এই রাজ্য উন্নয়ন চায়, ধর্ম বা রাজনীতির নামে তাণ্ডব নয়
West Bengal Assembly Election Results 2026

উদার সংস্কৃতি অটুট থাকুক

একই সঙ্গে সংখ্যালঘুদের উপর এক ঘোর কালো ছায়াও দেখা দিয়েছে। ভয় পাচ্ছেন তাঁরা, সঙ্গত কারণেই। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও সমর্থকদের মাঝেও দুঃখের থেকে বেশি আশঙ্কা-আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শুরু হয়ে গেছে ভাঙচুর— কখনও দলের অফিস বা ডেরায়, কখনও বাড়ি বা সম্পত্তিতে।

জহর সরকার

শেষ আপডেট: ১১ মে ২০২৬ ০৭:৫৭
Share:

পরিচয়-পরীক্ষা: এসআইআর চলাকালীন ট্রাইবুনালের সামনে আবেদনকারিণী, আলিপুর, ১১ এপ্রিল। ছবি: বিশ্বনাথ বণিক।

পশ্চিমবঙ্গ এখন ভারতীয় জনতা পার্টি শাসিত রাজ্য। আশা-আশঙ্কার নতুন দোলাচল। অনেকেই মনে করছেন, বাংলার এখন কিছু উন্নতি হতে পারে। শিল্প, বিনিয়োগ আর চাকরির যে আকাল চলছিল, তার এখন কিছু না কিছু সুরাহা হতে পারে। আমাদের ছেলেমেয়েরা বেকারত্বের হাত থেকে বাঁচলেও বাঁচতে পারে।

একই সঙ্গে সংখ্যালঘুদের উপর এক ঘোর কালো ছায়াও দেখা দিয়েছে। ভয় পাচ্ছেন তাঁরা, সঙ্গত কারণেই। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও সমর্থকদের মাঝেও দুঃখের থেকে বেশি আশঙ্কা-আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শুরু হয়ে গেছে ভাঙচুর— কখনও দলের অফিস বা ডেরায়, কখনও বাড়ি বা সম্পত্তিতে। মুখ্যমন্ত্রী পদে অভিষেকের আগেই শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সচিবকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হল, খুবই রহস্যজনক ও পূর্ব-পরিকল্পিত ভাবে। ঘটনাটি নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে। এ ছাড়াও বেশ কিছু মৃত্যুর খবর মিলেছে। এমনও শোনা গিয়েছে, কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী যাওয়ার পর আরও হিসাবনিকাশ হবে। প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের নির্বাচনের পরও তা-ই হয়েছিল— বিজেপির সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম যা খুব বেশি করেই দেখিয়েছিল।

এ দিকে সারা ভারতে এক উত্তপ্ত বিতণ্ডা চলছে— এই জয় পরাজয়ের জন্য নির্বাচন কমিশনের হাত আছে কি না। ৭৫ বছরের সুশৃঙ্খল ভোটার তালিকার সংশোধন প্রণালী ভেঙে এ বার এক নতুন জটিল পদ্ধতি প্রবর্তন করা হল, যার নাম বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। ভোটার তালিকাকে ‘পরিষ্কার’ বা বিশুদ্ধ করার জন্যে ডান দিক বাঁ দিক নাম কাটা হল। কখনও বলা হল এগুলো নাকি ম্যাপিং-এর সুবাদে, অন্য স্তরে জানানো হল এ সব বিচারাধীন (আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন)— যার জন্য কোটির বেশি লোককে বলা হল লাইনে দাঁড়িয়ে বিরক্ত আমলাদের সামনে প্রমাণ করুন যে, আপনি আপনিই। স্বাধীনতার পর ভারতের নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার জন্য এত হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়নি।

মনে পড়ে অনেক ইতিহাস। প্রথম মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার (সিইসি) সুকুমার সেনের নির্দেশে অফিসাররা ঘরে ঘরে গিয়ে কত কাকুতি-মিনতি করে নাগরিকদের ভোটার তালিকায় নথিভুক্ত করেছিলেন। তার পর এটাই মোটামুটি রেওয়াজে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। তেইশ জন সিইসি, যার মধ্যে ছিলেন এস পি সেন বর্মা, পেরি শাস্ত্রী, টি এন শেষন আর জে এম লিংডো-র মতো কিংবদন্তি, সবাই এই পদ্ধতি পালন করেছেন। ২৫তম সিইসি অবশ্য সেই পরিচিত পথে হাঁটেননি। তিনি যে নিয়ম চালু করেছেন, তাতে ভোটার হতে গেলে বা তালিকায় নাম রাখতে গেলে এক বৃহৎ সংখ্যক নাগরিকের প্রচুর যন্ত্রণায় ভোগা ছাড়া গতি নেই। একচল্লিশ বছর সরকারি কাজ করার অভিজ্ঞতা (যার মধ্যে চার বছর নির্বাচন কমিশনে কাজ) থেকে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই বারের এসআইআর সরকারি প্রকল্প নয়— এটি উচ্চমানের কর্পোরেট উকিল ও কৌশল-উদ্ভাবকদের তৈরি অস্ত্র। এ বারের কম্পিউটারের প্রোগ্রাম বা সোর্স কোড কাউকে বলা হয়নি। তবে এটুকু বোঝা গিয়েছে, এই প্রোগ্রাম নাম-চেনা নিয়ে মোটেই নিরপেক্ষ নয়, কিছু বিশেষ ধরনের নাম চিনে তা বাদ দিতে জানে। এর ফলে কী ভাবে বাংলায় লক্ষ লক্ষ লোক বিচারাধীন (আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন) আওতায় পড়ে গেলেন, তা এখন সকলের জানা। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের অভূতপূর্ব আদেশে স্থির হল, একমাত্র বাংলায় এই সমগ্র বিষয়টির বিচার করবে খোদ বিচারকেরা। জেলার অফিসারদের সরিয়ে দিয়ে, এ দিক-ও দিক থেকে ৭০০ বিচারবিভাগীয় আধিকারিককে আনা হল, আর তাঁরা কাগজের পাহাড় সামলালেন। কাগজের পাহাড় কথাটি আলঙ্কারিক নয়, সত্যিই হিমালয়সমান দায়িত্ব সামলাতে হল বিচারকদের। শেষে দেখা গেল, সব মিলিয়ে ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হল। ২৭ লক্ষ লোক এর প্রতিবাদে আপিল বা উত্তরবিচার নিবেদনে ফাইল করলেন। বহু লক্ষ লোক জানতেই পারলেন না যে, তাঁরা তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।

সুপ্রিম কোর্টের আর একটি নির্দেশও অভূতপূর্ব, সুদূরপ্রসারী তার ফলাফল: জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২৪ নম্বর ধারা এ বার নিষ্ক্রিয় করা হল। এই আইন মোতাবেক জেলার নির্বাচন আধিকারিকরা গত পঁচাত্তর বছর ধরে এই সব আপিল দ্রুত গতিতে নিষ্পত্তি করেছেন। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে এ বার এ কাজ করলেন হাই কোর্টের বিচারপতিরা, আর তাঁদের বেশি সময় লাগার কারণে শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, ২৭ লক্ষ আবেদনকারী এ বার তাঁদের ভোট দিতে পারবেন না। শেক্সপিয়র-এর হ্যামলেট বলেছিলেন, এই পৃথিবীতে অনেক জিনিস আছে যা আমাদের বোধশক্তির ঊর্ধ্বে। এঁরা ভোট দিতে পারলে কী অঙ্ক হত, আর যেখানে অতিরিক্ত মাত্রায় নাম বাদ গিয়েছে, তার ফল কী হয়েছে, এই নিয়ে পণ্ডিতেরা বিশ্লেষণ করে চলেছেন, আরওকরবেন। তবে সন্দেহ নেই যে, এর ফলে এ রাজ্যে মুসলিম ও মহিলাদের ভোটের একটা বড় অংশ বাদ গিয়েছে, আর সেই ভোট সম্ভবত তৃণমূলের ঝুলি থেকেই বাদ গিয়েছে।

এখানে অন্য কয়েকটি বিষয় কিন্তু অনস্বীকার্য। যার প্রথম হল, তৃণমূল সরকারের দুর্নীতি, দাদাগিরি আর রাজ্যে অর্থনৈতিক অবনতির বিরুদ্ধে এক বিশাল জনরোষ খুবই প্রবল ছিল। তাই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, যাঁরা পছন্দ না-করলেও ওই দলকেই ভোট দিয়ে এসেছেন সাম্প্রদায়িক দলকে আটকানোর জন্য, তাঁরা উত্ত্যক্ত হয়ে বিজেপির পক্ষে ঝুঁকেছেন। তবে সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি এর ফলে কী হবে জানা নেই— কেননা এখনই রাজ্য জুড়ে জোর গলায় ‘জয় শ্রীরাম’ অভিযান চলছে। পনেরো বছর ধরে একটি শ্রেণিকে বিভিন্ন অ্যাপ-নিয়ন্ত্রিত খাদ্য পরিবহণ ও ই-কমার্স সংস্থার ডেলিভারি করে বা হকারি করে সংসার টানতে হয়েছে। আর দেখতে হয়েছে, দু’-পয়সার পাড়ার মস্তান পার্টি করে কুঁড়েঘর থেকে বিশাল বাড়ি বানিয়ে নিয়েছে। শিক্ষিত যুবকেরা কৈশোর থেকে যৌবন অবধি শুনে গিয়েছেন মোদীর পাঁচালি আর তাঁর আশ্বাস। তাঁরা ভোট দেবেন না কেন, স্লোগানেই বা পিছিয়ে থাকবেন কেন?

সকলেই এখন উদ্‌গ্রীব হয়ে বসে আছেন শিল্প, লগ্নি, কর্মসংস্থান, উন্নয়নের অপেক্ষায়। অনেকেই ভীষণ আনন্দিত অনেক বছর পর এই প্রথম কেন্দ্রীয় সরকার আর বাংলা একই দলের। দু’প্রজন্ম ধরে এত তিক্ততা আর ভাল তো লাগেই না, রাজ্যটির অনেক ক্ষতিও হয়েছে। কেন্দ্রের তরফে বন্ধ ছিল আন্তরিক সাহায্য। কিন্তু শিল্প আর লগ্নির জন্যে যদি ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার এতই আবশ্যক, তবে তামিলনাড়ু, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র বা তেলঙ্গানা এত এগিয়ে গেল কী করে? আর উত্তরপ্রদেশ (নয়ডা বাদ দিয়ে), বিহার ও মধ্যপ্রদেশের অবস্থা এত শোচনীয়ই বা কেন? এ সব যুক্তিতর্ক বাদ দিয়ে এখন প্রার্থনা করি, বাংলায় লগ্নি আসুক, কর্মসংস্থান বাড়ুক।

পরিশেষে একটি কথা। বিজেপি এক বার জিতেছে মানেই এই নয় যে, বাংলার উদার সংস্কৃতি সকলেই বর্জন করেছে আর উত্তর ও পশ্চিম ভারতের মতো আমরাও ধর্ম, সম্প্রদায় বা জাতপাত নিয়ে ডুবে থাকব। অস্বীকার করা যায় না যে, দুই শতকের নবজাগরণের মূল্যবোধে ক্ষয় ধরেছে আর অনেকেই হঠাৎ জাতি-অহঙ্কার রোগে জর্জরিত। কিন্তু বাংলার সংস্কৃতি, ভাষা আর মূল্যবোধ এখনও যথেষ্ট মজবুত।

বাঙালি সমাজে মুসলমানদের এক বিশেষ স্থান আছে। পৃথিবীতে যাঁরা বাংলায় কথা বলেন, তাঁদের দুই-তৃতীয়াংশ মুসলমান। ও-পার বাংলা কিন্তু গোঁড়া ধর্মবাদীদের জেতায়নি। এ-পার বাংলার প্রগতিশীল সংস্কৃতিও নিশ্চয়ই বিভেদপন্থীদের অযথা বাড়তে দেবে না। সকলে চাই অর্থনৈতিক উন্নয়ন— ধর্মের বা রাজনীতির নামে তাণ্ডব নয়।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন