Tired

নিরাপদ থাকার নীরবতা

আজকের ভারতে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক কোনও স্থির বিন্দু নয়। এটি এক ধরনের চলমান অভ্যাস। প্রতি দিনের ছোট সিদ্ধান্তে, সামান্য সমঝোতায়, আপসে, অদৃশ্য সীমারেখা মেনে চলার মধ্য দিয়েই এই সম্পর্ক টিকে থাকে।

রোহন ইসলাম

শেষ আপডেট: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৩৭
Share:

এখন ক্লান্তি আর ব্যক্তিগত অনুভবের বিষয় নয়। এটি যেন আমাদের সময়ের একটি সামাজিক অবস্থা— যেখানে শরীরের আগে মনই শ্রান্ত হয়ে পড়ে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষ আর খুব বেশি কিছু প্রত্যাশা করে না। নিরাপত্তা নয়, ন্যায় নয়, এমনকি সুখও নয়। চাওয়া ক্রমে সঙ্কুচিত হয়ে এসে ঠেকেছে একটি শব্দে— সব কিছু যেন ‘স্বাভাবিক’ থাকে। আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ। কিন্তু তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সময়ের গভীরতম আপস।

আমরা কথা বলার আগে থেমে যাই— বলাটা আদৌ প্রয়োজন কি না ভেবে। প্রশ্ন করার আগেও এক মুহূর্ত দেরি করি— প্রশ্নটি অস্বাভাবিক শোনাবে কি না, যাচাই করতে। ধীরে ধীরে আমরা শিখে নিয়েছি, অস্বাভাবিক হয়ে ওঠাই সব চেয়ে বড় ঝুঁকি। এই তথাকথিত স্বাভাবিক থাকার চেষ্টাতেই আমরা বহু কিছু মেনে নিতে শিখেছি। অন্যায় নয়, বরং অনিশ্চয়তা। দমন নয়, বরং নীরবতা। অপমান নয়, বরং উপেক্ষা। মেনে নেওয়াই হয়ে উঠেছে স্থিতির ভাষা, আর চুপ থাকাই যেন নিরাপত্তার পথ।

অনুষা রিজ়ভি-র সাম্প্রতিক ছবি দ্য গ্রেট শামসুদ্দিন ফ্যামিলি (ছবিতে একটি দৃশ্য) এই ক্লান্ত স্বাভাবিকতার সময়েরই একটি শান্ত ধারাভাষ্য যেন। বড় কোনও নাটকীয় ভাঙন নেই, ঘোষণাও নেই। তবু অনেক কিছু বদলে যায়— আমাদের ব্যক্তিগত দৈনন্দিন জীবনের মতো। এই বদল সম্পর্কের ভিতরে, কথোপকথনের ফাঁকে, না-বলা বাক্যের ভিতরে। এই পরিবারটি আলাদা নয়। তারা আমাদের চেনা। তাদের ভয় আমাদের ভয়। তাদের হিসাব আমাদের হিসাব। তাদের জীবনের ভিতরেই আমরা নিজেদের ছায়া খুঁজে পাই— যেটা দেখতে আমরা সচরাচর প্রস্তুত থাকি না।

আজকের ভারতে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক কোনও স্থির বিন্দু নয়। এটি এক ধরনের চলমান অভ্যাস। প্রতি দিনের ছোট সিদ্ধান্তে, সামান্য সমঝোতায়, আপসে, অদৃশ্য সীমারেখা মেনে চলার মধ্য দিয়েই এই সম্পর্ক টিকে থাকে। কোথায় যাওয়া নিরাপদ, কী বলা উচিত নয়, কোন বিষয়ে চুপ থাকাই বুদ্ধিমানের— এই সব হিসাবের মধ্য দিয়েই নাগরিক জীবন গড়ে ওঠে। সবাই কেবল ভাবে— কী করলে বিপদ কম হবে। বেঁচে থাকা সহজ হবে। সব কিছু ‘স্বাভাবিক’ মনে হবে। নিজেকে ক্রমাগত গুটিয়ে নিতে থাকার এই প্রক্রিয়া ক্লান্ত করে আমাদের। এক সময় ন্যূনতম বেঁচে থাকার বাইরে আর কিছু নিয়ে ভাবার সামর্থ্য চলে যায়। সর্বাধিপত্যকামী রাষ্ট্র এমন নাগরিককেই চায়— যাঁরা প্রশ্ন ভুলেছেন স্বেচ্ছায়।

প্রশ্ন করব কি না— তার আগে ভাবি, কে শুনবে, কী ভাবে শুনবে, আর শুনলে তার পরিণতি কী হতে পারে। এই অবিরাম হিসাব আমাদের ক্লান্ত করে। এই ক্লান্তি কোনও ব্যক্তিগত দুর্বলতার ফল নয়। এটি একটি সামাজিক অবস্থা— যেখানে মানুষ প্রতি দিন একটু একটু করে নিজেকে সামলে নেয়। এখানে নীরবতা ভয় নয়। নীরবতা কৌশল।

আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে স্বাভাবিক থাকা নিজেই একটি রাজনৈতিক কাজ। নিজের দৈনন্দিনতাকে অক্ষত রাখা, পরিবারকে ভেঙে না পড়তে দেওয়া— এই সবই হয়ে উঠেছে সংগ্রাম। এই সংগ্রামের বিলক্ষণ ‘খরচ’ আছে— যা সব সময় দৃশ্যমান নয়। এটি জমে থাকে অভিমানে, ক্ষোভে, অপূর্ণ কথায়। পরিবারের ভিতরে এই জমে থাকা অনুভূতি খুব কমই প্রকাশ পায়। কেউ কাউকে সরাসরি দোষ দেয় না। কেউ কাউকে অভিযুক্তও করে না। সবাই কেবল একটু একটু করে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। এই গুটিয়ে নেওয়াই আমাদের সময়ের সবচেয়ে নীরব প্রতিবাদ।

আজকের ভারতে কী নিয়ে হাসা যাবে, কী নিয়ে চুপ থাকাই শ্রেয়— এই সিদ্ধান্তগুলো যেন আমাদের হয়ে আগেই নেওয়া থাকে। দ্য গ্রেট শামসুদ্দিন ফ্যামিলি সেই পরিবেশের ছবি। যেখানে কেউ নিষেধাজ্ঞা জারি করে না, তবু সবাই জানে— কোথায় থামতে হবে। এই জানাটাই সবচেয়ে গভীর ক্ষমতার চিহ্ন। কারণ, এখানে বাধ্য করার দরকার পড়ে না। মানুষ নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। পরিবার এই নিয়ন্ত্রণ শেখার প্রথম জায়গা। এখানেই শেখা হয়— কী বলা যাবে, কী বলা যাবে না। এই ‘শেখা’ পরে সমাজে ‘কাজে’ লাগে। ছবিটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, গণতন্ত্র কেবল ভোট বা সংবিধানের বিষয় নয়। গণতন্ত্র হল এক ধরনের বিশ্বাসের সম্পর্ক। বিশ্বাস যে— কথা বললে শোনা হবে। কিন্তু, যখন এই বিশ্বাস ক্ষয়ে যায়, তখন মানুষ কথা বলা বন্ধ করে দেয়। পরিবার তখন একমাত্র জায়গা হয়ে ওঠে যেখানে কিছু বলা যায়— তবু সেখানেও পুরোটা বলা যায় কি? এই আধখানা কথার ভিতরেই লুকিয়ে থাকে সময়ের বিষাদ।

এই বিষাদ, এই ক্লান্তির কোনও একক কারণ নেই। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক নজরদারি, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্থায়ী ভয়— সব মিলিয়ে এক ধরনের অবিরাম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই উদ্বেগ ব্যক্তিগত মনে হলেও, আসলে তা সামাজিক। আমরা সবাই কোনও না কোনও ভাবে এই উদ্বেগের হিসাব কষে বাঁচছি। এই মানিয়ে নেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের সময়ের সব চেয়ে বড় প্রশ্ন। মানিয়ে নেওয়া কি বাঁচা, না কি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া?

আমরা কি এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে ভাল থাকা মানে চুপ থাকা? যেখানে নিরাপত্তা মানে অদৃশ্য হয়ে থাকা? দ্য গ্রেট শামসুদ্দিন ফ্যামিলি এই প্রশ্নগুলো আমাদের কানে কানে বলে যায়। আমাদের নীরবতাকে চিনতে শেখায়।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন