চাই দৃঢ় রাজনৈতিক বিরোধী, বিকল্প জাতীয়তার সঙ্কল্প
Republic

দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের ছায়া

আমাদের এই গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের যেটুকু বাকি আছে তার রক্ষায় দরকার এমন এক কার্যকর রাজনৈতিক বিরোধিতা, মতাদর্শগত ভাবে যা একনিষ্ঠ।

সুমন্ত্র বসু

শেষ আপডেট: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩০
Share:

একটা ধারণা হিসেবেই যদি ভাবি, কিংবা রাষ্ট্রের একটা প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা হিসেবেও— ‘প্রজাতন্ত্র’-এর মধ্যে দু’টি নীতির প্রতিষ্ঠা রয়েছে: জনমান্য সার্বভৌমত্ব (পপুলার সভরিনটি) ও অবিভিন্ন নাগরিক দিয়ে গড়া রাজনৈতিক সম্প্রদায়।

আধুনিক কালে প্রজাতন্ত্রের তত্ত্ব বা মতবাদের উৎস ফরাসি বিপ্লবে। কিন্তু গোড়ায় এই তত্ত্বের গঠনে জাতীয় সার্বভৌমত্ব (ন্যাশনাল সভরিনটি) ও অবিভিন্ন নাগরিক দিয়ে গড়া জাতিরাষ্ট্রের ধারণাটি স্পষ্ট বা সুনির্দিষ্ট ছিল না। ইউরোপে উনিশ শতকে এই তত্ত্বটির জাতীয়করণ হয়। জনমান্য সার্বভৌমত্ব (পপুলার সভরিনটি) হয়ে ওঠে জাতীয় সার্বভৌমত্ব (ন্যাশনাল সভরিনটি) আর একটি জাতিরাষ্ট্রে সমনাগরিকত্বেরও সমার্থক। প্রজাতন্ত্রের ধারণাটি এই চেহারাতেই এশিয়া ও আফ্রিকায় পরিবাহিত হয়েছিল, ভারতেও— বিশ শতকে বিউপনিবেশায়ন-পরবর্তী কালে। আজ মোটামুটি ভাবে বিশ্বের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ দেশই প্রজাতন্ত্র।

স্বাধীন দেশ ও জাতি হিসেবে ভারতের যে বিশেষ অভিজ্ঞতা, তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রজাতন্ত্র নিয়ে আমাদের ধারণাটি প্রায়ই গণতান্ত্রিক সরকার বা শাসনব্যবস্থার ধারণার সঙ্গে মিলেমিশে যায়। কিন্তু প্রজাতন্ত্রবাদ (রিপাবলিকানিজ়ম) ও গণতন্ত্র (ডেমোক্র্যাসি)-এর মধ্যে কোনও মূলগত যোগসূত্র নেই। উদাহরণ হিসেবে বলা চলে, ১৯২৩ সালে ঘোষিত তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের মধ্যেই সযত্নে রক্ষিত হয়েছিল মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের মতো এক সর্বময় নেতা এবং একক এক রাজনৈতিক দলের ভিত্তিতে গড়া, স্পষ্টতই আধিপত্যবাদী এক সরকার-ব্যবস্থা। প্রজাতন্ত্র নানান কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরাচারী গড়নে আসতে পারে, এসেছেও— তার সেই রূপ সে কতটা ঢাকাচাপা দিয়ে আসবে না কি খোলাখুলিই প্রকাশ করবে, সেটুকুই তফাত।

ভারতে অনেকে আবার প্রজাতন্ত্রবাদ (রিপাবলিকানিজ়ম) ও ধর্মনিরপেক্ষতার (সেকুলারিজ়ম) মধ্যেও একটি মূলগত যোগসূত্র ভেবে নেন বা নিয়েছেন। ব্যাপারটা ঠিক সে রকমও নয়। তুরস্ক প্রজাতন্ত্রে একেবারে গোড়ার দিকে একটা ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাপার (অ্যাজেন্ডা) ছিল। ১৯২৬ সালে, সুইৎজ়ারল্যান্ডের ১৯১২ সালে গৃহীত নাগরিক আইনবিধি অনুসরণে তুরস্কে কামালপন্থী প্রজাতন্ত্র একটি ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক আইনবিধি (সেকুলার সিভিল কোড) চালু করে; শরিয়া আইন এবং উনিশ শতকের অটোমান ‘মেজেলে’ বিধি, দুই-ই পরিহার করে। ১৯২৮ সালে কামালপন্থীরা তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের ১৯২৪-এর সংবিধান থেকে ‘আর্টিকল ২’ বাদ দেয়, যেখানে বলা ছিল, ‘তুরস্ক রাষ্ট্রের ধর্ম হল ইসলাম’। অন্য দিকে, ১৯৭৯ সালে ঘোষিত ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান-এর ধারণায় স্পষ্ট রক্ষিত ছিল একটি ধর্মতান্ত্রিক সরকার-ব্যবস্থা, যার ভিত্তি ছিল ‘বিলায়েত-ই-ফাকিহ্‌’ বা আইনজ্ঞ বিচারকদের অভিভাবকতন্ত্র— ১৯৮৯ সালে তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ওই ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতোল্লা খোমেনি ছিলেন যার প্রতিমূর্তি। ইরানের বিপ্লব পাহলভি রাজতন্ত্রকে হটিয়ে ধর্মগুরুর একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল।

এ থেকে পরিষ্কার, আধুনিক প্রজাতন্ত্রের গণতান্ত্রিক এবং/অথবা ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার কোনও দায় নেই। সে আধিপত্যবাদী এমনকি স্বৈরাচারী ক্ষমতার শাসনের সঙ্গে, ‘স্ট্রংম্যান অথরিটি’র ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে; জাতির চেতনার নির্যাস লুকিয়ে আছে তার ধর্মতত্ত্ব, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইতিহাসে— এমন ব্যাখ্যা দিতে পারে; সমষ্টির অস্তিত্ব নির্মাণ করতে পারে ধর্মের, বিশেষত সংখ্যাগুরুর ধর্মের ভিত্তিতে।

প্রজাতন্ত্রের ‘চরিত্র’ আবার সময়ের হাত ধরে পাল্টাতেও পারে। মাত্র দুই শতাব্দীর মধ্যেই ফ্রান্সে অন্তত পাঁচটি প্রজাতন্ত্র দেখা গিয়েছে। প্রথমটি— ১৭৯২ সালে ঘোষিত বিপ্লবী প্রজাতন্ত্র— নেপোলিয়ন ১৮০৪ সালে বাতিল করে দেন। সংখ্যাগুরুর ধর্ম ক্যাথলিক, ধর্মতন্ত্রবিরোধী বিপ্লবীরা যা জনপরিসর থেকে নির্বাসিত করেছিলেন— তাকে সসম্মানে ফিরিয়ে এনে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়। পরবর্তী একশো বছর এই ক্যাথলিক চার্চ ও তার সঙ্গী রক্ষণশীল শক্তিগুলিই রাজত্ব করেছিল। দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র ছিল নিতান্ত ক্ষণস্থায়ী (১৮৪৮-১৮৫২)। তৃতীয় প্রজাতন্ত্রের (১৮৭০-১৯৪০) মাঝামাঝি সময়ে চাকা ঘুরতে থাকে— ১৯০৫ সালে ফরাসি পার্লামেন্টের দু’টি কক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আইন পাশ করে চার্চ ও স্টেট-এর পৃথকীকরণকে বিধিবদ্ধ রূপ দেয়। এই তৃতীয় প্রজাতন্ত্র ও তার পরেরটিতে (১৯৪৬-১৯৫৮) সংসদীয় সরকার-ব্যবস্থা অনুসৃত হয়েছিল। কিন্তু পঞ্চম তথা বর্তমান প্রজাতন্ত্রে— আলজেরিয়ান যুদ্ধের কারণে ও আবহে উদ্ভূত রাজনৈতিক সঙ্কটকালে ১৯৫৮ সালে চার্লস ডি গল শাসনভার হাতে তুলে নেওয়ায় যার শুরু— সংসদীয় আধিপত্য মুছে এক শক্তিধর প্রেসিডেন্টের শাসন (এগজ়িকিউটিভ প্রেসিডেন্সি) প্রতিষ্ঠিত হয়।

ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ঘোষণার ছিয়াত্তর বছর পরে আমাদের দেশ এখন কার্যত এক দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের যাত্রাপথে আছে, বলা যায় নিঃসন্দেহে। ২০১৪ সালে উদ্দেশ্যমূলক ভাবে গঠনের পর থেকে এই প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক সম্প্রদায় (পলিটিক্যাল কমিউনিটি)-এর ধারণা— ছদ্ম-ধার্মিক সংখ্যাগুরুবাদ (সিউডো-রেলিজিয়াস মেজরিটারিয়ানিজ়ম) এবং সমনাগরিকত্বের নীতির কার্যকর অস্বীকৃতির (বিশেষ করে মুসলমানদের প্রতি) ভিত্তিতে গড়া ‘নেশন’ বা জাতির ধারণা। হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রজাতন্ত্রের এই নির্মাণ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে, উত্তর ও পশ্চিম ভারতের প্রায় পুরোটাই এখন সার্বভৌম ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ভুক্ত অঞ্চল বলা চলে। আমরা এক অবস্থান্তরের মধ্য দিয়ে চলেছি, যার বৈশিষ্ট্য একটি ‘লিডার কাল্ট’-এর শাসন, ১৪০ কোটি দেশবাসীর উপর গুজরাতের দুই ‘স্ট্রংম্যান’-এর ক্রমপুঞ্জীভূত ক্ষমতার প্রতাপ। আমাদের গণতন্ত্র এখন নানা ফাঁদে পড়ে ফাঁকা কলসির আওয়াজে পর্যবসিত হতে বসেছে। দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও সভ্য সমাজধারণার অস্তিত্বের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে তা।

এই পরিস্থিতিতে কী করণীয়? আশাবাদী হওয়া মুশকিল— বিচারব্যবস্থার হস্তক্ষেপে যে এই স্বৈরতন্ত্রী শাসক দমে যাবে বা পিছু হটবে, সেই আশা বাতুলতা। শীর্ষ আদালত নানা সময়ে দুই প্রধান শাসক-নেতার নানাবিধ কৌশল থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু অনেক সময়েই আবার তার সহযোগীও হয়ে ওঠে— যেমন ২০১৯-এর নভেম্বরে অযোধ্যা সংক্রান্ত রায়, বা ২০২৩-এর ডিসেম্বরে জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর রিঅর্গানাইজ়েশন অ্যাক্ট। সংসদের দুই কক্ষও হিন্দুত্বের জয়রথ থামাতে পারেনি, ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পরেও। ২০২৬-এ রাজ্যসভায় বিজেপির আসন বাড়তেও পারে।

১৯৫০ সালে প্রণীত ভারতের সংবিধান উদ্ধৃত করে হিন্দুত্বের হানা প্রতিরোধ করা একটা আলঙ্কারিক পন্থা নিশ্চয়ই, কিন্তু তা কোনও রাজনৈতিক প্রতিকৌশল নয়। সংবিধান ঘিরে রোম্যান্টিকতা এমন চরম স্তরে পৌঁছেছে যে তা এই সুকঠিন সত্যকে ঢেকে দিচ্ছে— এই সংবিধান আসলে এক ‘ইমপারফেক্ট ডকুমেন্ট’— ১৯৩৫-এর গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট-এর মতোই— কেন্দ্রীভূত ও আধিপত্যবাদী ক্ষমতার পালে হাওয়া জোগানোর নানাবিধ সহায়ক সরঞ্জাম সেখানে মজুত। ১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে ইন্ডিয়ান ল রিভিউ-এ প্রকাশিত তাঁর লেখায় সংবিধানের আইনি সমালোচনা করে ঠিক এই বিষয়টি নিয়েই দেশবাসীকে সতর্ক করেছিলেন শরৎচন্দ্র বসু। উপরন্তু প্রজাতন্ত্রের শরীরে জবরদস্তি বলপ্রয়োগ ও নিগ্রহের আইনি বৈধতাও বুনে দেওয়া আছে: ১৯৫৮-র আর্মড ফোর্সেস স্পেশ্যাল পাওয়ারস অ্যাক্ট (আফস্পা); ১৯৬৭-র আনলফুল অ্যাক্টিভিটিজ় প্রিভেনশন অ্যাক্ট (ইউএপিএ); ১৮৭০-২০২৩ অবধি বলবৎ ভারতীয় দণ্ডবিধির সেকশন ১২৪এ-র সিডিশন ল, ২০২৪-উত্তর যা ভারতীয় ন্যায়সংহিতার সেকশন ১৫২— ইত্যাদির উপস্থিতিতে। ভারতের দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের নির্মাতাদের হাতে এই সব সাংবিধানিক ও আইনি অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে।

আমাদের এই গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের যেটুকু বাকি আছে তার রক্ষায় দরকার এমন এক কার্যকর রাজনৈতিক বিরোধিতা, মতাদর্শগত ভাবে যা একনিষ্ঠ। তার বদলে দেখা যাচ্ছে খণ্ডিত বিভাজিত দিশাহারা ও নেতৃহারা এক বিরোধী গোষ্ঠীকে, কিছু ক্ষয়িষ্ণু বা পরিবারতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল নিয়ে যারা গঠিত। তা সত্ত্বেও, এই কথায় জোর দিয়েই এ লেখা শেষ করা উপযুক্ত হবে যে, ভারতের প্রবল ভাবে দরকার এমন এক জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, যা হিন্দুত্বের দুর্বল মিনমিনে নকলনবিশি হবে না— ভারতীয়দের জাতিগত ধারণাকে হিন্দুত্বের ছাঁচে ফেলে নির্মাণকে যা স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন ভাবে বিরোধিতা করবে। আর যে-হেতু এমন এক মতাদর্শগত বিকল্পের আশা খুব কম, তাই প্রথম প্রজাতন্ত্রের শতবর্ষের আগেই দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের নির্মাণ সম্পূর্ণ হওয়াটা ঘটে যেতে পারে।

প্রফেসর, ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড কম্পারেটিভ পলিটিক্স, ক্রিয়া ইউনিভার্সিটি

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন