Architectures of India

ঐতিহ্য রক্ষায় সিঁদুরে মেঘ

এই নীতিগত পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়া। বহির্বিশ্বে এমন বার্তা যেতে পারে, ভারত সরকার নিজ জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত স্থাপত্য-ঐতিহ্যগুলি রক্ষায় অক্ষম। অনেকে এটাকে সরকারের দায়িত্ব থেকে ‘সরে আসা’র চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

অমিতাভ পুরকায়স্থ

শেষ আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:১৮
Share:

সম্প্রতি ভারতে ঐতিহাসিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য বা ‘হেরিটেজ মনুমেন্ট’ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) মডেল গ্রহণের সিদ্ধান্তে দেশের সাংস্কৃতিক শাসনক্ষেত্র এক বড় পরিবর্তনের মুখে। এ-যাবৎ চালু ‘অ্যাডপ্ট আ হেরিটেজ’ নীতির আওতায় পর্যটকদের সাধারণ সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার গণ্ডি পেরিয়ে এখন বেসরকারি সংস্থাগুলো সরাসরি মূল সংস্কার বা প্রত্নতাত্ত্বিক কাজের দায়িত্ব পাচ্ছে। যাঁরা এর পক্ষে তাঁরা বলছেন, আর্কিয়োলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই)-র মতো সংস্থার সীমাবদ্ধতা দূর করতে এটি সাহায্য করবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, এই পদক্ষেপ দেশের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে।

এই নীতিগত পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়া। বহির্বিশ্বে এমন বার্তা যেতে পারে, ভারত সরকার নিজ জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত স্থাপত্য-ঐতিহ্যগুলি রক্ষায় অক্ষম। অনেকে এটাকে সরকারের দায়িত্ব থেকে ‘সরে আসা’র চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। এএসআই-এর মতো সংস্থার ক্ষমতা ও সামর্থ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সমালোচকদের মতে, মূল সংস্কারের কাজ বেসরকারি হাতে তুলে দিয়ে সরকার আসলে জনস্বার্থের দায়বদ্ধতা অন্যের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। এতে মানুষের মনে সন্দেহের দানা বাঁধতে পারে, সরকার আদৌ দীর্ঘমেয়াদে এই সম্পদগুলি জনসম্পদ হিসেবে রক্ষা করবে তো? না কি এগুলো স্রেফ কর্পোরেট সম্পদে পরিণত হবে?

আর এক আশঙ্কা, স্থাপত্যের ঐতিহাসিক রূপ বজায় রাখার চেয়ে তার বাহ্যিক সৌন্দর্য ও চাকচিক্যে জোর দেওয়া। বেসরকারি সংস্থাগুলো স্বাভাবিক ভাবেই লাভ ও ব্র্যান্ডিং-এর কথা ভাববে। তারা হয়তো পর্যটক টানতে এক ধরনের ‘কসমেটিক’ সংস্কার করবে, তাতে ইতিহাসের আসল রূপ হারিয়ে গিয়ে একটা পালিশ করা ঝকঝকে নকল সংস্করণ সামনে আসতে পারে। লখনউয়ের রুমি দরজা (ছবি) এএসআই সংস্কার করলেও সে ক্ষেত্রে দেখা যায়, আসল লাখৌরি ইট বা চুন-সুরকির বদলে আধুনিক উপাদান ব্যবহারে স্থাপত্যটি আরও দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছিল। পিপিপি মডেলে কাজ দ্রুত শেষ করে দেখানোর বাড়তি চাপ থাকে, যা এ ধরনের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

ঐতিহাসিক স্থাপত্যের মূল অংশ সংস্কারের জন্য প্রত্নতত্ত্ব ও মেটিরিয়াল সায়েন্সে দক্ষতার প্রয়োজন হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে যা সাধারণ বেসরকারি সংস্থার থাকে না। ভুল পদ্ধতি ব্যবহারে সংবেদনশীল কাঠামো, সূক্ষ্ম কারুকাজের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। ইতিহাসবিকৃতির ভয়ও থেকে যায়, বিশেষত আজ যখন শাসকের রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইতিহাস বদলে ফেলার ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। উপরন্তু ‘স্পনসর’দের নিজস্ব ব্র্যান্ডিংকে জায়গা দিতে গিয়ে সংস্কারকাজে ঐতিহাসিক তথ্যের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ঐতিহ্যশালী ইমারত সংরক্ষণে বিশেষ নৈতিক বোধ মেনে চলতে হয় (যেমন ২০১৪-র জাতীয় সংরক্ষণ নীতি)। বেসরকারি সংস্থার ক্ষেত্রে তা সর্বদা নিশ্চিত করা যাবে, সেই নিশ্চয়তা কোথায়! কাগজে-কলমে নিয়ম যত কড়া-ই হোক, বাস্তবে কাজ কী ভাবে হয় তা অজানা নয়। শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যবসায়ী মহলের আঁতাঁতের ফলে জাতীয় সম্পদের অবাধ অপব্যবহার আমরা আগেও দেখেছি। তার উপর সরকারি প্রকল্পের তত্ত্বাবধান ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা চিরদিনই বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো। নতুন ঘোষণায় হেরিটেজ-প্রেমীরা সিঁদুরে মেঘ দেখছেন।

বিদেশের মাটিতে এ-হেন মডেলের উদাহরণ থাকলেও, ভারতের সঙ্গে তাদের অনেক তফাত। জার্মানি যেমন তাদের হেরিটেজকে শহরের সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে, সেখানে স্থানীয় প্রশাসনের বড় ভূমিকা থাকে। আবার ব্রিটেনে চার্চেস কনজ়ার্ভেশন ট্রাস্ট-এর মতো স্বাধীন সংস্থা সরকারি অনুদান ও লটারি ফান্ডের সাহায্যে কাজ করে, জনগণের প্রতি তারা সরাসরি দায়বদ্ধ। কিন্তু ভারতে এই কাজ মূলত সিএসআর তথা কর্পোরেট তহবিলের উপর বেশি নির্ভরশীল, যা এই সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণের জায়গা অনেকটাই দুর্বল করে দেয়।

এই ধরনের তহবিলের সাহায্যে উন্নয়নমূলক কাজে কোনও মতে পরিকাঠামো খাড়া করে সংস্থার দৃশ্যমানতা বৃদ্ধির দিকেই নজর থাকে, সচেতনতা প্রচার ও শিক্ষামূলক কাজে বাজেট থাকে না। আজকের দিনে একটি ঐতিহ্যশালী ইমারতের সঙ্গে দর্শককে যথার্থ ভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কাজ শুধু চারটে বোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সেখানেও কর্পোরেট সদিচ্ছা কতটা থাকবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। সঙ্গে মুনাফামুখী ব্যবস্থায় দর্শনী বা প্রবেশমূল্য বেড়ে গিয়ে ঐতিহাসিক সম্পদ ও পর্যটন ব্যবস্থা কেবল উচ্চবিত্তদের জন্য সীমিত হয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। পিপিপি মডেল হয়তো দ্রুত সংস্কার ও পর্যাপ্ত অর্থায়নের পথ তৈরি করে, তবুও অমূল্য ঐতিহাসিক নিদর্শন নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি এখানে অমূলক নয়। কড়া ও স্বচ্ছ অডিট ব্যবস্থা ছাড়া, বাণিজ্যিক লাভের তুলনায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণের উপর আপসহীন নজর না-দিলে, যে স্থাপত্য আমরা বাঁচাতে চাইছি, তাদের অস্তিত্বসঙ্কটই গভীর হবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন