Alaska Range

বিজ্ঞানে মিশুক আদি জ্ঞান

গঙ্গোত্রী থেকে নেমে আসা গঙ্গা আর তার শাখানদী হুগলি যেমন হিমবাহ-সৃষ্ট, তেমনই হিমালয়ের হিমবাহ থেকে তৈরি হয়েছে নেপালের কর্নাল, ভুটানের মানস আর বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা। হিমবাহকে আপাতস্থবির মনে হলেও এই জমে থাকা বরফেও গতি থাকে।

নাভিদ সালেহ

শেষ আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৪৩
Share:

হিমবাহের সম্মুখে দাঁড়ালে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ছেয়ে ফেলে চারিধার। যত দূর দৃষ্টি যায়, কেবল অন্তহীন নীলাভ বরফের ভাস্কর্য— গতিহীন, প্রাচীন, অটল। যেন একটু উষ্ণতার অপেক্ষায় রয়েছে এই নদী-উৎস। গ্রীষ্মের আঁচ পেলেই অবসান হবে সে অপেক্ষার। অ্যালাস্কার হিমবাহের সঙ্গে পরিচয় নেই আমার। তবে, অস্তমান সূর্যের ছটা যখন তার বরফে ঢাকা উপরিতল স্পর্শ করে, তখন উত্তরবঙ্গ থেকে বিস্ময়ে দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘার কথা মনে পড়ে। অ্যালাস্কা রেঞ্জ আর হিমালয়ের হিমবাহের ভিতর তফাত তুষারপাতে নয়, বরফের নীলাভ উচ্ছ্বাসে নয়, বরং তা থেকে সৃষ্ট নদীর বহমানতায়, সঞ্চারণে। তাই অচেনা জমাট-বরফের পাশে দাঁড়িয়েও আমি ভেবেছি উপমহাদেশের নদীগুলোর প্রবহমানতার কথা, ভবিষ্যতের কথা।

গঙ্গোত্রী থেকে নেমে আসা গঙ্গা আর তার শাখানদী হুগলি যেমন হিমবাহ-সৃষ্ট, তেমনই হিমালয়ের হিমবাহ থেকে তৈরি হয়েছে নেপালের কর্নাল, ভুটানের মানস আর বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা। হিমবাহকে আপাতস্থবির মনে হলেও এই জমে থাকা বরফেও গতি থাকে। পাহাড়ের গা ঘষে ধীর লয়ে এগোয় এই জমাট নদী। হিমবাহ থেকে নদী-জন্মের প্রক্রিয়াটি অভিনব। এক দিকে যেমন তুষার সঞ্চিত হতে হতে বরফের স্ফটিক হিমবাহ গড়তে থাকে, অন্য দিকে হিমবাহের বরফ গলনে সৃষ্ট হয় জলধারা। বরফের এই গলন ঘটে তিনটি স্তরে— হিমবাহের পৃষ্ঠদেশে সূর্যতাপ-জনিত গলন, অভ্যন্তরে মৌসুমি তাপমাত্রা-জনিত গলন, আর তলদেশে পাহাড়ের পৃষ্ঠদেশের সঙ্গে ঘর্ষণ-জনিত গলন। এই গলিত জলে মিশে থাকে কোয়ার্টজ়-সহ নানা খনিজ। জলের প্রবহমানতায় এই খনিজ পলল খানিক অবক্ষিপ্ত হয়, আর এর অধিকাংশই স্রোতের সঙ্গে বয়ে চলে। জন্ম হয় নদীর।

হিমবাহ গলে নদীর জন্ম যেমন একটি স্বাভাবিক, চিরায়ত প্রক্রিয়া, অন্য দিকে উষ্ণায়নের ফলে সংঘটিত অতি-গলন জলপ্রবাহের ভারসাম্যে বাদ সাধছে। অর্থাৎ, বর্ষায় দেখা যাচ্ছে হিমবাহ-জাত হ্রদ থেকে প্রলয়ঙ্করী বন্যা, আর শুষ্ক মরসুমে ঘটছে জলশূন্যতা। এ প্রসঙ্গে, ২০২৩-এ দক্ষিণ লোনাক হিমবাহ-হ্রদ সৃষ্ট বন্যায় তিস্তা অববাহিকার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্য। সিকিমের তিস্তা বাঁধে দেখা দিয়েছিল ভাঙন। আর কালিম্পং ও দার্জিলিঙের বিশাল এলাকায় নেমে এসেছিল বন্যার স্রোত। ২০২৪-এ হিমবাহের অতি-গলনে আফগানিস্তান ও উত্তর পাকিস্তানের গিলগিট-বালটিস্তান অঞ্চলে প্রায় ১০০০ লোকের প্রাণহানি ঘটে। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গবেষণা বলছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে আগামী তিন থেকে ছয় দশকের ভিতর হিমালয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হিমবাহের লক্ষণীয় গলন ঘটবে। আর তাই, আগামী দশকগুলিতে বন্যার তীব্রতা ও তার পুনরাবৃত্তি এই অঞ্চলের নদীগুলিকে অস্থির করে তুলবে বলে অনুমান। হিমবাহ প্রায়-নিঃশেষিত হওয়ার পর অতি-জলপ্রবাহ রূপান্তরিত হবে জলশূন্যতায়। কেবল জলের পরিমাণ নিয়ে জটিলতা নয়, হিমবাহ-নিঃসৃত খনিজ আর পাহাড়ি নদীর পলল বদলে দিতে পারে জলের গুণাগুণও। এই অবশ্যম্ভাবিতা একটি দিকেই ইঙ্গিত করছে— প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এখনই।

এই প্রস্তুতি কি কেবল সরকারি পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে? না কি স্থানীয়দের সম্পৃক্ততাও জরুরি? ২০২৩-এর বন্যার পর তিস্তা নদীর পলল নিষ্কাশন করা হয়েছে দার্জিলিং আর শিলিগুড়ির সংযোগ সেতু ‘সেবক’ থেকে ময়নাগুড়ি পর্যন্ত, প্রায় ৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে। এতে তিস্তার নাব্যতা কিছুটা হলেও বাড়বে বলে প্রত্যাশা। আবার বন্যা-পরবর্তী সময়ে ‘জল ধরো-জল ভরো’ প্রকল্পের মাধ্যমে বৃষ্টির জল সংগ্রহের যে পদক্ষেপ করা হয়েছে, তা শুষ্ক মরসুমে জলের অভাব কিছুটা হলেও পূরণ করবে। এ ছাড়া, বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও এই প্রস্তুতিতে জোর দিয়েছে। আঞ্চলিক পদক্ষেপের ভিতর নেপাল ও ভুটানে বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদ সমূহে নিষ্কাশন কর্মকাণ্ড চালিয়ে জলসীমা নীচে নামানো হচ্ছে। আর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে, সুইৎজ়ারল্যান্ডে হিমবাহের পৃষ্ঠদেশ থেকে জল সরানো হচ্ছে, পেরু ও আইসল্যান্ডে হ্রদের জলসীমা পর্যবেক্ষণ জোরালো করার মধ্য দিয়ে বন্যার পূর্বাভাস নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে এই দেশগুলির কর্মকাণ্ডে স্থানীয়দের সম্পৃক্তি জড়িয়ে রয়েছে।

রাষ্ট্রপুঞ্জের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্যানেল আইপিসিসি-র ২০২১-এর বার্ষিক রিপোর্ট বলছে, স্থানীয় সংস্কৃতি ও চর্চা এবং আদি জ্ঞান যদি বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্মিলিত হয়, তবেই অন্তর্ভুক্তিমূলক অভিযোজন পরিকল্পনা কার্যকর হবে। অন্যথায়, বিজ্ঞান-সৃষ্ট তথ্য বা জ্ঞান প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছতে বিলম্ব ঘটতে পারে, যা সংশোধন-অতীত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের দুর্ভোগ প্রান্তিক মানুষকে যে ভাবে আঘাত করে, বাকি জনগোষ্ঠীর উপর তেমন ভাবে করে না। তাই স্থানীয়দের সম্পৃক্তি যথার্থ অভিযোজনের জন্য আবশ্যক। আর আদি জ্ঞানের শক্তির কথা আধুনিক বিজ্ঞান স্বীকার না করলেও এর সম্পৃক্ততা ছাড়া কোনও সমাধানে পৌঁছনো যাবে না। রবিন ওয়াল কিমেরার তাঁর ব্রেডিং সুইটগ্রাস গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আদি জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকল্প নয়, বরং তার পরিপূরক।

অ্যালাস্কার হিমবাহ সুদূরের, অচেনা। তবে এই নীল জমাট বরফ-নদীর স্পন্দন যেন ছড়িয়ে যায় হিমালয়ের পর্বতশৃঙ্গে। সেই একই প্রকাণ্ডতা, একই নীলাভ নিস্তব্ধতা, সূর্যাস্তে একই আলোকচ্ছটার বিচ্ছুরণ। অ্যালাস্কার আথাবাস্কান আদিবাসীদের আদি জ্ঞান, জলের রং, উষ্ণতা, সুবাস যেমন করে জেনে যায় আগামীর বার্তা, তেমনই উপমহাদেশের নদীপাড়ের মানুষেরাও শোনেন ভবিষ্যতের ঘণ্টাধ্বনি। তাঁদের ছেড়ে কোনও পূর্বাভাসই তেমন ফলপ্রসূ হবে না। ভবিষ্যতের শঙ্কার কথা ভেবে আঞ্চলিক সহযোগিতার পাশাপাশি সিন্ধু উপত্যকা আর গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার মানুষদের সঙ্গে নিয়েই প্রস্তুতি নিতে হবে। কেননা, এই অঞ্চলের মানুষ কান পাতলেই শুনতে পায় হিমবাহের নীরব কলস্রোত, যেমনটি আমি শুনেছিলাম দূর মেরুদেশে।

ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিন

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন