মালদহ থেকে আলিপুরদুয়ার— এই ভৌগোলিক এলাকা উত্তরবঙ্গ, যার মধ্যে কোচবিহার জেলাটি মধ্যমণি বললে ভুল হবে না। সেই কোচবিহারে মোট জনসংখ্যার মধ্যে রাজবংশীদের সংখ্যাটা নেহাত কম নয়। জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ এবং দার্জিলিং জেলাতেও তাঁদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। তাই নির্বাচনী রাজনীতিতে উত্তরবঙ্গের কথা উঠলেই রাজবংশীদের প্রসঙ্গটি সংবাদ শিরোনামে এসে যায়।
নির্বাচনী রাজনীতিতে সাধারণ রাজবংশীদের অংশগ্রহণের জায়গাটি বামপন্থীদের কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। তার অর্থ এই নয় যে, কংগ্রেসি রাজনীতিতে রাজবংশীদের অংশ ছিল না। কংগ্রেসি রাজনীতি মূলত জোতদারদের মধ্যে সীমিত ছিল। সেখানে সম্পন্ন কৃষক গিরি বা দেওয়ানি নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি বাড়ির যেমন কর্তা, তেমনই টারির (পাড়া)। প্রজাদের যাবতীয় বিষয় তিনি দেখাশোনা করতেন। তাই কোনও দেওয়ানি যদি কংগ্রেসকে সমর্থন করেন, তা হলে প্রজারাও তা পালন করতেন। প্রজাদের বিশ্বাস ছিল দেওয়ানি যা করবেন তা ভালই করবেন।
অঞ্চলভেদে এই প্রথার কিছুটা বৈচিত্র ছিল— যা বামপন্থীরা তাঁদের আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন। শোষণ বা বঞ্চনার ন্যারেটিভ এবং তার সঙ্গে অন্যায় প্রতিকার করার জন্য জনমত সংগঠিত করার ক্ষেত্রে প্রথম দিকের বাম নেতাদের আত্মত্যাগ এমন এক পরিসর তৈরি করে, যা কৃষক সমাজের মনকে ছুঁয়ে যায়। তার জন্যই তেভাগা আন্দোলনের মতো একটা সাড়াজাগানো কৃষক আন্দোলন তৈরি হয়। মূলত কৃষিজীবী রাজবংশীদের সঙ্গে কিছু স্থানীয় মুসলিমও কৃষকদের জোট তেভাগা আন্দোলনকে সাফল্য এনে দিয়েছিল। বামপন্থীদের নির্বাচনের পরিসরে জায়গা করে দিতেও উত্তরবঙ্গের মানুষ প্রথম পদক্ষেপ করেছিলেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে দিনাজপুর ও দার্জিলিং থেকে দু’জন বামপন্থী নেতা বিধায়ক হয়েছিলেন। দিনাজপুরে প্রার্থী ছিলেন রাজবংশী ঘরের ছেলে। সে দিক থেকে দেখলে বাম উত্থানে রাজবংশীদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। তবে ভুললে চলবে না, বামপন্থী রাজনৈতিক চেতনা প্রসারেরও চার দশক পূর্বে পঞ্চানন বর্মা রাজবংশীদের মধ্যে জাতি চেতনার আন্দোলন শুরু করেছিলেন। এমনকি তিনি কৃষকদের ঋণ মকুব থেকে অন্যান্য বিষয় নিয়েও সচেতন ছিলেন।
২০১১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়। বাম রাজত্বের বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের অপারদর্শিতা ও দলীয় কোন্দল থেকেই ধীরে ধীরে বিরোধী দলগুলির প্রস্তাবনা সাধারণ মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। তবে বিরোধী হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেস যত সফল, শাসক হিসেবে তা নয়, তাই দলীয় কোন্দল থেকেই গেল, এবং পঞ্চায়েত প্রধান থেকে শুরু করে দলনেতাদের জনসংযোগের অভাব এবং আপত্তিকর আচরণ মানুষদের মনে ক্রমেই বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিল।
২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির জনজোয়ার উত্তরবঙ্গের মাটিতে এনে দিয়েছিল নতুন স্পন্দন। দীর্ঘ দিনের আলাদা রাজ্যের দাবি একাকার হয়ে গেল রামরাজ্যের কাহিনির সঙ্গে। রাজবংশীরা কৃষিজীবী ও ধর্মভীরু গোষ্ঠী, হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মই রাজবংশী মনে জায়গা করে নিয়েছে। প্রত্যেক রাজবংশী বাড়ির উঠোনে তুলসী গাছের পূজা করেন, আবার তার পাশেই পাথরের শিবলিঙ্গ বা সত্যপিরের ঢিপি, কিংবা হনুমানের প্রতীকযুক্ত পতাকা রাখেন। এ অঞ্চলের প্রিয় বিনোদন যাত্রাগানে রামকাহিনির বিশেষ আকর্ষণ ছিল। তবে রামের কোনও মন্দির ছিল না উত্তরবঙ্গে, বরং শিব, মাসান, সত্যপির, মনসা, সন্ন্যাসী, ভান্ডানির পুজো করেন রাজবংশীরা।
উত্তরবঙ্গ বঞ্চিত, শোষিত— এই বাক্যটি এখন প্রায় প্রবাদে পরিণত হয়েছে। উঠেছে আলাদা রাজ্যের দাবি। প্রসঙ্গত, উত্তরবঙ্গের বিজেপি সেই দাবি পূরণের আশ্বাস ও কলকাতাকেন্দ্রিক ‘শোষণ’ থেকে মুক্ত হওয়ার আশা দিলেও দক্ষিণবঙ্গের বিজেপি নেতারা কিন্তু কখনও তা সমর্থন করেননি।
২০২৬ সালের কোচবিহারে তিনটি বিধানসভায় এক দিকে অনন্ত রায় (মহারাজ) সমর্থিত প্রার্থী শীতলখুচি বিধানসভায় টিএমসি-র মনোনীত প্রার্থী হন। অন্য দিকে, এ বার বংশীবদন বর্মণ তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিলে বিজেপি বংশীবদনকে দু’টি টিকিট দেয়। এই প্রথম কোচবিহারে রাজবংশী নেতারা মূলস্রোতের রাজনীতির সঙ্গে দরকষাকষি করে ভোটে দাঁড়ালেন। অনন্ত মহারাজ এবং বংশীবদন বর্মণের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ: ভোটে জিততে পারলে দরকষাকষির গুরুত্ব বাড়বে, হারলে জনসমর্থনের প্রশ্নটি সামনে চলে আসবে, এবং তাঁদের স্বতন্ত্র রাজনীতির জায়গাটি ফিকে হয়ে যেতে পারে।
এখন সাম্প্রদায়িক প্রচারের চোটে অর্থনৈতিক প্রশ্ন সে ভাবে উঠে আসছে না। অথচ লক্ষণীয়, এই অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ইতিহাস নেই বললেই চলে, এমনকি দেশভাগের সময়েও। আজকের আবহে এই অঞ্চলে জাতি রাজনীতি প্রসার কেমন হতে চলেছে, তা বোঝা যাবে সামনের দিনগুলিতে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে