পুঁজি ঢেলেছে তাঁর সংস্থা।
ক্যালকাটা এঞ্জেল নেটওয়ার্কস-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রাঘব কানোরিয়ার দাবি, মানসিকতা বদলাচ্ছে। ধীরে হলেও রাজ্যে তৈরি হচ্ছে নতুন সংস্থা তৈরির পরিবেশ। এ রকম ১০টির বেশি সংস্থায় পুঁজি ঢেলেছে সংগঠনটি। তাঁর মতে, নতুন ভাবনা-চিন্তার সঙ্গে বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক মডেল যোগ করতে পারলে ঝুঁকি কমে।
নতুন সংস্থায় সাধারণত তিন থেকে আট বছরের জন্য ১৫-২০% শেয়ারের পরিবর্তে টাকা ঢালেন লগ্নিকারীরা। পুঁজি ঢালার প্রথম ধাপে টাকার অঙ্ক কম থাকলেও ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। পরের ধাপে সংস্থার ব্যবসায়িক মডেল লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা অনুযায়ী লগ্নি করা হয়। তবে সাফল্য তখনই আসে, যখন মোটা টাকা লগ্নি করে নামজাদা কেউ শেয়ার কেনেন, বা অন্য কোনও সংস্থা মোটা দামে কিনে নেয় স্টার্ট-আপকে, কিংবা বাজারে শেয়ার ছাড়ার মতো জায়গায় পৌঁছতে পারে সংস্থাটি। বিনিয়োগকারীর লাভের অঙ্ক সে ক্ষেত্রে বহু গুণ বাড়ে।
তবে ভারতে যত প্রযুক্তি সংক্রান্ত স্টার্ট আপ তৈরি হয়, তার মাত্র ১০ শতাংশের শিকড় কলকাতা-সহ পূর্বাঞ্চলে। যেখানে বেঙ্গালুরুতে ৪০%। দিল্লিতে ২০%। পুণে-মুম্বইয়ে ১৫%। গত এক দশকে ৩০০ কোটি ডলার ঢা়লা হয়েছে ৩০০০টি স্টার্ট-আপ সংস্থায়। এর মধ্যে ৯০% বিদেশি উদ্যোগ-পুঁজির তহবিল থেকে এসেছে। যার ছিটেফোঁটা এসেছে এ রাজ্যে।
ন্যাসকমের অবশ্য দাবি, পুঁজির সমস্যা ক্রমশ কমছে। স্থানীয় শিল্পপতিরা এগিয়ে আসায় এলাকার নতুন সংস্থাগুলিতে প্রাথমিক পুঁজির অভাব হচ্ছে না।