Anik Dutta Death

রাজনীতি আর মেধার মিশেল

অনীক একা নন। কলকাতার পাঠভবন স্কুলের বহু প্রাক্তনীই সৃষ্টিশীলতার ভূতধন্য। স্কুল পাশ করে অনীক সেন্ট জ়েভিয়ার’স কলেজে অর্থনীতির ছাত্র হয়েছিলেন।

গৌতম চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ৩০ মে ২০২৬ ০৮:৩৪
Share:

বার্ষিক পরীক্ষার রেজ়াল্ট বেরোনোর আগে ভূতেরা বারংবার আমার কানের কাছে বলে গিয়েছে, “বুরুন, তুমি অঙ্কে তেরো।” ভবিষ্যদ্বাণী বারংবার ফলে গিয়েছে। কিন্তু নিধিরামরা কোনও দিন দেখা দেয়নি। এই দুঃখ ভবিষ্যতে ভূত হয়েও আমার যাবে না। আমার মতোই, বামপন্থীদের জীবনেরও ভূত ব্যাপারটা জরুরি। কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো-র প্রথম লাইনটাকে এ ভাবেও পড়া যায় যে, ইউরোপ আজ ‘কমিউনিজ়মের ভূত’ দেখছে। ভূতের উপলব্ধি থেকেই বামপন্থীরা ভবিষ্যতের স্বপ্নে পৌঁছয়। তাতে অসুবিধা নেই। কোনও অবিসংবাদিত নেত্রী বা ঈশ্বরপুত্র নেতার কাছে নতমস্তক হওয়ার থেকে ভূতবিশ্বাস ঢের উপকারী। অনীক দত্ত (ছবি) এই বঙ্গসমাজে বামপন্থী মননের অন্যতম পরিচালক। তবে, আত্মহত্যার ভূত যে এ ভাবে তাঁর মতো হাসিখুশি ও প্রতিবাদী পরিচালককে তাড়া করবে, কে জানত!

অনীক অবশ্য বিজ্ঞাপনী তারুণ্য থেকেই ভূতেদের আশীর্বাদধন্য। একদা দেবদূত ঘোষ ও স্বস্তিকাকে নিয়ে একটি বিস্কুটের বিজ্ঞাপন করেছিলেন। স্বস্তিকাই পরবর্তী কালে তাঁর প্রথম ছবিতে ভূতনি কদলীবালা হয়ে উঠবেন, এবং সেই বিজ্ঞাপনী ছবির মতোই অতুলপ্রসাদী ‘যাব না ঘরে’র আদলে গাইবেন: ‘আঁমি দেঁবো নাঁ দেঁবো...’।

অনীক একা নন। কলকাতার পাঠভবন স্কুলের বহু প্রাক্তনীই সৃষ্টিশীলতার ভূতধন্য। স্কুল পাশ করে অনীক সেন্ট জ়েভিয়ার’স কলেজে অর্থনীতির ছাত্র হয়েছিলেন। ভূতেরা সেই গুপী গাইনের আমল থেকে যেখানে খুশি যাইতে পারে, ভূতের রাজার বরে যা খুশি গাইতে পারে ও খাইতে পারে। ফলে অম্বানী-আদানি নয়, বরং জনকল্যাণমূলক অর্থনীতির প্রতি ভূতের রাজা ও তার প্রজাদের কৃপাদৃষ্টি রয়েছে।

অনীক ভূতেদের এই কল্যাণকামিতার কথা জানতেন। তাঁর ভূতের ভবিষ্যৎ-এর ভূতেরা তাই ভয় দেখায় না। হিন্দু-মুসলমান, জমিদার-নকশাল, রাষ্ট্রবাদী সেনাধ্যক্ষ থেকে গরিবস্য গরিব রিকশাওয়ালা সকলে তাই পোড়ো, ভগ্নপ্রায় চৌধুরী প্যালেসে আশ্রয় নিয়েছে। ছবিটা ফের দেখতে দেখতে মনে হল, ২০১২ সালের সেই ছবিতে প্রথম আবির্ভাবেই অনীক মজাদার মোড়কে অনেক কথা বলে দিয়েছিলেন। ভূতুড়ে বাড়িতে সব ভূতেরই সমান অধিকার। সেই বছরের ২৯ এপ্রিল, রবিবার ছবিটি নিয়ে লেখার সময় যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্যে আমার শিক্ষিকা নবনীতা দেব সেনও বলেছিলেন, “কাতুকুতু দিয়ে হাসি নয়, এই রকম মেধাবী উইট বহুদিন পরে দেখলাম।”

লেখা বেরোনোর পর অনেকের প্রশ্ন ছিল, প্রথম পাতায় সিনেমার খবর? সবই ভূতেদের আশীর্বাদ! ছবিটার প্রথমে মাল্টিপ্লেক্সে একটি শো ছিল, তার পর ভিড়ের চোটে ক্রমে সন্ধে ৬টার প্রাইম টাইম ও একাধিক শো। তখনও লোকে আজকালকার মতো ‘বাংলা ছবির পাশে দাঁড়ান’ মার্কা আবেদন করেনি। তবু ভূতেদের আশীর্বাদে পুরো সমাজে এমন প্রভাব পড়ল যে, খবরের কাগজও তাকে অস্বীকার করতে পারল না। সেই ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের আমল থেকে ঘ্যাঁঘো ও লুল্লু ভূত ছাপাখানায় ভুলভাল বানান তৈরি করে ‘ছাপাখানার ভূত’ নামে খ্যাত। কিন্তু অনীকের ভূতেরা তার থেকেও শক্তিশালী। শুধু বানান নয়, সেই প্রথম তারা কাগজের সম্পাদকীয় দফতরে প্রভাব ফেলেছিল, তার পর নবনীতাদির ‘ভালো-বাসা’ বাড়িতে উড়ে গিয়েছিল।

এই উপকারী ভূতেরাই তো বাংলা সংস্কৃতির দিকচিহ্ন। উপেন্দ্রকিশোরের গল্পে ভূতেদের ‘তেল হ্যায় নুন হ্যায় ইমলি হ্যায় হিং হ্যায়’ শুনে যে বলেছিল ‘রসুন হ্যায় মরিচ হ্যায় চ্যাং ব্যাং শুঁটকি হ্যায়’, তার কুঁজ ভূতেরা সারিয়ে দেয়। আর ‘গুরুচরণ ময়রার দোকানের কাঁচাগোল্লা হ্যায়’ বলে যে চেঁচিয়েছিল, ভূতেরা তার পিঠে আর একটা আস্ত কুঁজ বসিয়ে দেয়। বাংলার ভূতেরা সেই উপেন্দ্রকিশোরের আমল থেকে প্রলেতারিয়েত-দরদি। আমাদের রামচন্দ্র কি শুধু সীতা বিসর্জন দেন আর শম্বুক হত্যা করেন? সবাই জানে, ‘ভূত আমার পুত, পেতনি আমার ঝি/ রাম লক্ষ্মণ বুকে আছে করবি আমার কী’ বললে ভূতেরা পালিয়ে যায়। হিন্দুত্ববাদী ‘জয়শ্রী রাম’ নয়, দুই ভাইকেই বুকে ধরতে হবে। এটাই বাঙালিয়ানা!

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ গল্প নিয়েও ছবি তৈরি করেছিলেন অনীক। উপরে ওঠার নেশায় গল্পের নায়ক প্রদীপের দৈত্যকে একের পর এক হুকুম করে। শেষে রিসর্টে একটি কলগার্লকে আনতে হুকুম করে। ডোর বেল বাজলে দেখে, দরজায় তার স্ত্রী! সহজ সরল নীতিবোধের চিরাচরিত গল্প? না কি, সিঁড়ি ভাঙার নেশায়, ‘সব পেতে হবে’-র উন্মত্ত নেশায় কাতর এক কনজ়িউমার সোসাইটির গল্প? অনীক দত্ত শ্রীলেখা মিত্রের পাশাপাশি ‘সত্যজিৎ’বেশী জিতু কমল, বিজয়া রায় চরিত্রে সায়নী ঘোষ— অনেকেরই সেরাটা বার করে এনেছেন। সেটাই পরিচালকের প্রাপ্তি।

আর একটা স্মৃতি না বললে অন্যায় হবে। সেটি নন্দনের ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘এত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণার ফলক কেন’ নিয়ে অনীকের সেই বিখ্যাত বক্তৃতা। রিপোর্টার হিসাবে গুনে গুনে দেখলাম, শিশির মঞ্চ থেকে রবীন্দ্র সদন, নন্দন, বাংলা আকাদেমি থেকে ভাষা শহিদ উদ্যান অবধি মোট ৩১টি ফলক। দোতলার লবি কার্ডে সত্যজিৎ, মৃণাল, আন্তোনিয়োনি সকলের ছবি উধাও। ব্যস, সন্ধ্যায় অফিস ফিরে ফেস্টিভ্যালের কপি লিখতে আর কত ক্ষণ লাগে!

ভূত নয়, খোদ অনীক দত্তের অনুপ্রেরণা!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন