কর্মরতা: উত্তরপ্রদেশের গ্রামে চাষের আলু বাছাইয়ের কাজ করছেন নারীরা, মার্চ ২০২৬। ছবি: পিটিআই।
পশ্চিমবঙ্গে এখন পালাবদলের পালা— বদলে গেল সরকার, সরে গেলেন অনেক শীর্ষ আধিকারিক, পরামর্শদাতা। নবান্ন থেকে আবার নাকি রাইটার্সে ফেরত আসবে মুখ্যমন্ত্রীর দফতর। কিন্তু কলকাতা কি থেকে যাবে কলকাতাতেই? সরকারের শীর্ষে মুখগুলো বদলানোর উত্তেজনা যত ঢিমে হয়ে আসবে, ততই প্রশ্ন উঠবে, সরকারি কাজকর্মের ধরনধারণে কতটা বদল এল?
প্রতিটি রাজ্যেরই রয়েছে নিজস্ব প্রশাসনের ধারা। এক সময়ে কংগ্রেস সরকার ছিল বহু রাজ্যে, তা সত্ত্বেও উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে গড়ে উঠেছিল এক-এক ধরনের প্রশাসনের ধাঁচ। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান, ওড়িশার মতো রাজ্যে জেলাশাসকের (কালেক্টর) একচ্ছত্র রাজ গড়ে উঠেছিল। উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা, জনকল্যাণ, নির্বাচন, সবই তাঁর নিয়ন্ত্রণে। ব্লক বা পঞ্চায়েত স্তরের প্রশাসন ছিল দুর্বল। তৃণমূল স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছতে জেলা প্রশাসন ব্যবহার করেছে অসরকারি সংস্থাগুলিকে (এনজিও)। রাজস্থান, বিহার, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশের মতো কিছু রাজ্যে গত কয়েক দশকে জেলা স্তরে সরকারি ও অসরকারি সংস্থার মধ্যে ধারাবাহিক সহযোগিতার নানা দৃষ্টান্ত দেখা যায়। দরিদ্র মেয়েদের স্বনির্ভর দল গঠন, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, গণশৌচাগার নির্মাণ, জীবিকা অর্জনের নানা পথ তৈরি, একশো দিনের কাজ— যেগুলি আজ ‘সরকারি প্রকল্প’ হিসেবে সারা ভারতে রূপায়িত হচ্ছে, তার অনেকগুলি জেলা প্রশাসন ও এনজিও-র উদ্যোগে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা থেকে উঠে এসেছে। তুলনায় তামিলনাড়ু, কেরল, হিমাচল, কর্নাটক বা পশ্চিমবঙ্গে অসরকারি সংস্থা গুরুত্ব পায়নি, বরং ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা প্রাধান্য পায়। ব্লক ও গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরের জনপ্রতিনিধি এবং আধিকারিকরা প্রশাসনিক ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন ও জনকল্যাণের কর্মসূচির পরিকল্পনা ও রূপায়ণ করেছেন। মানব উন্নয়নের সূচকে এই রাজ্যগুলি তুলনায় ভাল। তার পিছনে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ভূমিকা যথেষ্ট। বঙ্গে বাম আমলে ভূমি সংস্কার ও ক্ষুদ্র সেচের প্রসার হয় পঞ্চায়েতের মাধ্যমে, যা গ্রামীণ রোজগার বাড়িয়েছিল।
ভারতের নানা রাজ্যে নানা সময়ে বিজেপি সরকার এসেছে। নরেন্দ্র মোদীর অধীনে বিজেপি প্রশাসন কিছু সুনির্দিষ্ট চরিত্র গ্রহণ করেছে— ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, বৃহৎ শিল্পের আনুকূল্য, পরিবেশ সংরক্ষণে শিথিলতা, পঞ্চায়েতি ব্যবস্থার উপেক্ষা। তা সত্ত্বেও নানা রাজ্যের প্রশাসনে পার্থক্য চোখে পড়ে। উত্তরপ্রদেশে ‘কালেক্টর-রাজ’ বজায় রয়েছে। এ রাজ্যের প্রশাসনিক মানসিকতায় বরাবরই দলিত, মুসলমানের প্রতি অসংবেদী মনোভাব, নারী-স্বাধীনতার বিরোধিতা দেখা গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের শাসনকালে তা আরও তীব্র হয়েছে। অথচ হিমাচল প্রদেশে বিজেপি চার বার সরকার গড়লেও (১৯৯০, ১৯৯৮, ২০০৭, ২০১৭) এই সঙ্কটগুলি সে ভাবে মাথাচাড়া দেয়নি। মহিলাদের ক্ষমতায়নের কর্মসূচিতে ঘাটতি পড়েনি— সাক্ষরতার হার, শ্রমশক্তিতে যোগদানের হারে হিমাচলের মেয়েরা জাতীয় গড়ের থেকে এগিয়ে। সংরক্ষিত আসনের বাইরেও পঞ্চায়েতে নির্বাচিত হচ্ছেন বহু মহিলা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পানীয় জল বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে জেলা প্রশাসনের কাছে। তাই হিমাচলের মতো পাহাড়ি, দুর্গম রাজ্য মানব উন্নয়নের নিরিখে কেরল, তামিলনাড়ুর পরেই স্থান করে নিয়েছে। তার পিছনে রয়েছে সেখানকার জনকল্যাণমুখী প্রশাসনিক সংস্কৃতি।
পশ্চিমবঙ্গে বাম ফ্রন্ট শাসনের তিন দশকে একটা সুস্পষ্ট প্রশাসনিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। তা ছিল বিকেন্দ্রীকৃত, গরিবমুখী তবে পার্টি-চালিত। ‘আমার গরিব-অন্যের গরিব’-এ ফারাক করা হত। ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতের কাজ অনেকটাই পরিচালিত হত দলের নিয়ন্ত্রণে— জেলা, ব্লক ও পঞ্চায়েত স্তরের দলীয় ইউনিট ছিল ক্ষমতার ভরকেন্দ্র। বেসরকারি বৃহৎ শিল্পকে বাম রাজনীতি সন্দেহের চোখে দেখত, শিল্পপতিদের তো বটেই। জোর দেওয়া হত নিয়ন্ত্রিত ক্ষুদ্র উদ্যোগে। সরকারি কর্মসূচিতে দারিদ্র নিরসন, কৃষিতে লাভ-বৃদ্ধি প্রাধান্য পেত। দলীয় কর্মসূচিও গরিবের ভাষায় গরিবের হয়ে কথা বলত। শেষের দিকে এই অভিমুখ থেকে বৃহৎ শিল্পের দিকে সরতে গিয়ে বিপত্তি ঘটে।
তৃণমূল সরকার আসার পর প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে একটা বড় পরিবর্তন আসে। প্রশাসনের কেন্দ্রীকরণ হয়, পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে এড়িয়ে গিয়ে সরকার আবার ডিএম-বিডিও রাজে ফেরত যায়। মন্ত্রীদের স্বাতন্ত্র্য ক্ষুণ্ণ হয়। প্রশাসনিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে। জেলাস্তরে সরকারি কর্মসূচির লাভ বিতরণের চেয়েও, সরকারি ঠিকার উপরে ভাগ বসাতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। স্থানীয় অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে দলের একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিলেন। দলের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব বাড়তে দেখে ‘দুয়ারে সরকার’, ‘পাড়ায় সমাধান’-এর মতো প্রশাসনিক কর্মসূচি নিয়েছিল তৃণমূল সরকার। তা যে সুস্থায়ী সমাধান নয়, তা মানুষ টের পাচ্ছিলেন।
এখন বিজেপি সরকার কী ধরনের প্রশাসনিক সংস্কৃতি আনবে? নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপির রাজনৈতিক কর্তৃত্বের একটা নির্দিষ্ট অভিমুখ গড়ে উঠেছে। জেলাশাসক, বিধায়কের প্রভাব বেড়েছে, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে, ‘শিল্পবান্ধব’ হওয়ার চেষ্টায় নিয়মের তোয়াক্কা না করেই জমি অধিগ্রহণ, গরিব উচ্ছেদ, অরণ্য ধ্বংস হয়েছে। বুলডোজ়ার এই প্রশাসনিক সংস্কৃতির একটা প্রতীক হয়ে উঠেছে। পরিকাঠামো উন্নয়ন অবশ্যই হয়েছে— শুধু উত্তরপ্রদেশেই সাতটি এয়ারপোর্ট, চারটি আন্তঃরাজ্য হাইওয়ে, পাঁচটি শহরে মেট্রো রেল, তিনটি শহরে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কারখানা তৈরি হয়েছে। একই মাত্রায় না হলেও, মধ্যপ্রদেশ বা উত্তরাখণ্ডেও একই ধরনের পরিকাঠামো উন্নয়ন চোখে পড়ছে। কিন্তু সেই পথ বেয়ে ঠিকাদার-রাজ মৌরসিপাট্টা গেড়েছে— ২০২১ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে দেশে মোট ১৭০টি সেতু ভেঙে পড়েছে, যেগুলির ১১০টি বিজেপি-শাসিত রাজ্যে, বেশির ভাগই নির্মীয়মাণ বা সম্প্রতি নির্মিত। এমনকি মনরেগা-র কাজও ক্রমশ প্রশাসনিক মদতে ঠিকাদারদের হাতে চলে গিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গেও কি এমনই হবে? মনে রাখা চাই, প্রশাসনের কেন্দ্রীকরণের ব্যতিক্রমও রয়েছে— কর্নাটক। সে রাজ্যে দু’বার প্রশাসনিক ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি, ২০০৮-১৩ এবং ২০১৮-২০২৩। তার পরেও কিন্তু প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার প্রাধান্যে খুব পরিবর্তন হয়নি। তার একটা কারণ হয়তো জনতা দল(এস)-এর সঙ্গে বিজেপির জোট। তা ছাড়া কর্নাটকের পঞ্চায়েত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জনতা দলের মুখ্যমন্ত্রী রামকৃষ্ণ হেগড়ে এবং পঞ্চায়েত মন্ত্রী আব্দুর নজির সাব, বিজেপি তাতে বিশেষ কাটাছেঁড়া করেনি। কংগ্রেস ক্ষমতায় এসে তা কাজে লাগিয়েছে— ক্রেশ তৈরির কেন্দ্রীয় কর্মসূচি একমাত্র কর্নাটকই বাস্তবায়িত করেছে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার তত্ত্বাবধানে। ‘কুসিনা মানে’ (শিশুঘর) প্রকল্প চার হাজার পঞ্চায়েতে চালু হয়েছে। তবে ঠিকাদার রাজ গেড়ে বসেছে কর্নাটকেও। তাই ইয়েদুরাপ্পা থেকে সদানন্দ গৌড়া, জগদীশ সেট্টার, আবার ইয়েদুরাপ্পা থেকে এইচ ডি কুমারস্বামী হয়ে বাসবরাজ বম্মাই— বার বার মুখ্যমন্ত্রী বদলেও অবস্থা বদলায়নি। শেষ নির্বাচনে কংগ্রেসের স্লোগান ছিল ‘চল্লিশ শতাংশের সরকার’— ঠিকা পাইয়ে দিতে, পাওনা টাকা ছাড়তে বিজেপি মন্ত্রীরা নাকি ৪০ শতাংশ ‘কমিশন’ দাবি করতেন।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি যে দু’টি আখ্যানের ভিত্তিতে ক্ষমতায় এল তার একটা উন্নয়ন, আর অন্যটা মুসলিম-বিরোধিতা। একটা অন্যের সঙ্গে খাপ খায় না। উন্নয়নের শর্ত শিক্ষিত, দক্ষ, সবল শ্রমশক্তি, সামাজিক সৌহার্দ, রাজনৈতিক শান্তি। মুসলিম-বিরোধিতা যদি রাজনৈতিক কর্তৃত্বের, প্রশাসনিক কর্মসূচির অভিমুখ হয়, তা হলে সেই পরিবেশ গড়ে উঠবে না। আর ‘উন্নয়ন’ বলতে যদি শুধু কিছু বড় কারখানা বোঝানো হয়, তা হলে কর্মসংস্থান হবে না, কারণ সেগুলি পুঁজিনিবিড়, শ্রমনিবিড় নয়। ফলে উত্তরপ্রদেশ, অসম, বিহারের মতো পশ্চিমবঙ্গও শ্রমিক রফতানিকারী রাজ্য হয়েই থেকে যাবে।
পাশাপাশি ঠিকাদার-রাজ আরও শক্তিশালী হবে। তাই শুধু অসম, উত্তরপ্রদেশের দিকে তাকালে চলবে না, শুভেন্দু অধিকারীর সরকারকে গড়তে হবে পশ্চিমবঙ্গের উপযোগী প্রশাসনিক সংস্কৃতি।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে