গড়িয়ার শ্মশানে যে মৃতদেহগুলি আনা হইয়াছিল, ফিরাইয়াও লইয়া যাওয়া হইয়াছিল, ধাপার শ্মশানে সেইগুলির সৎকার হইয়াছে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের পারস্পরিক যোগাযোগে যাহা মিটিয়া যাইবার কথা, তাহাই হাতের বাহিরে চলিয়া গেল। মৃতদেহের গলায় আঁকশি বিঁধাইয়া মাটিতে ঘষটাইয়া লইয়া যাইতেছেন সৎকার-সহায়কেরা, কোভিড-১৯’এর আবহে এই দৃশ্য প্রবল আতঙ্ক ও বিক্ষোভের জন্ম দিবে, আশ্চর্য কী। প্রত্যক্ষদর্শীর তোলা ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ছড়াইয়া গেল, রাজ্যপাল জবাবদিহি চাহিলেন, বিরোধী দল প্রতিবাদ জানাইল, হাসপাতাল পুলিশ ও পুরপ্রশাসন ব্যতিব্যস্ত হইল, রাজ্য স্বরাষ্ট্র দফতর বিবৃতি দিল। জল বিস্তর ঘোলা হইয়া এখন স্থির হইতেছে, তবে এই দুঃসহ সময়ে এমন একটি ঘটনাক্রম রাজ্যবাসীকে আশ্বস্ত করিল না।
কোভিড পরিস্থিতি লইয়া এক জনস্বার্থ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গ-সহ চারটি রাজ্যকে নোটিস পাঠাইয়াছে— করোনায় মৃত রোগীদের যথাযথ ব্যবস্থা হইতেছে না। গড়িয়ার ঘটনায় মৃতদেহগুলি করোনায় নহে, দুর্ঘটনায় মৃত ও দাবিদারহীন ছিল। বেওয়ারিশ মৃতদেহ একটি সময় পর্যন্ত রক্ষণের পর পুলিশ ও পুরসভার হস্তক্ষেপে সৎকারের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রহিয়াছে। গাড়িতে করিয়া ঢাকা অবস্থায় মৃতদেহ শ্মশানে আনিয়া, ঠেলাগাড়িতে উঠাইয়া চুল্লির কাছে লইয়া আসা বিধেয়। পুলিশ আইনও বলে, মৃতদেহের সৎকার করিতে হইবে নৈতিকতা ও মানবাধিকার অক্ষুণ্ণ রাখিয়া। কাহারও মৃত্যু দুর্ঘটনাতেই হোক কি কোভিডে, তাঁহার আত্মীয়-বন্ধু থাকুক বা না থাকুক, সসম্মান সৎকার মৃতের প্রাপ্য। মৃতের অধিকার বলিয়াই নহে, মৃতের প্রতি জীবিতের মানবিকতার নিদর্শন হিসাবেও ইহা জরুরি। গড়িয়ার ঘটনায় মৃতের সম্মান ও জীবিতের মানবিকতা, দুই-ই ধূলিসাৎ হইয়াছে। পচা-গলা মৃতদেহের দাবিদার নাই বলিয়া যে রূপে তাহাদের লইয়া যাওয়া হইল, তাহা চূড়ান্ত অসংবেদনশীল, নিষ্ঠুর। প্রত্যক্ষদর্শী নাগরিকদের পক্ষে মৃতদেহগুলি কোভিড-রোগীর ভাবিয়া লওয়া কি অযৌক্তিক? অভিযোগ উঠিতেছে, অতিমারি-লাঞ্ছিত এই সময়ে কোভিড-১৯’এ কেহ মারা গেলে হাসপাতাল বা প্রশাসনের তরফে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা মিলিতেছে না, মৃতের নিকটজনও সব জানিতে পারিতেছেন না, জানিলেও কাছে আসিতে পারিতেছেন না। তাহারই মধ্যে গড়িয়া শ্মশানের এই অমানবিক দৃশ্য আরও কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নের জন্ম দিল।
এক ইংরাজ কবি লিখিয়াছিলেন, প্রতিটি মৃত্যুই তাঁহাকে ক্ষয় করিয়া দেয়, কারণ তাঁহার যোগ মানবজাতির সহিত। সমগ্র মানবজাতির কল্যাণচিন্তা যদি বা গুরুভার মনে হয়, অন্তত জীবিত ও মৃত সমস্ত নাগরিক সম্পর্কে একই ভাবনা কি প্রশাসন ভাবিবে না? রাজ্য স্বরাষ্ট্র দফতর জানাইয়াছে, মৃতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে তাহারা শ্রদ্ধাশীল, কোভিডে মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও তথ্যের স্বচ্ছতায় ও মৃতের পরিজনদের সহযোগিতায় বদ্ধপরিকর। গড়িয়া-কাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলিয়াও তাহারা স্বীকার করিয়াছে, ব্যবস্থাপনায় ভুল ছিল, ইহা মৃতদেহগুলি সৎকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার সংস্থাটির গাফিলতি। এই দায়িত্বজ্ঞানহীন নিষ্ঠুরতা যাহাতে আর না ঘটে, সরকার সেই বিষয়ে কড়া পদক্ষেপ করুক। মৃতের মরণোত্তর মর্যাদা নিশ্চিত করা শুধু সমাজের নহে, প্রশাসনেরও দায়িত্ব।