সমাজমাধ্যম মতামত প্রকাশের চমৎকার পরিসর। তবে এই মাধ্যমের উত্থানের সঙ্গে বইছে অপরিস্রুত তথ্যের অসীম স্রোত, বেড়ে চলেছে একমুখী তথ্য সরবরাহের আশঙ্কাজনক প্রবণতা। এখানে সেই সব মতামতই আমরা জানতে এবং শুনতে পাই, যা আমাদের নিজস্ব মতের সঙ্গে মেলে। সমাজমাধ্যমের ‘অ্যালগরিদম’ চায়, আমরা যেন সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে বেশি সময় কাটাই। তাই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর অতীত আচরণ এবং আগ্রহে ভিত্তি করে এমন বিষয় দেখাতে থাকে, যা আমাদের পছন্দ হবে, সেই সব তথ্যের সঙ্গে আমরা একমত হব। এই ‘ইকো চেম্বার’-এই আটকে পড়ছেন সকলে। যখন কেউ তাঁর মনের মতো কথা জানছেন, অথবা সমমনস্কদের কথা বার বার শুনছেন, তখন তাঁর মনে বিশ্বাস জন্মায় যে তাঁর মতামতই একমাত্র অভ্রান্ত। ভিন্ন মত পোষণকারী সকলে ভুল। ভিন্ন মত পোষণকারীকে ক্ষতিকর বলেও মনে হয়। এই মনোভাব তৈরির ফলে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার দরজা ক্রমে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ফলে হচ্ছে চূড়ান্ত মেরুকরণ। এই তীব্র মেরুকরণ হয়ে চলেছে রাজনৈতিক মনোভাবে। প্রভাব পড়ছে সামাজিক ভাবনাগুলিতে। এ এমন বিভাজন, মধ্যপন্থী অবস্থানের প্রতি বিশ্বাসই ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়। ভাবনা-চিন্তায় চরমপন্থাকেই সহজ, স্বাভাবিক মনে হয়। অজানতে তৈরি হয় ‘আমরা বনাম ওরা’ মানসিকতা। এ ক্ষেত্রে বিরোধীরা ভিন্নমতাবলম্বী নয়, বরং শত্রু হিসাবে বিবেচিত হন। এই মেরুকরণের আঁচ আমরা কয়েক বছর ধরে পাচ্ছি। রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আবহে তা আরও ভয়াবহ রূপ নেবে বলেই আশঙ্কা।
প্রাক্তন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০১৮-য় বলেছিলেন, “আপনি যদি সব তথ্য ফোনে আসা অ্যালগরিদম থেকে পান এবং সেগুলি শুধু আপনার যে দিকে পক্ষপাত তাকেই জোরদার করে, তা হলে আপনি এক বুদবুদের ভিতরেই বাস করবেন। এই কারণেই আমাদের রাজনীতি এখন এতটা মেরুকৃত।” তবে ওবামা আশা করেছিলেন, সমস্যার সমাধান সম্ভব।
প্রায় আট বছর অতিক্রান্ত। ওবামার আশা বাস্তবায়িত হয়নি। আমরা সমস্যার আরও গভীরে ঢুকে গিয়েছি। বেড়েছে নিজের মত প্রকাশের চিৎকৃত আস্ফালন। অন্যের মতের সঙ্গে মত না মিললে চলছে অসুস্থ ট্রোলিং। ডিজিটাল মেরুকরণ এখন সামাজিক মহামারি।
মানুষ কেন সহজে এই ‘ইকো চেম্বার’ থেকে বার হতে পারে না, মনস্তাত্ত্বিকরা কারণ খুঁজছেন। দেখা গিয়েছে, আমাদের মস্তিষ্ক এমন তথ্য গ্রহণ করতে পছন্দ করে যা আমাদের বিশ্বাসকে সমর্থন করে। মস্তিষ্ককে এ এক ধরনের নিরাপত্তার বোধ দেয় এবং মানসিক চাপ কমায়। মনস্তাত্ত্বিকরা দেখেছেন, যখন কাউকে তার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে তথ্য বা প্রমাণ দেওয়া হয়, তখন সে ভুল স্বীকারের বদলে আরও জেদ নিয়ে পুরনো বিশ্বাসে আটকে থাকতে চায়। তথ্যগুলো তার কাছে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসাবে মনে হয়। বহু ক্ষেত্রে সমাজমাধ্যমে নিজের দল অথবা সমমনস্কদের কাছ থেকে ‘লাইক’, বাহবা পেলে মস্তিষ্কে ডোপামিন, যাকে সুখের হরমোন বলা হয় তার ক্ষরণ বাড়ে। ফলে মানুষ সত্যের চেয়ে দলের আনুগত্যকেই গুরুত্ব দেয়।
গবেষণামতে, পরিস্থিতির সরাসরি বিরোধিতা না-করে প্রশ্ন করা প্রয়োজন। তিনি কেন মনে করেন তাঁর জানা তথ্যটিই ঠিক? মেরুকরণ তখনই ঘটে যখন আমরা বিষয়গুলিকে কেবল ‘সাদা’ বা ‘কালো’ হিসাবে দেখি। কিন্তু আরও রং থাকতে পারে। আলোচনায় আসুন। এবং বোঝান। বিরোধের অর্থ ‘রণং দেহি’ নয়। মানুষের সাধারণ প্রবণতা নিজের বিশ্বাস এবং মূল্যবোধে ভর করে অন্যকে বিচার করা। কিন্তু অন্যকে বোঝাতে গেলে তাঁর বিশ্বাস, মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিলে অপর প্রান্ত থেকে কথা শোনার সম্ভাবনা বাড়ে। তথ্য গ্রহণের আগে তথ্যের উৎস কী এবং সেই উৎসের কোনও পক্ষপাতিত্ব আছে কি না— যাচাই প্রয়োজন। তথ্য সত্যি কি না জানতে, অন্যান্য বিশ্বস্ত উৎসও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি অ্যালগরিদমকে চ্যালেঞ্জ-এর সময় এসেছে। যা লাইক করি, অ্যালগরিদম আমাদের ঠিক তাই দেখায়। মাঝে মাঝে অন্য বিষয়ে খোঁজ চালিয়ে এই চক্রকে কি ভেঙে দেওয়া যায় না? তা করতে গেলে শুধুই রাজনৈতিক নয়, বিভিন্ন ধরনের বিষয়েই আলোচনা প্রয়োজন। অর্থাৎ, ভাবনায় বৈচিত্র চাই।
প্রয়োজন ব্যক্তিগত স্তরে যোগাযোগ বাড়ানোরও। মোবাইল বা কম্পিউটার স্ক্রিনের মানুষটিকে নিছক ‘প্রোফাইল’-এর বদলে রক্ত-মাংসের মানুষ ভাবলে এবং বাস্তব জীবনে দেখা করতে পারলে পারস্পরিক ঘৃণা প্রশমিত হবে। ভার্চুয়ালি দুর্ব্যবহার করতে পারলেও সামনাসামনি ট্রোলিং-এর ক্ষেত্রে মানুষ দু’বার ভাবে। সপ্তাহে অন্তত এক দিন সমাজমাধ্যম থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকার কথাও বলছেন মনস্তাত্ত্বিকরা। এই ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ মস্তিষ্ককে অন্য রকম মুক্ত চিন্তাতেও সাহায্য করে। প্রয়োজন ছায়াবিশ্বের এই বৈরী মনোভাব থেকে বেরোনোর জন্য স্থায়ী পদক্ষেপ। স্কুল পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল সাক্ষরতার আলোচনা প্রয়োজন। প্রয়োজন সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনাকে গ্রহণের মানসিকতা তৈরি করা।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে