একসূত্রে: শান্তিনিকেতনে মাধবীবিতানে রবীন্দ্র-জন্মোৎসব, ৯ মে ২০২৬। ছবি: পিটিআই।
শান্তিনিকেতনে পঁচিশে বৈশাখ এ বার পালিত হল এক উল্লেখযোগ্য ব্যঞ্জনায়। কবিগুরুর ১৬৫তম জন্মদিনে অন্যান্য বছরের মতো রীতি মেনে সব অনুষ্ঠানই হল— প্রত্যুষে কবিকণ্ঠের রেকর্ড সম্প্রচারের সঙ্গে পা মিলিয়ে অনুরাগীদের সশ্রদ্ধ বৈতালিক; কাচমন্দিরে উপাসনা, মাধবীবিতানে কবিপ্রণাম এবং সন্ধ্যায় গৌরপ্রাঙ্গণে নৃত্যনাট্য মায়ার খেলা পরিবেশনা। এ-সবের সঙ্গে ১৪৩৩-এর রবীন্দ্র-জন্মোৎসবকে যে অনুষ্ঠানটি স্মরণীয় করে রাখল, সেটি ‘পঞ্চবটী’ উদ্যান উদ্বোধন।
১৯১৯ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ সযত্নে শান্তিনিকেতন গৃহের অদূরে, আশ্রম বিদ্যালয়ের পশ্চিম প্রান্তে, উত্তরায়ণ নামক আবাসন চত্বরটি গড়ে তোলেন। প্রখ্যাত স্থপতি সুরেন্দ্রনাথ কর, রামকিঙ্কর বেজ এবং শিল্পী নন্দলাল বসুর সুনিপুণ নান্দনিক দক্ষতায় গুরুদেবের কল্পনাপ্রসূত অনুপম নিকেতনগুলি মূর্ত হয় একে একে— কোণার্ক, শ্যামলী, উদয়ন, উদীচী এবং পুনশ্চ। লাল কাঁকুরে মাটি সরিয়ে উর্বর এঁটেল মাটি ফেলে গাছ পোঁতা হল চারিপাশে, আর পরিপাটি যত্নে কেয়ারি-করা উদ্যান নির্মিত হল বাড়িগুলোর সামনে ও পিছনে। এই গাছগুলো এখন মহীরুহে পরিণত হয়ে স্নিগ্ধ ছায়া বিস্তার করেছে উত্তরায়ণের সমগ্র চত্বরটিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে ছায়াঘন যে অঞ্চলটি, সেটি উদয়ন বাড়ির পিছনে, উত্তর-পশ্চিম দিকে সুবিন্যস্ত পাঁচটি বৃক্ষের সমারোহে গঠিত।
২৫ বৈশাখ ১৩৩২ বঙ্গাব্দে (৮ মে ১৯২৫) ৬৫ বছরের জন্মদিনে কবিগুরু এই জায়গাটিতে বট, অশ্বত্থ, বেল, অশোক ও আমলকী— পাঁচটি গাছের চারা রোপণ করেন সমদূরত্বে। পৌরাণিক প্রসিদ্ধির নিরিখে ও গুণবত্তার মাপকাঠিতে পাঁচটি বৃক্ষই বটের স্বজাতীয় বলে জায়গাটির নামকরণ হয় পঞ্চবটী। পণ্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রী কবির এই প্রকৃতিচেতনাকে অমরত্ব দিতে রচনা করেন শ্লোক: “পন্থানাং চ পশুনাং চ পক্ষিণাং চ হিতেচ্ছায়া।/ এষা পঞ্চবটী যত্মাদ্ রবীন্দ্রেণেঽ রোপিতা।” (পথিক, পশু ও পাখির হিতার্থে রবীন্দ্রনাথ যত্নসহকারে এই পঞ্চবট রোপণ করলেন।) এই গাছগুলির সুঠাম কাণ্ডসমূহ আজ মাথা উঁচিয়ে শাখাপ্রশাখায় পল্লবিত হয়ে সমস্ত জায়গাটিতে এক সুশীতল তরুবিতান রচনা করেছে। পার্শ্ববর্তী পম্পা-সরোবর ও জাপানি উদ্যান সহযোগে বিস্তৃত এই মনোরম অঞ্চলটি প্রায় এক দশকের অবহেলায় পর্যটক ও দর্শনার্থীদের দৃষ্টির অন্তরালে চলে গিয়েছিল। তবে এ বারে কবির জন্মদিনে নতুন সাজে সজ্জিত পঞ্চবটী উন্মুক্ত হল উত্তরায়ণের দর্শনার্থীদের জন্য।
প্রকৃতি ও মানবের মধ্যে যে আত্মিক সম্পর্ক গুরুদেব তাঁর সমস্ত অনুভূতি দিয়ে আস্বাদন করেছেন, এই পঞ্চবটী তার উৎকৃষ্ট স্মারক। মানুষ তার নিজের স্বার্থে পরিবেশসচেতন হয়ে উঠলেও বহিঃপ্রকৃতির প্রতি নিঃস্বার্থ সংবেদনশীলতা জাগ্রত করার ক্ষেত্রে এখনও পশ্চাৎপদ। যে আবেশের সম্মোহনে সংবেদনের সেই ছোঁয়াচ লাগতে পারে প্রাণে, তা লুকিয়ে আছে পঞ্চবটীর এই উদ্যানে। এখানে ‘প্রাণের সঙ্গে প্রাণের নির্মল অবাধ মিলনের বাণী’ ‘গুন্গুনিয়ে ওঠে’ ‘বোবা-বন্ধ(র)’ ডালে ডালে, পাতায় পাতায়।
শেষোক্ত উদ্ধৃতিটি তেজেশচন্দ্র সেনকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি থেকে। ১৯২৬, কবিগুরু ইউরোপ ভ্রমণে ভিয়েনা শহরের হোটেলে। রোজ তিনটে নাগাদ ঘুম ভেঙে গিয়ে একটা ‘অসহ্য চঞ্চলতা’ মনকে আন্দোলিত করে। শান্তিনিকেতনে প্রত্যহ ভোর হওয়ার আগে ব্রাহ্মমুহূর্তে তার বোবা-বন্ধুদের সান্নিধ্যে যে নিস্তব্ধ ‘ধ্যানের সুরে’ বিভোর হতেন, হোটেলের বদ্ধ ঘরে সেই আনন্দঘন মুহূর্তগুলো ফিরে পেতে তাঁর মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে, চাইছেন ‘নিজের কাছে থেকেই উদ্দামবেগে পালিয়ে’ যেতে। যাবেন কোথায়? ‘কোলাহল থেকে সংগীতে’। ২৩ অক্টোবর তেজেশচন্দ্রকে লিখলেন, “...মনে পড়ে গেল, সেই সংগীত তার সরল বিশুদ্ধ সুরে বাজছে আমার উত্তরায়ণের গাছগুলির মধ্যে— তাদের কাছে চুপ করে বসতে পারলেই সেই সুরের নির্মল ঝর্ণা আমার অন্তরাত্মাকে প্রতিদিন স্নান করিয়ে দিতে পারবে। এই স্নানের দ্বারা ধৌত হয়ে, স্নিগ্ধ হয়ে, তবেই আনন্দলোকে প্রবেশের অধিকার আমরা পাই। পরমসুন্দরের মুক্তরূপে প্রকাশের মধ্যেই পরিত্রাণ— আনন্দময় সুগভীর বৈরাগ্যই হচ্ছে সেই সুন্দরের চরম দান।” এই বৈরাগ্য হল রূপের মাঝে অরূপকে প্রত্যক্ষ করার মহানন্দ— যে আনন্দ লাভে মানুষ সংসারের ‘অসংখ্যবন্ধন-মাঝে’ সমস্ত মায়া ও প্রবঞ্চক উত্তেজনা থেকে মুক্ত হতে পারে। বিটপীলতার গহিন সান্নিধ্যে যে আরাম, সঙ্গীতের মূর্ছনায় যে শান্তি, উভয়েই মনোজগতে সমভাব উৎপাদনে সহায়ক।
রবীন্দ্রচেতনায় ‘কোলাহল’ ও ‘সংগীত’-এর পার্থক্য বিস্তর। ‘সংগীতচিন্তা’ প্রবন্ধে খোলসা করে বললেন; কোলাহল উত্তেজিত করে; সৈনিকের মনে যুদ্ধের উদ্দীপনা জোগায়। আর সঙ্গীত হল “ভূমার সুর; তার বৈরাগ্য, তার শান্তি, তার গভীরতা সমস্ত সংকীর্ণ উত্তেজনাকে নষ্ট করিয়া দিবার জন্যই”। সঙ্গীত সম্বন্ধে তাঁর উপলব্ধি ভারতীয় বোধ ও বীক্ষণের সঙ্গে মেলে। আনন্দ কুমারস্বামী দ্য ডান্স অব শিব গ্রন্থে ভারতীয় সঙ্গীত সম্বন্ধে শঙ্করাচার্যের মত তুলে ধরেন: বিষ্ণুপুরাণ অনুসারে ঈশ্বর যে শব্দের রূপ ধারণ করে রয়েছেন তার প্রকাশ আমাদের সরল বিশুদ্ধ সঙ্গীতে। দেবত্বে যে শান্তি ও গভীরতা, তা-ই সঙ্গীতের পরম প্রসাদ।
ভারতীয় দর্শনে প্রাণী, প্রকৃতি ও আপাত জড়বস্তুর মধ্যে রয়েছে এক মঙ্গলময় সম্পর্ক। এর সঙ্গে পাশ্চাত্য বিশ্ববোধের মূলগত পার্থক্য আছে। বহু দিন পর্যন্ত পশ্চিমি তাত্ত্বিকরা মনে করে এসেছেন, মানুষই জগতের কেন্দ্রে, প্রকৃতি ও প্রাণিজগৎ তাদের কৃপাধন্য। প্রকৃতির উপর মানুষের এই প্রভুত্ব আরোপের বিষময় ফল আজ আমরা টের পাচ্ছি। পরিবেশবিজ্ঞানীরা এই অবস্থা সামাল দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। পশ্চিমি পরিবেশবিদদের একাংশ ‘ডিপ ইকোলজি’ তত্ত্বের কথা বলছেন। নরওয়েজিয়ান পরিবেশবিদ আর্নে ন্যাসের এই ধারণা ভোগবাদী সমাজের প্রযুক্তিবাদী পরিবেশ-সংরক্ষণ চিন্তার মূলে আঘাত হানে। প্রকৃতি তার নিজস্ব বিশিষ্টতায় আপন অস্তিত্বের কারণেই বিরাজমান, বরং মানুষ প্রকৃতিরই এক অংশ— এই ধারণাপুষ্ট কর্মকাণ্ড পরিবেশ আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা সংযোজন করে। তবে এই আন্দোলনও সম্পূর্ণরূপে প্রজাতিমনস্কতার সঙ্কীর্ণতা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারেনি।
প্রকৃতির আশীর্বাদ কতটা গভীর ভাবে উপলব্ধি করলে আলাদা করে পরিবেশ বিপ্লবের প্রয়োজন হয় না, তার নিদর্শন বেদ-উপনিষদ-কালিদাস হয়ে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে তপোবনমনস্কতা। কবিগুরু বৃক্ষকে বলেছেন ‘আদিপ্রাণ’, যে পৃথিবীর ‘নিঃসাড় নিষ্ঠুর মরুস্থলে’ সর্বপ্রথম এনেছিল ‘প্রাণের আনন্দ’। তার পর “কত যুগ যুগান্তরে/ কান পেতে ছিল স্তব্ধ, মানুষের পদশব্দ তরে/ নিবিড় গহনতলে। যবে এল মানব অতিথি,/ দিল তারে ফুল ফল, বিস্তারিয়া দিল ছায়াবীথি।” পঙ্ক্তিগুলি জগদীশচন্দ্র বসুকে শান্তিনিকেতন থেকে চিঠিতে লেখা, ১৩৪৫ বঙ্গাব্দের ১৪ অগ্রহায়ণ। বৈজ্ঞানিক উপায়ে গাছের প্রাণ যিনি আবিষ্কার করলেন, তাঁর মহান কীর্তি কবি স্মরণ করছেন: “হে তপস্বী, তুমি একমনা/ নিঃশব্দেরে বাক্য দিলে; অরণ্যের অন্তরবেদনা/ শুনেছ একান্তে বসি।”
বিজ্ঞানী ফ্রিটজফ কাপরা তাঁর দ্য তাও অব ফিজ়িক্স গ্রন্থে নটরাজের নৃত্যের ইঙ্গিতবাহী তাৎপর্যের যে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করেন, ঋতুরঙ্গশালা কাব্যসঙ্কলনের ‘নটরাজ’ কবিতায় “বিশ্বতনুতে অণুতে অণুতে/ কাঁপে নৃত্যের ছায়া”-তেও পাই কবিগুরুর বিশ্ববোধের একই পরিচয়; প্রকৃতির সঙ্গে সমপ্রাণতার আত্মিক বন্ধনে মিলিত হই আমরা। ‘তপোবন’ প্রবন্ধে এই মিলন প্রসঙ্গে কবিগুরু কালিদাসের রঘুবংশম এবং অভিজ্ঞান শকুন্তলম্ আর বাণভট্টের কাদম্বরী থেকে দৃষ্টান্ত উপস্থিত করেছেন। তপোবনের ঋষি-কন্যারা যত্ন সহকারে বৃক্ষের আলবাল নিকিয়ে তাতে জলসিঞ্চন করছে, আর পশুপক্ষী নিঃসঙ্কোচে সেই যত্ন উপভোগ করে তরুলতা সহযোগে একটা সুরেলা মিলনরাগিণী সৃষ্টি করেছে। কালিদাসের সেই অপূর্ব সৃষ্টির নবীন সংস্করণ গুরুদেব তৈরি করেছেন তাঁর শান্তিনিকেতনে। পঞ্চবটীর প্রতিটি বৃক্ষ আজ আলবালে পরিবৃত; আর শ্রান্ত পথিকের বিশ্রাম ও প্রকৃতি-মিলনের সুযোগ করে দিতে আসন পাতা হয়েছে কূজনমুখরিত ছায়াঘন তরুমণ্ডপে। আসন্ন বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদ্যাপনের প্রকৃষ্ট গন্তব্য এ বার গুরুদেবের স্মৃতিবিজড়িত পঞ্চবটী হলে কেমন হয়?
অধ্যক্ষ, রবীন্দ্রভবন, বিশ্বভারতী
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে