ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কোনও রাজ্যের উন্নয়ন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের ভূমিকার গুরুত্ব আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। রাজ্যে বসবাসকারী মানুষ ও বেসরকারি ক্ষেত্রের কর্মক্ষমতার পিছনে রাজ্য সরকারের নীতির প্রত্যক্ষ প্রভাব কেন্দ্রীয় নীতির প্রভাবের তুলনায় সচরাচর বেশি হয়। রাজ্যের অন্য অর্থনৈতিক অংশীদারদের সিদ্ধান্তের উপরেও বহুলাংশে নির্ধারিত হয় রাজ্য সরকারের নীতিগত পদক্ষেপ। বৃদ্ধি ও উন্নয়নের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করাই একটি রাজ্য সরকারের মূল দায়িত্ব। অবশ্য ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্যগুলি জাতীয় ব্যবস্থারও অংশ, ফলে কেন্দ্রীয় নীতির প্রভাবও রাজ্য সরকারের ভূমিকার উপরে পড়ে। তবে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে কেন্দ্রের নীতি সব রাজ্যের ক্ষেত্রেই সম ভাবে প্রযোজ্য। এই লেখায় সেই প্রসঙ্গে ঢুকব না।
তবে এ কথাও সমান ভাবে সত্য যে, রাজ্য সরকারের নীতি ও কাজকর্ম বিচার করতে গেলে কেবল কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না— ভারতের সংবিধান যে দায়িত্ব রাজ্য সরকারকে দিয়েছে, তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ভারতে মৌলিক জনপরিষেবা দেওয়ার প্রধান দায়িত্ব রাজ্যগুলির। সামাজিক খাতে সরকারি ব্যয়ের বড় অংশও রাজ্য স্তরেই হয়। কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন সংবিধানগত ভাবে রাজ্যের বিষয়। এই দায়িত্ব পালন করতে গেলে সীমিত সম্পদের মধ্যে, নানা অগ্রাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। রাজ্যের নিজস্ব কর-সংগ্রহ বাড়লে আর্থিক স্বায়ত্তশাসন বাড়ে, এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা পূরণের জন্য বেশি সম্পদ হাতে আসে।
কোনও রাজ্যের বৃদ্ধি ও উন্নয়নের নির্দিষ্ট গতিপথের পিছনে বহুবিধ কারণ থাকে। ফলে, নির্দিষ্ট কোনও রাজ্য সরকারের কাজের মূল্যায়নে সতর্ক থাকা দরকার। অর্থনৈতিক বিচারে একটি রাজ্য কতটা এগোল, তার সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে, এবং কোন কোন নীতিগত পদক্ষেপ জরুরি— এ সব প্রশ্নের এক কথায় উত্তর হয় না; কী করলে অবস্থা পাল্টাবে, তার সহজসরল তালিকাও বানিয়ে ফেলা যায় না। এখানে সেই পূর্ণ মূল্যায়নের চেষ্টা করছি না। বরং আগামী মাসে যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে, তাদের সামনে থাকা কয়েকটি মধ্যমেয়াদি চ্যালেঞ্জের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।
শুরু করি সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান থেকে উঠে আসা দু’টি ইতিবাচক পরিবর্তন দিয়ে। প্রথমত, গত পনেরো বছরে পশ্চিমবঙ্গে সরকারি মূলধনি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০০১ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে রাজ্যের জিএসডিপি-র অনুপাতে মূলধনি ব্যয় ছিল ০.৭৯%। ২০২৫-২৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১.৯৪%। অর্থাৎ, প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি। রাজ্যের এই মূলধনি ব্যয় বৃদ্ধির অর্থ, উচ্চতর বৃদ্ধির ভিত শক্তিশালী হওয়া। তবে এই ধারা বজায় রাখতে হবে, এবং আগামী পাঁচ বছরে তা অন্তত জিএসডিপি-র ৩ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। তাতে মাল্টিপ্লায়ার এফেক্ট তৈরি হবে, আর্থিক বৃদ্ধি গতিশীল হবে, এবং প্রকৃত কর্মসংস্থান বাড়বে।
দ্বিতীয় ইতিবাচক দিক হল, সাম্প্রতিক কালে রাজ্যের ঋণের বোঝা কিছুটা কমেছে। দ্বাদশ অর্থ কমিশন থেকে শুরু করে পরবর্তী অর্থ কমিশনগুলির মূল্যায়নে পশ্চিমবঙ্গকে আর্থিক চাপে থাকা রাজ্য হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, এবং উচ্চ ঋণের চাপ কমাতে বিশেষ সহায়তাও দেওয়া হয়েছিল। কারণ, অতিরিক্ত ঋণ উন্নয়নমূলক ব্যয় করার ক্ষমতাকে গুরুতর ভাবে সীমিত করে। সেই দিক থেকে ঋণ কমা গুরুত্বপূর্ণ। ২০০১-২০১০ সময়কালে পশ্চিমবঙ্গের ঋণ ছিল গ্রোস স্টেট ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট (জিএসডিপি) বা রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৪৫%। ২০২৫-২৬ সালে তা কমে হয়েছে ৩৭.৯৮%। কিন্তু, ভারতের সব রাজ্যের গড় ঋণ-জিএসডিপি অনুপাত এখন প্রায় ২৮.১%। অর্থাৎ, জিএসডিপি-র তুলনায় ঋণের বোঝা পশ্চিমবঙ্গে এখনও সর্বভারতীয় গড়ের তুলনায় অনেকটাই বেশি। আর্থিক সংযমের প্রচেষ্টা তাই চালিয়ে যেতে হবে। নির্বাচনের পরে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তার উচিত একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করা, যাতে ঋণ-জিএসডিপি অনুপাত ধীরে ধীরে সর্বভারতীয় গড়ের কাছাকাছি আনা যায়। ঋণ কমলে সুদ পরিশোধের চাপ কমবে, উন্নয়নের জন্য হাতে টাকার পরিমাণও বেশি থাকবে।
তবে বিস্তৃত ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে গেলে কয়েকটি গুরুতর সমস্যার মোকাবিলা করা জরুরি। পশ্চিমবঙ্গ এক সময় ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ রাজ্য ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অন্য রাজ্যের তুলনায় মাথাপিছু আয়ের অবস্থানে পশ্চিমবঙ্গ পিছিয়ে পড়েছে। উন্নয়নের নিরিখে সমপর্যায়ে থাকা রাজ্যগুলির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে যে, বহু সামাজিক ও উন্নয়ন সূচকেও পশ্চিমবঙ্গ পিছিয়ে। নীতি আয়োগ প্রকাশিত সাসটেনেবল ডেভলপমেন্ট গোলস বা সুস্থায়ী উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-র সূচকে ২৭টি রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ১৭তম— ২০১৮ সাল থেকে রাজ্যের সেই অবস্থানে আর কোনও উন্নতি হয়নি। সাম্প্রতিকতম তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রসূতিমৃত্যুর হার, বাল্যবিবাহ এবং অপুষ্টির মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে পশ্চিমবঙ্গ সর্বভারতীয় গড়ের নীচে রয়েছে।
রাজ্যের আর একটি স্থায়ী সমস্যা আঞ্চলিক বৈষম্য। অথচ পশ্চিমবঙ্গে জননীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই বৈষম্যের কথা খুব কমই আলোচনায় আসে। মূলধনি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে রাজ্যের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সংযোগ বেড়েছে। কিন্তু জেলা স্তরের আয় দেখলে স্পষ্ট হয়, জেলাগুলির মধ্যে বৈষম্য এখনও প্রবল। জেলা-ভিত্তিক মাথাপিছু আয়ের যে সর্বশেষ তথ্য পাওয়া যায়, তা খানিক পুরনো; কিন্তু সে পরিসংখ্যান বলছে, মাত্র আটটি জেলা থেকে রাজ্যের ৬০ শতাংশের বেশি জিএসডিপি আসে। এই জেলাগুলি হল (অবিভক্ত) বর্ধমান, নদিয়া, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ২৪ পরগনা, কলকাতা, হাওড়া, হুগলি এবং পূর্ব মেদিনীপুর। সুষম আঞ্চলিক উন্নয়নের জন্য অনুন্নত অঞ্চলগুলিতে লক্ষ্যভিত্তিক সরকারি বিনিয়োগ রাজ্যের বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে উল্লেখযোগ্য ভাবে উন্মুক্ত করতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গ দ্রুত নগরায়ণের দিকেও এগোচ্ছে। ফলে উন্নয়নকে সুস্থায়ী করতে, এবং রাজ্যের বড় শহরগুলিতে অভিবাসনের চাপ সামলাতে নগরোন্নয়ন নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। অনিয়ন্ত্রিত নগর সম্প্রসারণ প্রতিরোধ করা, পরিষেবা সরবরাহের মানোন্নয়ন এবং সুস্থায়ী পরিবেশনীতি গ্রহণ করে শহরগুলিকে জলবায়ু-সহনশীল করে তোলার জন্য দ্রুত নীতিগত পদক্ষেপ দরকার। নগর পরিচালনা ও প্রশাসন, এবং বাসযোগ্যতার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে সুস্থায়ী নগরায়ণের পথে এগোতে হবে।
সব শেষে দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধির প্রশ্নে জাতীয় স্তরে রাজ্যের মাথাপিছু আয়ের ক্রমাবনতির একটি সামগ্রিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। কেন পশ্চিমবঙ্গের আপেক্ষিক অবস্থান কমেছে, এবং তার ফলে রাজ্য সরকারকে কী অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে— তা গভীর ভাবে বিচার করা দরকার। কারণ, এর প্রভাব বহুমাত্রিক; অর্থনীতি থেকে সমাজ— সব ক্ষেত্রেই সেই প্রভাব পড়েছে। দীর্ঘ সময় পশ্চিমবঙ্গের বৃদ্ধির হার জাতীয় বৃদ্ধির গতিপথকে অনুসরণ করলেও, গত তিন দশকের অধিকাংশ বছরেই তা জাতীয় হারের নীচে ছিল। মাথাপিছু আয়ের এই ধারাবাহিক অবনমনই বহু মানুষকে কম দক্ষতার কাজের খোঁজে অন্য রাজ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য করেছে। বৃদ্ধি ও ন্যায়সঙ্গত উন্নয়নের সম্ভাবনাকে মুক্ত করতে যে সব জরুরি সংস্কার প্রয়োজন, পরবর্তী সরকারের নীতির কেন্দ্রে থাকা উচিত সেই কাজই।
ডিস্টিঙ্গুয়িশড প্রফেসর, এনআইপিএফপি, দিল্লি; ভাইস চেয়ারম্যান, ইনস্টিটিউট অব ডেভলপমেন্ট স্টাডিজ়, জয়পুর
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে