বিজেপি দল ও সরকারে ক্ষমতার আরও কেন্দ্রীকরণের সম্ভাবনা
BJP

নতুন নেতার চমক

বাজপেয়ী, আডবাণী থেকে রাজনাথ, গডকড়ী, শাহ, নড্ডা— বিজেপির সভাপতি সকলেই আরএসএস বা তার কোনও সংগঠন থেকে রাজনীতি শুরু করেছিলেন। সেটাই ছিল বিজেপি সভাপতি হওয়ার ‘অলিখিত’ যোগ্যতামান।

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৩১
Share:

অপ্রত্যাশিত: বিজেপির নতুন কার্যনির্বাহী সভাপতি নিতিন নবীন, পটনা, ২৩ ডিসেম্বর। ছবি: পিটিআই।

নতুন বছরের প্রথম দিন একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক। সদ্য বিদায় নেওয়া বছরে দেশের রাজনীতিতে সব থেকে চমকপ্রদ এবং অপ্রত্যাশিত ঘটনা কী?বিহারের গদিতে নীতীশ কুমারের প্রত্যাবর্তন বা দিল্লিতে অরবিন্দ কেজরীওয়ালের হার নয়। চমকপ্রদ হলেও তা একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল না। সেই তুলনায় জগদীপ ধনখড়ের উপরাষ্ট্রপতি পদ থেকে আচমকা ইস্তফা অনেক চমকপ্রদ ও অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছিল। গত ১৪ ডিসেম্বরের রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় ‘কোনও এক’ নিতিন নবীনের হঠাৎ বিজেপির জাতীয় কার্যনির্বাহী সভাপতি পদে নিয়োগ বিগত বছরের ‘সব থেকে বড় রাজনৈতিক চমক’ হয়ে উঠল। একই সঙ্গে প্রমাণ হল, বিজেপিতে ক্রমশ কংগ্রেস, এমনকি তৃণমূল কংগ্রেসের সংস্কৃতি জাঁকিয়ে বসছে। ইন্দিরা গান্ধীর আমল থেকে কংগ্রেসে যে হাই কমান্ড সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল, বিজেপিতে এখন সেটাই দস্তুর। তৃণমূল কংগ্রেসের মতোই বিজেপিতে এখন একটাই পদ। অথবা, সব পদেই এক জন ব্যক্তি।

নিতিন নবীন বিজেপির কার্যনির্বাহী সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার আগে বিহারের এই বিধায়ককে পাশের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সিংহভাগ বিজেপি নেতাই চিনতেন না। অথচ নতুন বছরের গোড়াতে তিনিই বিজেপির পরবর্তী জাতীয় সভাপতি হতে চলেছেন। অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আডবাণী, মুরলী মনোহর জোশী, কুশাভাউ ঠাকরে থেকে রাজনাথ সিংহ, নিতিন গডকড়ী, অমিত শাহদের উত্তরসূরি। বিজেপি পরবর্তী প্রজন্মের হাতে দলের নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার বড়াই করছে। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে নিতিন নবীন বিজেপির জাতীয় সভাপতি হলে নতুন রেকর্ড হবে। এত কম বয়সে এর আগে কেউ বিজেপির সভাপতি হননি। বাস্তব হল, এত অনভিজ্ঞ নেতাও আগে বিজেপি সভাপতি হননি। যাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছে মাত্র কুড়ি বছর আগে। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল, নবীন বিজেপির প্রথম সভাপতি, যিনি আরএসএস-এর আঁতুড়ঘর থেকে উঠে আসেননি। সঙ্ঘ বা তার ছাত্র সংগঠন এবিভিপি-র সঙ্গে তাঁর কোনও যোগাযোগ ছিল না। বিজেপির ওয়েবসাইটে নবীনের পরিচিতিতেও এর কোনও উল্লেখ নেই।

এইখানেই আসল চমক। বাজপেয়ী, আডবাণী থেকে রাজনাথ, গডকড়ী, শাহ, নড্ডা— বিজেপির সভাপতি সকলেই আরএসএস বা তার কোনও সংগঠন থেকে রাজনীতি শুরু করেছিলেন। সেটাই ছিল বিজেপি সভাপতি হওয়ার ‘অলিখিত’ যোগ্যতামান। মোদী-শাহ বিজেপির শীর্ষপদে নবীন-বরণ করে সেই নিয়মটাই তুলে দিলেন।

তা হলে নিতিন নবীন কী করে সবাইকে পিছনে ফেলে সভাপতির দৌড়ে এগিয়ে গেলেন?

নবীনের নাম ঘোষণার পর তাঁর সম্পর্কে জানতে গুগল হাতড়েছে অনেকেই। বিজেপির মতে, নবীন সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য পরিচিত। সিকিম ও ছত্তীসগঢ়ের দায়িত্বে থেকে তিনি সাফল্য পেয়েছেন। সত্যিই তা-ই? নবীনকে সিকিমের ভারপ্রাপ্ত নেতা করা হয় ২০১৯-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে। বিজেপি সিকিমের বিধানসভায় সে বার একটি আসনও জিততে পারেনি। মাত্র ১.৬২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। ভোটের পর ক্ষমতা হারানো সিকিম ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের সিংহভাগ বিধায়ক বিজেপিতে যোগ দেন। কোনও আসন না জিতেও বিজেপি সিকিমে প্রধান বিরোধী দল হয়ে যায়। বিজেপি তখন এর কৃতিত্ব উত্তর-পূর্বের ভারপ্রাপ্ত নেতা রাম মাধবকে দিয়েছিল। এখন সেই ‘সাফল্য’ নবীনের বায়োডেটায় যোগ হয়েছে।

নবীন এর পর ২০২১ সালে ছত্তীসগঢ়ের সহ-ভারপ্রাপ্ত নেতা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। ডি পুরন্দেশ্বরী ছিলেন মূল দায়িত্বে। ছত্তীসগঢ়ের ২০২৩-এর বিধানসভা ভোটের চার মাস আগে বিজেপির পোড়খাওয়া নেতা ওম মাথুরকে নির্বাচনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিজেপি অপ্রত্যাশিত ভাবে কংগ্রেসকে হারিয়ে ক্ষমতায় ফেরে। অসম্ভবকে সম্ভব করার কৃতিত্ব বিজেপি সে সময় মাথুরকেই দিয়েছিল। নবীনের সাংগঠনিক দক্ষতার কথা কেউ শোনেনি।

এর পাশাপাশি বিজেপি সভাপতির দৌড়ে থাকা দুই তরুণ নেতা ধর্মেন্দ্র প্রধান ও ভূপেন্দর যাদবের সাংগঠনিক ট্র্যাকরেকর্ড দেখা যাক। ধর্মেন্দ্র সম্প্রতি বিহারে নির্বাচনের দায়িত্বে থেকে এনডিএ-র জয় নিশ্চিত করেছেন। হরিয়ানায় বিজেপিকে হারা ম্যাচ জিতিয়েছেন। উত্তরপ্রদেশের ভোট সামলে সাফল্য পেয়েছেন। নিজের রাজ্য ওড়িশাতে বিজেপিকে প্রথম বার ক্ষমতায় বসিয়েছেন। ভূপেন্দর যাদব গুজরাত-সহ একাধিক রাজ্যে নির্বাচন সামলেছেন। গত বছর মহারাষ্ট্রে বিজেপিকে ক্ষমতায় এনে ভেল্কি দেখিয়েছেন। এখন তিনি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিধানসভা ভোট পরিচালনার দায়িত্বে। বিহারের মন্ত্রী ছিলেন বলে বিজেপি তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরছে। কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক সামলানোর সুবাদে ধর্মেন্দ্র, ভূপেন্দর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাতেও এগিয়ে।

তা হলে নবীনের সাফল্যের রহস্য কোথায়? রাজনীতিতে পা দেওয়ার পর নবীন প্রথম প্রচারের আলোতে আসেন ২০১০ সালে পটনায় বিজেপির জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকের সময়। গোটা পটনায় তিনি তদানীন্তন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে বিহারের বন্যায় অর্থসাহায্যের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে পোস্টার লাগিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার এত চটেছিলেন যে, পটনায় উপস্থিত বিজেপির জাতীয় নেতাদের নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েও বাতিল করে দেন। নবীন তখনই নরেন্দ্র মোদীর প্রতি আনুগত্য প্রমাণ করে ফেলেছিলেন। মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে অমিত শাহ বিজেপি সভাপতি হন। বিহারের বাইরে নবীনের এই এক জন ব্যক্তির সঙ্গেই বরাবর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। অক্টোবরে বিহারে প্রচারে গিয়ে অমিত শাহ ছট পুজোয় নবীনের বাড়িতেই গিয়েছিলেন। তখন অবশ্য কেউই আন্দাজ করতে পারেননি যে, নবীনের ভাগ্যে বিজেপির সভাপতির শিকে ছিঁড়তে চলেছে। এখানেই নবীনের সাফল্যের তিনটি চাবিকাঠি। এক, রাজনীতিতে এসেই নরেন্দ্র মোদীর প্রতি আনুগত্য প্রমাণ। দুই, অমিত শাহের পছন্দের তালিকায় নাম। তিন, আরএসএস-এর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক না থাকা।

নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই বিজেপি সভাপতির পদের গুরুত্ব কমে গিয়েছিল। মোদীই তখন থেকে বিজেপির ‘সুপার’ সভাপতি। তাঁর বিশ্বস্ত অমিত শাহ বিজেপির সভাপতি হয়ে গোটা সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নেন। তার পরে নড্ডা সভাপতি হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতা সেই মোদী-শাহের হাতেই কুক্ষিগত ছিল। ঠিক যেমন ইন্দিরা গান্ধী বা রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন কংগ্রেসের সংগঠন তাঁদের কুক্ষিগত ছিল। ইন্দিরা, রাজীব প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি কংগ্রেসের সভাপতি পদও নিজের হাতে রেখেছিলেন। নরেন্দ্র মোদী বিজেপির সভাপতি না হলেও তাঁর হাতেই নিয়ন্ত্রণ। সমস্ত মন্ত্রকও আসলে তিনিই।

বিজেপি অভিযোগ করে, ইউপিএ জমানায় মনমোহন সিংহ প্রধানমন্ত্রী হলেও কংগ্রেসের সভানেত্রী হিসেবে সনিয়া গান্ধীর হাতেই সরকারের চাবিকাঠি ছিল। এখন উল্টো। বিজেপি সভাপতি যে-ই হোন না কেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাতেই দলের চাবিকাঠি। নড্ডার পরে ভূপেন্দর যাদব, ধর্মেন্দ্র প্রধান বিজেপি সভাপতি হলে তা-ও তাঁদের নিজের মতো কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু মাত্র কুড়ি বছরের বিধায়ক নিতিন নবীনকে যে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মোদী-শাহের মুখাপেক্ষী হয়েই থাকতে হবে। আর সেই কারণেই সবাইকে বাদ দিয়ে নবীন সভাপতি পদে।

আরএসএস স্বাভাবিক ভাবেই এর পরিবর্তন চেয়েছিল। মোদী-শাহের জমানায় বিজেপি সভাপতি পদে নিজের পছন্দের লোক বসানো যে মুশকিল, তা আরএসএস-ও জানত। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির আসন কমে যাওয়ায় আরএসএস দর কষাকষির সুযোগ পেয়েছিল। প্রমাণ করা গিয়েছিল, আরএসএস নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে বিজেপির বিপদ। সভাপতি পদে জে পি নড্ডার মেয়াদ ২০২৩ সালে শেষ হয়। তাঁর মেয়াদ ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। গত দেড় বছর ধরে বিজেপি সভাপতি নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। কারণ মোদী ও শাহের সঙ্গে আরএসএসের স্নায়ুর লড়াই চলেছে। মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, বিহারের ভোট জয় ও ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সাফল্যে নতুন করে বলীয়ান মোদীর কাছে শেষ পর্যন্ত আরএসএস-কে হার মানতে হয়েছে। সভাপতির পদে আরএসএসের নামগন্ধহীন নবীন।

মোদী ক্ষমতায় এসে লালকৃষ্ণ আডবাণী, মুরলী মনোহর জোশী, যশবন্ত সিন্‌হার মতো নেতাকে বানপ্রস্থে পাঠিয়েছিলেন। গত কয়েক বছরে রমন সিংহ, বসুন্ধরা রাজে, শিবরাজ সিংহ চৌহানদের কার্যত পদোন্নতির নামে ক্ষমতাহীন মন্ত্রী করা হয়েছে। আগামী দিনে নিতিন নবীনকে সামনে রেখে তরুণ প্রজন্মের হাতে নেতৃত্বের ধুয়া তুলে আরও অনেককে সরিয়ে দল ও সরকারে ক্ষমতার আরও কেন্দ্রীকরণ হবে।

দিগ্বিজয় সিংহ বলেছেন, কংগ্রেসে বিজেপির মতো সংগঠন দরকার। বাস্তব হল, বিজেপি নিজেই এখন কংগ্রেসের সংগঠনকে অনুকরণ করছে। তার খেসারত কবে দিতে হয়, সেটাই এখন দেখার।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন