সুন্দরবনের দেউলবাড়ির বাসিন্দা আবুরালি মোল্লা মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের পেটে গিয়েছেন। আবুরালির সঙ্গীরা চোখেরসামনে দেখেছেন, নৌকা থেকে বাঘ তাঁকে তুলে নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে গিয়েছে। কিন্তু প্রমাণ কই? একটা কাগজ জোগাড় করার জন্য আবুরালির স্ত্রী মহিমা মোল্লা আজও নানা সরকারি দফতরে ধর্না দিচ্ছেন। কাগজ দিতে না পারায় তিনি জীবন বিমার টাকা, সরকারি ক্ষতিপূরণ পাননি, বিধবা ভাতার আবেদনও করতে পারছেন না। এ কেবল মহিমার দুর্ভাগ্য নয়, সুন্দরবনের অনেক ব্যাঘ্র-বিধবা তাঁদের আইনি প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পঞ্চায়েত, বন দফতর আর পুলিশের সহযোগিতার অভাবে।
২০২৪-এর ৬ জুলাই, বন দফতরের কাছ থেকে বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) নিয়ে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিলেন আবুরালি। ছিলেন আরও পাঁচ মৎস্যজীবী। ১১ জুলাই তাঁদের নৌকায় বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়ে। আবুরালির ঘাড় কামড়ে তুলে জঙ্গলের ভিতরে নিয়ে যায়। খোঁজাখুঁজি করেও সঙ্গীরা আবুরালির সন্ধান না পেয়ে গ্রামে ফিরে আসেন। মহিমা ১২ জুলাই থানায় ডায়েরি করেন। গ্রামের লোকেদের পীড়াপীড়িতে ১৮ জুলাই বন দফতরের কর্মীরা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে দেহ খুঁজতে যান। কিন্তু ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁরা কিছুতেই নৌকা থেকে নেমে জঙ্গলে ঢুকতে রাজি হন না। যদি তাঁদেরও বাঘের মুখে পড়তে হয়? দেহ পাওয়া গেল না, রিপোর্টও লেখা হল না। রাজ্য সরকারের বিজ্ঞপ্তি (২০২১) অনুযায়ী, বাঘের আক্রমণে মারা গেলে ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং পরিবারের এক জনের ফরেস্ট গার্ডের অস্থায়ী কাজ পাওয়ার কথা। আবুরালি বিএলসি নিয়ে গিয়েছিলেন, তাই তাঁর উত্তরাধিকারী হিসাবে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে জীবন বিমা বাবদ দু’লক্ষ টাকাও পাওয়ার কথা মহিমার। কিছুই পাননি। তিন শিশু-সন্তান, বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে আতান্তরে পড়েছেন।
বাঘের আক্রমণে মৃতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নিয়ম অনেক দিনের। কিন্তু পঞ্চায়েত নেতা, স্থানীয় রাজনৈতিক দল এবং বন দফতর মিলে একটা অদ্ভুত চক্র ছিল সুন্দরবনে। মাছ-কাঁকড়া ধরতে গিয়ে কেউ বাঘের আক্রমণে মারা গেলে বা আহত হলেই বন দফতর বলত ওরা ‘কোর’ এলাকায় ঢুকেছিল, তাই সরকারের কিছু করার নেই। মৃতের সঙ্গী মৎস্যজীবী, নৌকার মালিককে পঞ্চায়েত ভয় দেখাত, তাঁদের সবার নামে মামলা হবে, পুলিশে ধরবে। ফলে তাঁরা চুপ করে যেতেন। বাঘের আক্রমণে মৃত্যুর উল্লেখ না করে, পঞ্চায়েত অন্য কোনও কারণ দেখিয়ে ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে বডি সৎকার করে দিত। এই খেলা চলছিল সেই বাম আমল থেকেই।
২০২৩ সালে মানবাধিকার কর্মীদের উদ্যোগে কলকাতা হাই কোর্টে বাঘের আক্রমণে মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণের দাবিতে একটি মামলা হয়। অত্যন্ত মানবিক একটি রায়ে ‘কোর এরিয়া’ আর ‘বাফার এরিয়া’-র ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নাকচ করেন বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, মৎস্যজীবী যে এলাকাতেই ঢুকুন, বাঘের আক্রমণে মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণ দিতেই হবে। ‘কোর’ এলাকায় ঢুকলেও দিতে হবে। এমনকি, বিএলসি না থাকলেও মৃত বা আহতদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
তাঁর এই রায়ে এবং মানবাধিকার কর্মীদের আপ্রাণ চেষ্টায় দুষ্টচক্রটি ভাঙে। এর পর বহু মামলা হয়। গত দু’বছরে হাই কোর্টে গোটা দশেক আবেদনের মীমাংসা হয়েছে, সব আবেদনকারী ৫ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। এর পরেও বন দফতর বা পঞ্চায়েতের তরফে মৃত বা আক্রান্তদের পাশে দাঁড়ানো, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ দেখা যায়নি। বছরে ২৫-৩০ জন মানুষ বাঘের আক্রমণে নিহত বা গুরুতর আহত হন, এঁদের ক’জনই বা আদালতে যেতে পারেন? সরকারি খাতায় সাত-আটটির বেশি ঘটনা দেখানো হয় না। তাতে বন দফতরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ফলে কয়েক হাজার ব্যাঘ্র-বিধবা সরকারের কাছ থেকে কোনও সাহায্য পাননি। আহতদের ২ লক্ষ টাকা এবং নিখরচায় চিকিৎসা পাওয়ার কথা, তা-ও পাচ্ছেন না। এমনকি ময়না তদন্ত করতেও নিয়ে যেতে হয় পরিবারের খরচে।
এই প্রেক্ষাপটে আবুরালি মোল্লার মামলাটি দেখা দরকার। মহিমা মোল্লা হাই কোর্টে ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করলে বিচারপতি স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন তুলেছেন, আবুরালি যে মৃত, তা কী করে মেনে নেবে আদালত? কোনও একটা সরকারি দফতরের সার্টিফিকেট তো লাগবে। অসহায় ভাবে মহিমার আইনজীবী বলেন, বন দফতর এবং পুলিশ যদি বাঘের ভয়ে জঙ্গলে না নামে, যদি দেহাবশেষ বা জামাকাপড় খুঁজে না আনে, আবার প্রত্যক্ষদর্শী সঙ্গীদের কথায় ভরসাও না করে, তা হলে মৎস্যজীবীর স্ত্রী কী করতে পারেন? কোথা থেকে ডেথ সার্টিফিকেট বা পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট তিনি জোগাড় করবেন? সহানুভূতিশীল বিচারপতি আইনজীবীকে আরও সময় দিয়েছেন, কোনও একটা সরকারি কাগজ মৃত্যুর প্রমাণ হিসাবে দাখিল করার জন্য। না হলে সব বুঝেও আদালত অসহায়।
অতএব কাগজের সন্ধানে ফের ঘুরছেন মহিমা মোল্লা— পঞ্চায়েত অফিস, বিডিও অফিস, ডিএম অফিস, বন দফতর, সুন্দরবন টাইগার রিজ়ার্ভ-এর দফতরে। আর আশঙ্কা গাঢ় হচ্ছে, তবে কি বাঘের আক্রমণে মৃত-আহতদের প্রাপ্য না-দেওয়ার নতুন কৌশল মৃত্যুর প্রমাণপত্র না দেওয়া? মৃতের মর্যাদাটুকুও কি জুটবে না আবুরালিদের?
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে