১৯৪৫ সালের অগস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহ। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে এসেছেন ভিয়েতনামের সাইগনে (এখন হো চি মিন সিটি)। যুদ্ধ পরিস্থিতির জটিলতা তাঁকে রীতিমতো বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ‘মিত্র শক্তি’র কাছে হার মানছে জাপান, জার্মানি। ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’র বহুজন নিহত, আহত, অসুস্থ। ইম্ফল ও কোহিমার যুদ্ধে প্রাণ গিয়েছে অনেক। জার্মানি আত্মসমর্পণ করেছে ওই বছরই মে মাসের ১৭ তারিখে।
এপ্রিলেই রেঙ্গুন ছেড়েছিলেন সুভাষচন্দ্র। সঙ্গে বাহিনীর পুরুষ অফিসার ও কিছু সৈন্যের সঙ্গে ‘রানি’ বাহিনীর মেয়েরাও। এর পর ব্যাঙ্কক হয়ে গেলেন সিঙ্গাপুরে। এই সময় তিনি প্রাণপণ সৈন্যদের জন্য, তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করার চেষ্টা করছিলেন। ক্রমশ ব্রিটেন এবং আমেরিকা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। নেতাজির ‘চিফ অব স্টাফ’ আর জে ভোঁসলের পরামর্শ ছিল সিঙ্গাপুর ছাড়ার। জাপানি জেনারেল ইসোদা পরামর্শ দেন সাইগন যেতে। কারণ, সেখানে জাপানি সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণ তখনও ছিল। পৃথিবীকে হতবাক করে দিয়ে এ বার হিরোশিমা, নাগাসাকিতে পড়ল পরমাণু বোমা। ১৫ অগস্ট জাপান আত্মসমর্পণের কথা ঘোষণা করল (আমেরিকায় ১৪ অগস্ট)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই সমাপ্তি লগ্নে তাদের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয় ‘আইএনএ’। ঠিক এই রকম এক বিপজ্জনক সময়েই নেতাজি সায়গনে উপস্থিত হন। আপাতভাবে যুদ্ধে কোণঠাসা হয়ে যাওয়া সেই অধিনায়কের পাশে সে দিন বন্ধুর ভূমিকা নিয়ে দাঁড়ান যৌবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া এক জন ভারতীয় তামিল, লেওন প্রৌচণ্ডী।
এই প্রৌচণ্ডী মহাশয়ের কথা বেশির ভাগটা জানা যায় তাঁর সৎ মেয়ে শ্রীমতী এলেনাম্মার স্মৃতি থেকে, যা তিনি ভাগ করে নিয়েছিলেন তাঁর ছেলে অধ্যাপক প্রশান্ত মোরের সঙ্গে। ১৯২০ সালে জন্মের পর থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত এলেনাম্মা সাইগনেই প্রৌচণ্ডীর অট্টালিকায় থেকেছেন। প্রৌচণ্ডী স্বভাবগত ভাবেই ছিলেন এক ব্যতিক্রমী মানুষ। একদা গান্ধীজির প্রতি আকৃষ্ট হন। বাপুজি যখন বিদেশি প্রতিষ্ঠানে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার ডাক দেন, প্রৌচণ্ডী সেই ডাকে সাড়া দেন। তবে ‘অসহযোগ’ আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর অনেকাংশেই মতে মিলত না। পরবর্তী জীবনে সফল ব্যবসায়ী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজকর্মী হিসাবেও পরিচিত হন প্রৌচণ্ডী।
কিছু অদ্ভুত ধারণাও ছিল তাঁর। তিনি ভারতীয়দের উৎসাহিত করতেন ইউরোপীয় পোশাক পরার জন্য। রীতিমতো ‘পোশাক সংস্কারক’ হয়ে উঠেছিলেন। প্রৌচণ্ডী মনে করতেন ইউরোপীয় পোশাক পরলে সম্মানে ভারতীয়রা ইউরোপীয়দের সমকক্ষ হতে পারবেন, যেমন পেরেছেন চিন ও জাপানের লোকজন। এই সব বিতর্কিত বিষয় পাশে সরিয়ে রেখে চিনে নিতে হবে অন্য এক প্রৌচণ্ডীকে। ১৯৪৩ সালে যখন নেতাজি সাইগনে আসেন, তিনি এমন উৎসাহিত হয়ে পড়েন যে ‘রো ক্যাটিনা’ নামক রাস্তায় তাঁর হুডখোলা গাড়ি থামিয়ে দেন এবং নেতাজির গলায় একটি সোনার মালা পরিয়ে দেন। সেই থেকেই দু’জনের সুসম্পর্কের সূত্রপাত। ইন্ডিয়ান ইনডিপেন্ডেন্স লিগ এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির দিকে পরবর্তী কালে তিনি প্রকৃত বন্ধুর মতো অর্থ এবং সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
১৯৪৫ সালে নেতাজি যখন সাইগনে এলেন, সেই দুর্দিনেও প্রৌচণ্ডী তাঁর মূল ভবনটি সঁপে দেন তাঁর অধিনায়কের হাতে। সেটি হয়ে ওঠে ইন্ডিয়ান ইনডিপেন্ডেন্স লিগ-এর ‘জেনারেল সেক্রেটারিয়েট’। আজাদ হিন্দ বাহিনীর নানা কাজও হচ্ছিল সেখানে। প্রৌচণ্ডী ছিলেন আইআইএল-এর কার্যনির্বাহী সদস্য এবং লিগ-এর শেষ সাধারণ সম্পাদক। আজাদ হিন্দ বাহিনী ও সরকারের বহু দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে তিনি অকাতরে সাহায্য করেন ও আশ্রয় দেন।১৭ অগস্ট, ১৯৪৫ তারিখে নেতাজি যখন সহচর কর্নেল হবিবুর রহমানকে নিয়ে ঢুকলেন তাঁর সেক্রেটারিয়েট-এ, প্রৌচণ্ডী তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন, বসলেন গুরুত্বপূর্ণ সভায়। দূর থেকে সবটাই দেখেছিলেন এলেনাম্মা।
এই সেক্রেটারিয়েট থেকে পর দিন অর্থাৎ ১৮ অগস্ট বেরিয়ে যান নেতাজি। হারিয়ে যান চির-অজানায়। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি চূড়ান্ত বিপদ ঘনিয়ে আসে প্রৌচণ্ডীর জীবনেও। ফরাসি সৈন্যরা এসে হাজির হয় তাঁকে গ্রেফতার করবে বলে। দু’জন তামিল ব্যক্তি তাঁকে চিনিয়ে দেয়। ক্রন্দনরত স্ত্রী, সন্তানদের সামনে দিয়ে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। পঁয়তাল্লিশ বছরের লেওন প্রৌচণ্ডী নিক্ষিপ্ত হন ফরাসিদের কারাগারে। কারাগারে অকথ্য নির্যাতন। কোথায় গিয়েছেন সুভাষচন্দ্র? কী তথ্য আছে তাঁর বিষয়ে? অসংখ্য প্রশ্ন, অসংখ্য ক্ষতস্থান। নিরন্তর জল নিক্ষেপ করে, ইলেকট্রিক শক দিয়ে তাঁর মানসিক সহ্যশক্তিকে বিপর্যস্ত করে দেওয়া হয়। স্মৃতি হারান প্রৌচণ্ডী। পরিণত হন নিস্তেজ, প্রাণশক্তিহীন জড়বৎ মানবদেহে। তিন মাস পরে সেই দেহটিকেই ফিরিয়ে দেওয়া হল বাড়িতে।
পুদুচেরিতে পরিবারের সদস্যরা মুখ বন্ধই রাখলেন ফরাসিদের ভয়ে। ‘ভিলা সেলভম’-এ থাকতেন তাঁরা, যা এখন ৫ নেহরু স্ট্রিট। রোগজর্জরিত শরীরে কুড়ি বছর কাটিয়ে সেখানেই প্রয়াত হন তিনি।
সংগ্রামের শেষ পর্বে যখন বাহিনী ভেঙে যাচ্ছে, তখনও নেতাজি লিখেছিলেন, ‘দিল্লি যাওয়ার পথ অনেক, এখনও দিল্লিই আমাদের লক্ষ্য’। ‘আইএনএ’কে নিয়ে তাঁর সর্বাধিনায়ক দিল্লিতে পৌঁছতে না পারলেও নয়া মহাভারতের এই ‘কর্ণ’ ভারতের জনমানসে আজও বীরশ্রেষ্ঠ। তাঁর সহযোদ্ধা লেওন প্রৌচণ্ডী, যাঁর আবাসে নেতাজি তাঁর অজ্ঞাত যাপনের শেষ দু’দিন কাটিয়েছিলেন, তিনি সশরীরে ভারতে পৌঁছেছিলেন, স্বাধীন ভারত দেখেছিলেন, কিন্তু কিছুই অনুভব করতে পারেননি।
নায়কের জন্মোৎসবে আলোকবৃত্তের বাইরে পড়ে থাকা এই উপেক্ষিত চরিত্রটির কথা আজ কে-ই বা স্মরণ করবে!
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে