খুব চাই, ছাত্রদিবস নামেও একটা দিন হোক, শিক্ষকরা উদ্‌যাপন করি

দায়সারা আর দায় নেওয়ার মধ্যে ফারাকটা বুঝলাম কই! প্রশ্ন তৈরি করে পড়াই, শেখাতে পারি কই! লিখছেন বীরু বর্মণ একটা কলম..একটা গোলাপ..ও একটি মিষ্টি! শিক্ষক দিবসে আমার পরম প্রাপ্তি। বছরের কেবল একটি দিন, পাঁচ সেপ্টেম্বর, আমার জন্যে। বছরে যে মাত্র একটাই শিক্ষক দিবস।

Advertisement
শেষ আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০২:০৭
Share:

ছবি: সংগৃহীত

বছরে একটাই শিক্ষক দিবস...।

Advertisement

একটা কলম..একটা গোলাপ..ও একটি মিষ্টি! শিক্ষক দিবসে আমার পরম প্রাপ্তি। বছরের কেবল একটি দিন, পাঁচ সেপ্টেম্বর, আমার জন্যে। বছরে যে মাত্র একটাই শিক্ষক দিবস। আজ আরও একবার আমার শিক্ষক সত্তার আয়ুবৃদ্ধি হল।

ক্লাসরুমের নোনা ধরা দেওয়াল, জং ধরা গ্রিল, খসে পড়া জানলা, নড়বড়ে বেঞ্চে উঁকি দেওয়া অগুন্তি পেড়েকের মাথা, দুর্বল একটা প্লাস্টিকের চেয়ার এবং ক্রমাগত ক্ষয়িষ্ণু প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া, এই তো আমার সম্বল। এটাই আমার স্কুল! অনামী ধুঁকতে থাকা একটা প্রান্তিক শিক্ষাঙ্গন।

Advertisement

আর তার সঙ্গে যোগ হয়, পেশাগত বঞ্চনা, সরকারি উদাসীনতা, তাচ্ছিল্য, অপমান, খামখেয়ালিপনার জাঁতাকলে আমার এবং আমার ছাত্রদের সঙ্কটে ভরা অস্তিত্ব।

কিন্তু সেই সঙ্কটের মেঘই কি কাটে এই দিন? অন্তত একটি দিনের জন্য? মাত্র দশ টাকা করে চাঁদা তোলার মধ্যে দিয়ে দেখেছি ওদের উপচে পড়া নিখাদ ভালবাসা। কী সুন্দর গুছিয়ে ওরা আমার হাতে তুলে দেয় উপহার! শিক্ষক দিবসে আমাকে খুশি করার আপ্রাণ চেষ্টা ও বিপুল উন্মাদনার মাঝে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি ! চোখ বন্ধ করতেই উপহার প্রাপ্তির আত্ম-শ্লাঘার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ আত্ম সমীক্ষাও কড়া নেড়ে গেল বিবেকের দ্বারে!

সাড়ে দশটা থেকে সারে চার, মাস শুরু হলে শেষ হওয়ার অপেক্ষার মাঝে আমার একশো ভাগটা ওদের জন্য দিতে পারলাম কই! স্টাফ রুমে হাই তুলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ক্যালেন্ডারের সঙ্গে ছুটির তালিকা মেলাই বছরের শুরুতেই। অ্যাডভান্স প্রশ্ন তৈরি করে পড়াই, শেখাতে পারি কই? পূর্ব নির্ধারিত প্রাপ্য ছুটির হিসেব করে আমার পাঠ্যক্রম আগাম শেষ হয়ে যায়, ওদের হল কই?

গত বছরের কেনা চকগুলো আজও শেষ হল না, ব্ল্যাকবোর্ড অব্যবহারে ধূসর হল, জবাব দিলাম কই! শিক্ষার পাইকারি বেসাতি বন্ধ হল না আজও। প্রাপ্য ছুটি, বাড়তি ছুটি, হঠাৎ ছুটির ক্যালকুলেশানে শিক্ষা দিবস ভ্যানিস। খারাপ লাগল কই! ক্লাসরুমের পিছনের ফাঁকা বেঞ্চগুলোতে ধুলো জমে। ক্লাস এইটের পর ছাত্ররা আর কলরব করে না। হঠাৎ ওরা বড় হয়ে যায়। রাস্তার ধারে বেগার খাটে। চোখাচোখি হতেই মুখ লুকায়।

দায়সারা আর দায় নেওয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাকটা আর বুঝলাম কই! তবুও, শিক্ষক নামে প্রজাতির শিরায় শিরায় বয়ে চলে হার না মানা জেদ, সততা এবং সারল্য। বঞ্চনা, যন্ত্রণা, অভিযোগ, অভাব, অজুহাত, অপমান ছাপিয়ে আজ বড় হয়ে ওঠে আমার শিক্ষক সত্তা, আমার সম্ভ্রম।

আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে কোনও এক শিক্ষক দিবসে, ক্লাস এইটের এক ছাত্রী একটি উপহার এনেছিল আমার জন্যে, একটি কফি মাগ। খুব বিব্রত বোধ করছিলাম। বস্তি এলাকার খেটে খাওয়া ছাপোষা অভিভাবকরা খুবই দরিদ্র হয়। ফিরিয়ে দিতেই মেয়েটি কাঁদতে শুরু করে। পড়াশোনায় মন ছিল না একেবারেই ছাত্রীটির। সেজন্যই ইচ্ছে করেই বলে ফেলেছিলাম— ‘‘ফিফটি পার্সেন্ট পেয়ে দেখা দেখি ! তবেই নেব!’’

এক বছর পরে সে দেখা করেছিল উপহারটা নিয়ে। সঙ্গে সেই মার্কশিটটা। ঘুণাক্ষরেও মনে ছিল না উপহারটার কথা। সেদিন আমার দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়েছিল। চরম উপলব্ধির হদিশ পেয়ছিলাম সে দিন। শিক্ষকতা নিছক পেশা নয়, একটা মহান ব্রত, একটা চ্যালেঞ্জ, একটা আবেগ। এ সব যে শুধু কথার কথা নয়, সে দিন তা মর্মে মর্মে বুঝতে পারলাম।

গলার রগ ফুলিয়ে ইচ্ছে করে বলতে ‘‘হ্যাঁ, শিক্ষক আমি! ধন্য আমার শিক্ষকতা তোদেরই জন্য!’’ উপহারটা আজও আমার কাপবোর্ড থেকে নামিয়ে আলগোছে মুছে আবার সাজিয়ে রেখে দিই যথাস্থানে।

একটা দম ফুরিয়ে যাওয়া ফ্যানের কিচ কিচ শব্দে বাতাস খুঁজে নেওয়া আমার কতিপয় ছাত্রছাত্রীরা এখনও পর্যন্ত স্কুলে আসে নিয়মিত। নিজেকে সঁপে দেয় আমার কাছে। আমার স্নেহ ভালবাসা ও ভরসার শক্ত আঙুলটা ধরতে চায়। আকাচা ইউনিফর্ম থেকে নির্গত ঘামের বোঁটকা গন্ধে আমার ক্লাসরুমটা এখনও গুমোট হয়ে যায়নি, এটাই রুপোলি রেখা। দুর্গন্ধ অভ্যাসে পরিণত করলে নাকে লাগে না...নিজের বলে মনে হয়। আর মনে হয় বলেই কষ্ট হয়! নিজেকে উজার করে দিতে চাই। ওদের জন্য।

নামী স্কুলের শিক্ষকদের কাজটা অনেক সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যের। বাঁশিটা কেবল বাজাতে হয়। রেডিমেড পটু দৌড়বাজরা ভিক্টরি লাইনটা ঠিক খুঁজেই নেয়। ওরা খবর হয়। উজ্জ্বল হয়ে ভাসে টিভির পর্দায় পর্দায়, কাগজের পাতায় পাতায়। কিন্তু পিছনের সারিতে থাকা প্রথম প্রজন্মের সহস্র পড়ুয়াদের খবর কেউই রাখে না, রাখেওনি কোনও দিন।

ঝাঁ চকচকে পোক্তদুয়ার আঁটা বহু নামী হাই প্রোফাইল স্কুলের ভিতরটা বাইরে থেকে জানা সম্ভব নয়। কিন্তু যে দরজাটার একটা পাল্লাই নেই, সেই দুর্বল দুয়ারে খিল দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধরে রাখাটাই চ্যালেঞ্জ। দরজাটা অর্ধেক খোলা...নাকি অর্ধেক বন্ধ...বিতর্ক অবশ্য চলতেই পারে।

খুব চাই, আর একটা দিন হোক্ .. ছাত্রদিবস! আরও একটা দিন...আমরা শিক্ষকরা উদ্‌যাপন করি!

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement