Bureaucrat

সর্বজ্ঞ নয়, বিশেষজ্ঞ চাই

মিশেল ফুকো বলেছিলেন, প্রতিষ্ঠান তার আধিপত্য টিকিয়ে রাখে জ্ঞানের নামে— প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক জ্ঞানই আধুনিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার বৈধতা জোগায়। সরকারি আমলা তাই শুধু এক কর্মচারী নন, একটি জ্ঞানকাঠামোর প্রতিনিধিও।

অমিতাভ সরকার

শেষ আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬ ০৭:১৭
Share:

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে, সঙ্গে আনে প্রতিশ্রুতি: শিল্পনীতি বদলাবে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হবে, শিক্ষায় বিপ্লব আসবে। মঞ্চ থেকে ঘোষণা হয়, কাগজে ছাপা হয়, কমিটি বসে। ধীরে ধীরে সব স্তিমিত হয়ে যায়। পরের সরকার আসে, আবার নতুন প্রতিশ্রুতি। এই চক্রটি এত পরিচিত যে আমরা আর অবাকও হই না। কিন্তু এই প্রশ্ন কেউ করে না: যে যন্ত্র দিয়ে সংস্কার করা হবে, তার সংস্কার কে করবে? যে প্রশাসনযন্ত্র এই সংস্কারের বাহন, তার নিজের গঠন ও জ্ঞানের সীমা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। রাজনীতি সেই প্রশ্ন এড়িয়ে চলে, কারণ উত্তরটা অস্বস্তিকর।

মিশেল ফুকো বলেছিলেন, প্রতিষ্ঠান তার আধিপত্য টিকিয়ে রাখে জ্ঞানের নামে— প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক জ্ঞানই আধুনিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার বৈধতা জোগায়। সরকারি আমলা তাই শুধু এক কর্মচারী নন, একটি জ্ঞানকাঠামোর প্রতিনিধিও। ভারতে সমস্যা এখানেই। ক্ষমতার খোলসটি আছে, কিন্তু ভিতরে জ্ঞানের বহর কেমন, কেউ জানে না।

এক জন আইএএস বা ডব্লিউবিসিএস অফিসার সরকারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মুহূর্তে আজীবনের পরিচয় পেয়ে যান। তাত্ত্বিক ক্যাথরিন লিউ এ ধরনের শ্রেণিকে বলেছেন ‘প্রফেশনাল ম্যানেজারিয়াল ক্লাস’, যারা সনদকে যোগ্যতার বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, জবাবদিহি থেকে সুকৌশলে দূরে থাকে। ভারতের সিভিল সার্ভেন্ট ক্যাডার ক্রমে সেই শ্রেণির দেশীয় সংস্করণ হয়ে উঠছে। লক্ষ লক্ষ তরুণ বছরের পর বছর বই মুখস্থ করছে, প্রাচীন ইতিহাস থেকে তাপগতিবিদ্যা। এতে তথ্যের ভাঁড়ার উপচে পড়ে, কিন্তু অন্তর্দৃষ্টি জন্মায় কি? বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে সমস্যা সমাধানে ভাবার ক্ষমতা কতটা জোগায় তা? কেউ হয়তো বলবেন, আসল প্রশিক্ষণ হয় কাজ করতে করতে। কিন্তু বদলির অবিরাম চক্রের মাঝে, সেই শিক্ষার অবকাশই বা কত? গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত দশকগুলিতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় অর্ধেক আইএএস কর্মকর্তা বদলি হয়েছেন, একটি পদে গড় কার্যকাল মাত্র ষোলো মাস। ষোলো মাসে কেউ বিশেষজ্ঞ হন না, তবে ষোলো মাসে ফাইল সই, নির্দেশ জারি, সভা পরিচালনা করা যায়। মাঝে মাঝে আমলাদের, বিশেষত কেন্দ্রীয় ক্যাডারে, বিদেশে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়, কিন্তু তা বিষয়ভিত্তিক নিবিড় প্রশিক্ষণ ও মাঠের অভিজ্ঞতার বিকল্প হতে পারে না।

আমলাতন্ত্রের রক্ষকরা বলেন, দক্ষ সর্বক্ষেত্রের প্রশাসক যে কোনও বিভাগ চালাতে পারেন। এই যুক্তি উনিশ শতকের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সত্য ছিল, যেখানে রাষ্ট্রের কাজ ছিল রাজস্ব আদায় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা। একুশ শতাব্দীর রাষ্ট্রকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নীতি প্রণয়ন, জলবায়ু অভিযোজন, মহামারির মোকাবিলা, শিল্পের সবুজায়ন করতে হচ্ছে। এই কাজ গভীর বিষয়-নির্দিষ্ট জ্ঞান ছাড়া সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গে মেধার ঐতিহ্য প্রাচীন, বিদ্যার সংস্কৃতি গভীর। অথচ দশকের পর দশক রাজ্য প্রশাসনে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রশাসনিক দক্ষতার চেয়ে বেশি মূল্যবান পরিগণিত। গবেষণায় দেখা গেছে, সারা ভারতে প্রতি তিন জন আইএএস কর্মকর্তার এক জন অন্তত এক বার পদত্যাগের কথা ভেবেছেন; যাঁরা ভেবেছেন তাঁদের পাঁচ জনের চার জনই কারণ দেখিয়েছেন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। পশ্চিমবঙ্গে সেই হস্তক্ষেপের মাত্রা যে গড়ের চেয়ে কম, এমন দাবির সাহস কেউ করবেন না। ফলে দক্ষ আমলাদের কাছে এ রাজ্য হয়ে উঠেছে এমন এক ভূমি যেখানে কেরিয়ার ধীর হয়, স্বাধীন সিদ্ধান্তের সুযোগ নেই, সৃজনশীলতার পুরস্কার নেই।

বিকল্প কী? জার্মানিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নীতি নির্ধারণ করেন, আমলারা তা কার্যকর করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প-রূপান্তরে প্রযুক্তিবিদ ও অর্থনীতিবিদরা নেতৃত্বে ছিলেন, প্রশাসকরা ছিলেন তাঁদের পাশে। সিঙ্গাপুরে বিশেষজ্ঞরা নির্দিষ্ট মন্ত্রকে দীর্ঘমেয়াদে থাকেন, ঘন ঘন বদলি হন না। বিশেষজ্ঞ নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক সমন্বয়, এই দু’টি ভূমিকা আলাদা রাখলে শাসন কার্যকর হয়। ভারতেও সেই পথ খোলা: স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহণ, পরিবেশ, শিল্প, প্রতিটি বিভাগে নীতিগত নেতৃত্ব দেবেন তার বিশেষজ্ঞরা। আমলারা থাকবেন সমন্বয়ে, সঙ্কট ব্যবস্থাপনায়।

প্রকৃত বিশেষজ্ঞ আসবেন গবেষণা ও নীতিচর্চার জগৎ থেকে— জনস্বাস্থ্য-বিশেষজ্ঞ যিনি সমাজের শরীর বোঝেন, পরিবেশবিদ যিনি নীতির ভাষায় কথা বলতে পারেন, ক্রীড়া-ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ যিনি খেলার প্রশাসন ও সাংস্কৃতিক ও বাজারমূল্য বোঝেন, অর্থনীতিবিদ যিনি বাংলার মেধা-শিল্প-সংস্কৃতিকে জীবন্ত অর্থনৈতিক সম্পদরূপে দেখতে পান। বাংলায় এই বিশেষজ্ঞের অভাব নেই, প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশ্বমানের পেশাদাররা আছেন। কিন্তু তাঁরা নীতিনির্ধারণে নেই, মাঝেমধ্যে পরামর্শ কমিটিতে, সেও আলঙ্কারিক উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ। ২০০৫-০৯’এর মধ্যে পেশ হওয়া দ্বিতীয় প্রশাসনিক সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, ল্যাটারাল এন্ট্রি ও বিভাগভিত্তিক বিশেষজ্ঞের সুপারিশ স্পষ্ট ভাবে করেছিল, কিন্তু তা আজও ফাইলবন্দি।

বর্তমান কাঠামোয় এই সংস্কার কেন্দ্র-রাজ্য যুক্তরাষ্ট্রীয় বিতর্কে আটকে থাকলে চলবে না। যে ‘ল্যাটারাল এন্ট্রি’র কথা মাঝে মাঝে শোনা যায়, সেও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ, পূর্ণকালীন গবেষক বা অধ্যাপক স্থায়ী চাকরির নিরাপত্তা ছেড়ে আসতে চাইবেন না। বরং পাঁচ বছরের ‘লিয়েন’-এ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাঁরা সরকারের রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলিকে নীতিগত ভাবে বিশ্লেষণ করে বাস্তবায়নের রোডম্যাপ তৈরি করবেন। আর আমলারা তা পরিচালনার কাজ করবেন। আমলা সর্বজ্ঞ নন, সমন্বয়কারী। এই সত্য মেনে নেওয়াই প্রকৃত সংস্কারের প্রথম পদক্ষেপ।

দ্য জেনিভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন