ফেরা: বাসে জায়গা নেই, তাই ছাদে চেপেই ভোট দিতে আসছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। ২০ এপ্রিল, বহরমপুর। ছবি: গৌতম প্রামাণিক।
মাটি কি সত্যিই মানুষকে চেনে, না কি মানুষই মাটির ভিতরে নিজের পরিচয় খুঁজে নেয়? কোনও কোনও মাটিতে পা রাখলেই ভিতর থেকে এক ধরনের শব্দ ওঠে, যেন খুব চেনা, যেন বহু দিনের— এইখানটা আমার। এই কথাটা কোথাও লেখা থাকে না। কোনও কাগজে নয়, কোনও রেজিস্ট্রারে নয়। আদালতও হয়তো এই ভাষা বোঝে না। কিন্তু শরীর বোঝে। পায়ের তলা বোঝে। কখনও কখনও মনে হয়, হাড়ও বোঝে।
আমি সেই মাটিতেই ফিরে গেলাম।
ট্রেনে চার ঘণ্টা। ভিড়, গরম, গায়ে গা ঠেকানো মানুষ। জানালার ধারে বসে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছিল, এই ফেরাটা কেবল যাওয়া নয়, যেন কোথাও ফিরে পাওয়া। পরিযায়ী শ্রমিক তো আমি নিজেও। কায়িক শ্রমের নয়, মেধাশ্রমের, ক্লাসঘরে পড়ানোর— কিন্তু, পরিযায়ী তো বটে, শ্রমিকও বটে। মাঝেমধ্যে ভেবেছি, ভোটার কার্ডটা যদি সরিয়ে নিই জন্মভিটে থেকে এখনকার ঠিকানায়? আবার মনে হয়েছে, তা হলে কি এই মাটির সঙ্গে আমার সম্পর্কটাও একটু একটু করে সরে যাবে? ঠিক জানি না। তবে করার সাহস পাইনি। তাই, ভোট দিতে গিয়েছিলাম। নিজের হাতে, নিজের মাটিতে, নিজের মানুষদের মধ্যে দাঁড়িয়ে।
ভোট দিয়ে বেরিয়ে এসে দেখি, পাশের মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন। চুপ করে। ভিতরে ঢোকেননি। ঢুকতে পারেননি। আমি কিছু জিজ্ঞাসা করিনি। তবু মনে হচ্ছিল, কেন, তার উত্তরটা জানি। এই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার, ঢুকতে না-পারার অভিজ্ঞতা আমাদের ইতিহাসে নতুন নয়।
এই দেশে আমরা অনেক কিছু দেখেছি। অথবা, নিজের চোখে দেখিনি, কিন্তু প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বয়েছি সেই দেখার স্মৃতি। আমাদের স্মৃতিতে দেশভাগের ক্ষত আছে, দাঙ্গার আগুন আছে, এক অনপনেয় মৃত্যু-উপত্যকা আছে— আমাদের স্মৃতিতে রক্ত আছে, ভয় আছে, সেই ভয় থেকে সম্পূর্ণ চুপ করে যাওয়া আছে। মনে হয়, সেই ভয়টা বাইরে থেকে আসেনি পুরোপুরি। ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, অদৃশ্য ভাবে। এমন ভাবে যে কখনও বুঝতেই পারি না, কোনটা আমাদের নিজের, আর কোনটা আমাদের ভিতরে রেখে দেওয়া। হয়তো সেই ভয়ই রূপ বদলায়। চ্যুত হওয়ার ভয়, হারিয়ে ফেলার ভয়।
ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে দেখি, বৈশাখ মাসের বীরভূমের প্রবল রোদে বৃদ্ধের বলিরেখাময় মুখে জমে ওঠা স্বেদবিন্দুতে খেলা করছে সেই ভয়। আপাত-নিরীহ কয়েকটা শব্দ নিস্তরঙ্গ জীবন থেকে এক ঝটকায় তাঁদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এক সুগভীর অনিশ্চয়তার সামনে। ‘এসআইআর’, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’— শব্দগুলো কয়েক মাস আগেও অলীক ঠেকত এই মানুষটার কাছে। আজ, ঘোর বাস্তব। তিনি এই পরীক্ষায় পাশ করে তবে দাঁড়াতে পেরেছেন ভোটের লাইনে— তবু, ভয় তাঁর পিছু ছাড়েনি। তাঁর মুখের বলিরেখা জানে, রাষ্ট্রক্ষমতার কাছে তাঁর অস্তিত্ব বালুকণার চেয়েও তুচ্ছতর। এক নিমেষে ‘নেই’ হয়ে যেতে পারে তাঁর এত দিনের সঞ্চয়— ভিটেমাটি, আলো-হাওয়া-জল, তাঁর পরিচয়।
এই সব বড় কথার ভিতরেই হঠাৎ ছোট ছোট দৃশ্য এসে পড়ে।
বীরভূমে ভোট দিতে এসে বুথে এক বিএলও-র সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, “সমস্ত নথি আছে। পাসপোর্টও। তবুও বহু মানুষের নাম বাদ দিল। কেন, বুঝতেই পারছি।” তিনি কথাটা বলেই চুপ করে গেলেন। আমিও। কিছু ক্ষণ পর মনে হল, এই চুপ করে যাওয়াটাই হয়তো আসল কথা। সবাই যেন জানে, তবু কেউ পুরোটা বলে না। কেন বলা যায় না, সেটা স্পষ্ট নয়। শুধু এটুকু বোঝা যায়, না-বলার একটা আলাদা জায়গা তৈরি হয়েছে— যেখানে কথা না-বলাটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন এমন একদল মানুষের কথা, যারা সব সময় থাকে, তবু কেন্দ্র নয়। তাদের কাজ থাকে, নাম থাকে না। আজকাল মনে হয়, কথাটা শুধু অর্থনীতির ছিল না। হয়তো রাজনীতিরও। রাষ্ট্র এই মানুষগুলিকে চেনে কি না, সেটাও নিশ্চিত নই। কখনও গোনে, কখনও ভুলে যায়। এই ভুলে যাওয়াটা এখন আর হঠাৎ করে হয় না। ধীরে ধীরে হয়। শব্দ ছাড়া। এক দিন হঠাৎ বোঝা যায়, নামটা নেই। আগে এই না-থাকাটা হয়তো অন্য ভাবে আসত। এখন আসে আর এক ভাবে। পদ্ধতি বদলেছে— এইটুকু বোঝা যায়।
তারা যখন থাকে, তখন কি রাষ্ট্র তাদের মনে রাখে? না কি, তারা সংখ্যামাত্র? ভোটের সময়ে হঠাৎ তাদের দরকার পড়ে। তখন তারা দৃশ্যমান হয়। তার পর আবার মিলিয়ে যায়। এই মিলিয়ে যাওয়াটাই যেন নিয়ম। এ বার মনে হচ্ছে, সেই নিয়মটাও বদলাচ্ছে। দরকার থাকলেও, না-থাকলেও— কেউ কেউ আর ফিরে আসছে না তালিকায়।
এই সব কথার ভিতরেই কিছু মুখ ভেসে ওঠে। যাঁরা আজ বুথের বাইরে দাঁড়িয়ে।
সুরাত থেকে এসেছেন এক জন। কাপড়ের কারখানায় কাজ করেন। বছরে দু’বার বাড়ি ফেরেন— ইদে, কুরবানিতে। বলছিলেন, প্রতি বার ভোট এলে আসেন নিজের জন্য। এই একটা দিন নাকি তাঁর। এ দিন তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন বুথের বাইরে। চুপ করে। ভিতরে ঢুকতে পারেননি। তাঁর কাগজ ছিল। ঠিকানাও। সবই ছিল, যেমন থাকার কথা। তবু কিছু একটা যেন কম ছিল। ঠিক কী, সেটা বোঝা যায় না। শুধু এইটুকু বোঝা যায়— তাঁকে আর ডাকা হয়নি।
এই মাটির ভিতরেও কিছু কথা রয়ে যায়। যেগুলো সব সময় শোনা যায় না, তবু পুরোপুরি হারায় না। আমাদের এই গ্রামেই জন্মেছিলেন রেজাউল করীম। নামটা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি। ঠিক কী লিখেছিলেন, অল্প কেউই মনে রেখেছে। শুধু এটুকু মনে পড়ে, মানুষকে আলাদা করে দেখার বিরুদ্ধে তিনি কথা বলতেন। দেশভাগের সময়েও। এখন মাঝে মাঝে ভাবি, এই একই মাটিতে দাঁড়িয়ে আমরা কত সহজে আলাদা হয়ে যাই। একই পাড়া, একই ঘর, একই পরিবারের ভিতরেও। তাঁর লেখা কোথাও আছে। বইয়ে, হয়তো। কিন্তু সেই কথাগুলো কি আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে?
এই মাটিতে হাঁটতে হাঁটতে কখনও মনে হয়, প্রতিধ্বনি এখনও আছে। খুব ক্ষীণ। শুনতে হলে একটু থামতে হয়। কিন্তু আমরা থামি না। দেখি। চলে যাই। দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাই। এই অভ্যস্ত হয়ে ওঠাটাই হয়তো সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিবর্তন।
ভোট দিয়ে এসে বাড়িতে বসলাম। চুপ করে। হঠাৎ মনে হল, এই অভিজ্ঞতাটি অচেনা নয়। এমন এক পরিসর, যেখানে মানুষকে ডাকা হয়, কিন্তু নাম ধরে নয়। যেখানে উপস্থিতি আছে, কিন্তু পরিচয় অনুপস্থিত। যেখানে সংখ্যা রয়েছে, কিন্তু মানুষ অনুপস্থিত। এই চেনা পরিসরের একটি নাম আছে, অনেক আগে পড়েছিলাম। তখন তা কল্পনা বলেই মনে হয়েছিল। এখন বুঝি, তা কল্পনা ছিল না। ছিল সতর্কবার্তা। আমরা সেটা পড়িনি। বা পড়েও গুরুত্ব দিইনি। ভেবেছিলাম, আমাদের জীবনে আসবে না। কিন্তু হয়েছে।
যক্ষপুরীর আজকাল আর একটা নামও রাখা হয়েছে। ‘এসআইআর’।
মানুষ মাটি চেনে— এই কথাটা দিয়ে শুরু করেছিলাম। মাটিও মানুষকে চিনে রাখে, নিজের মতো করে। এখন মনে হয়, কথাটা এত সহজ নয়। রাষ্ট্রের সেই চেনাটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়। ভয়টা ঠিক কোথায়, সেটা বুঝে উঠতে পারি না। শুধু মনে হয়, সামনে কোনও এক দিন সবাই তালিকায় থাকবে, সবাই লাইনে দাঁড়াবে, সবাই ভোট দেবে। অথচ কিছুই বদলাবে না। তখন হয়তো আর কাউকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। কারণ ভিতর আর বাইরের মধ্যে কোনও তফাত থাকবে না।
এই ভেবেই একটু অস্বস্তি হয়। হয়তো সেই দিনের প্রস্তুতিই এখন চলছে।
আজ থেকেই।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে