এই প্রথম কোনও অকারণ যুদ্ধ বিশ্বকে এত বড় সঙ্কটে ঠেলে দিল
US-Iran War

আমেরিকার ‘সুয়েজ়’ মুহূর্ত?

১৯৫৬ সালে সুয়েজ় খালের জাতীয়করণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এমনই এক যুগান্তকারী ঘটনা ছিল। আর আজ, সত্তর বছর পর, হরমুজ় প্রণালীকে ঘিরে যে লড়াই দেখছি আমরা, তাও যেন তেমনই এক মুহূর্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সৌরজিৎ দাস

শেষ আপডেট: ০৪ মে ২০২৬ ০৫:০৯
Share:

ইতিহাসে পড়েছি, যে কোনও সাম্রাজ্যের পতনের কিছু পূর্ব লক্ষণ থাকে। এক, যখন তার সেনা কোনও স্পষ্ট, অর্জনযোগ্য, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাছাড়াই বিশাল ভূখণ্ড জুড়ে অসংখ্য বিদেশি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। দুই, সেনাবাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণের খরচ রাষ্ট্রের সম্পদ উৎপাদনের ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়, যার ফলে সাম্রাজ্য আর্থিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। আর তিন, পরাধীন জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধ সাম্রাজ্যের শক্তিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

১৯৫৬ সালে সুয়েজ় খালের জাতীয়করণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এমনই এক যুগান্তকারী ঘটনা ছিল। আর আজ, সত্তর বছর পর, হরমুজ় প্রণালীকে ঘিরে যে লড়াই দেখছি আমরা, তাও যেন তেমনই এক মুহূর্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই সূত্রে, ইতিহাসবিদ রে ডালিও, যিনি গত ৫০০ বছরে বিশ্বশক্তিগুলোর ওঠা-পড়া নিয়ে গবেষণা করেছেন, বলেছেন যে হরমুজ় প্রণালীকে নিয়ে বর্তমান উত্তেজনা আমেরিকার জন্য একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে, ঠিক যেমন ছিল ১৯৫৬ সালের সুয়েজ় খাল সঙ্কট— ব্রিটেনের জন্য।

প্রায় চারশো বছর ধরে বিশ্ব জুড়ে শাসন ছিল ব্রিটেনের। তাদের নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলি নিয়ন্ত্রণ করত। এই জলপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল সুয়েজ় খাল, মিশরের একটি সঙ্কীর্ণ জলপথ। এই খাল ভূমধ্যসাগরকে লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। আসলে, খালটি শুধু পণ্য পরিবহণের একটি পথ ছিল না, ব্রিটেনকে তার ঔপনিবেশিক অঞ্চলগুলোর সঙ্গেও যুক্ত করত। একই সঙ্গে এই খাল ছিল তার সাম্রাজ্যবাদী মর্যাদার প্রতীক। ১৯৫৬ সালে সেই সময়ের মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের খালের জাতীয়করণ করে ঘোষণা করেন, ওটি মিশরের সম্পত্তি। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি মূলত পশ্চিম এশিয়ায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দিকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল ব্রিটেন। স্বাভাবিক ভাবেই সুয়েজ়-নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে ফ্রান্স ও ইজ়রায়েলের সঙ্গে মিলে মিশরকে তারা আক্রমণ করে। যুদ্ধে এই যৌথ বাহিনী প্রথম দিকে সাফল্য পেলেও, পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। আমেরিকা, সোভিয়েট ইউনিয়ন এবং রাষ্ট্রপুঞ্জ ব্রিটেনকে মিশর থেকে তার সেনা সরাতে বলে। শেষ পর্যন্ত, প্রবল কূটনৈতিক চাপের মুখে ব্রিটেন পিছু হটতে বাধ্য হয়। ফলে আক্রমণও ব্যর্থ হয়। এর পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী— ব্রিটিশ পাউন্ড ক্রমশ দুর্বল হল এবং ব্রিটেনের বহু মিত্র রাষ্ট্র বিশ্ব জুড়ে তার আধিপত্যের বিষয়ে প্রশ্ন তুলল। পরবর্তী সময়ে, ব্রিটিশ উপনিবেশগুলিও তাদের স্বাধীনতা আন্দোলন আরও জোরদার করল। পিছন ফিরে দেখলে মনে হয়, সুয়েজ় সঙ্কটই ছিল সেই মুহূর্ত, যখন বিশ্বময় এই উপলব্ধি তৈরি হল যে, ব্রিটেন আর আগের মতো প্রভাবশালী শক্তি নেই। সে দিক থেকে, বিষয়টা শুধু খাল নিয়ে ছিল না, ছিল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। ব্রিটেনের শক্তির উপর বিশ্বাস যখন কমতে শুরু করল, তার ভূ-রাজনৈতিক ও আর্থিক পরিণতিও ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠল।

সুয়েজ় সমস্যা এক দিকে ব্রিটিশদের পতন এবং অন্য দিকে আমেরিকার উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছিল। সেই সময়ে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ছিল আঞ্চলিক অস্থিরতা ও সেই সময়ের ঠান্ডা যুদ্ধের মাঝে সোভিয়েটের শত্রুতা আটকানোর একটি পরিকল্পিত উদ্যোগ, যা আমেরিকাকে প্রভাবশালী, অপরিহার্য ও অ-ঔপনিবেশিক বিশ্বশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল। আজ পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতি, অর্থনীতি এমনকি নিরাপত্তাতেও তাদের প্রভাব বিরাট। সামরিক ঘাঁটি গড়া থেকে শুরু করে পেট্রোডলার ব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে এই অঞ্চলে এখন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রেরই আধিপত্য। তবে কিনা, বর্তমান পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে আলাদা— যে ভাবে ব্রিটেনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সে ভাবে কোনও একটি শক্তি আমেরিকাকে সরাতে তৈরি বলে মনে হচ্ছে না।

সুয়েজ়-এর মতোই আজ হরমুজ় একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ জ্বালানি জোগানের জন্য। বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এখন হরমুজ় প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। সে ক্ষেত্রে এখানে কোনও ধরনের ব্যাঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। হরমুজ় খালের দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকা বা জ্বালানি প্রবাহে ধারাবাহিক ব্যাঘাত শুধু বিশ্ব-অর্থনীতিকেই অস্থির করছে না, জ্বালানির দাম বাড়িয়ে আমেরিকা-সহ বাকি বিশ্বের উপরেও চাপ সৃষ্টি করছে। অন্য দিকে, এত সামরিক শক্তি সত্ত্বেও আমেরিকা যদি হরমুজ় প্রণালীর পরিস্থিতি স্বাভাবিক না করতে পারে, তবে সেটা তার ‘ক্ষমতা’-র বিষয়েই প্রশ্ন তুলে দেবে। দিচ্ছেও। দেখতে গেলে, পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরেই শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটতে হয়েছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে।

অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পাশাপাশি আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যৌথ আগ্রাসন অবশেষে ইরানের মনোবল ভেঙে দেবে। অথচ, আমেরিকান-ইজ়রায়েলি হামলা থেকে যে নেতৃত্ব উঠে এসেছে, তারা আরও বেশি উদ্ধত ও আপসহীন। পাশাপাশি হরমুজ় প্রণালীর উপর তার ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ইরান কার্যকর ভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি চলাচলের পথকে আটকে দিয়েছে। ইরান নেতৃত্বের বর্তমান কাজকর্ম দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, চুক্তিতে পৌঁছনোর কোনও তাড়া নেই এদের। আবার কম মূল্যে কোনও আপস মেনে নিতেও এরা নারাজ। আপাতত, কৌশলগত সাফল্য দাবি করতে ইরানের তার সমস্ত উদ্দেশ্য অর্জন করার প্রয়োজন পড়েনি। আমেরিকা ও তার মিত্ররা এত দিনেও ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে বা তাকে চূড়ান্ত ভাবে দুর্বল করতে বিফল হওয়ায়, ইরানের মূল উদ্দেশ্য— টিকে থাকা— আপাতত পূরণ হয়ে গিয়েছে।

ভারতের জন্য এই ধাক্কা— মারাত্মক। রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি অন্যান্য জায়গা থেকেও দ্রুত আমদানির মাধ্যমে পেট্রলের ঘাটতি অনেকাংশে সামাল দেওয়া গেছে বটে, তবে এলপিজি সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে ক্রমশ বাড়তে থাকা আমদানি খরচের প্রভাব ধীরে ধীরে পড়ছে মূল্যবৃদ্ধিতেও। শিল্প ও সার খাতের জন্য প্রোপেন, বিউটেন এবং সালফারের মতো সামগ্রীর জোগানে ভাটা পড়ায় দেশের কৃষি উৎপাদনও সঙ্কটে। ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজগুলো নিরাপত্তার সঙ্গে এই ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে চলাচল করলেও, কিছু জাহাজকে হামলার মুখে পড়তে হয়েছে।

এখনও ইরান-যুদ্ধের মীমাংসা হয়নি। বরং যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইরানের উপরে চাপ বাড়াতে নানা নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি হরমুজ় প্রণালী আটকে রাখছে আমেরিকার নৌবাহিনী। ফলে, পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। গত ফেব্রুয়ারির শেষে যে সামরিক অভিযান শুরু হয়েছিল, আজ তা গত অর্ধ শতকের মধ্যে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে পরিণত হয়েছে, বিশেষত আর্থিক ভাবে। এই যুদ্ধে একটি নয়, এক সঙ্গে একাধিক ক্ষেত্র প্রভাবিত। জ্বালানি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। খাদ্যব্যবস্থা চাপের মুখে। ব্যবসার পথগুলো আরও খরচসাপেক্ষ ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। হরমুজ় প্রণালী আজ আর আগের মতো সুরক্ষিত নয়। পরিস্থিতি যা, তাতে ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি পরিকাঠামো নতুন করে গড়ে তুলতে বেশ কয়েক বছর সময় লাগবে। এর মাঝে বিশ্ব অর্থনীতিতেও বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম।

তা হলে ডোনাল্ড ট্রাম্পই আধুনিক ইতিহাসে প্রথম নেতা, যিনি সরাসরি যুদ্ধের মাধ্যমে একটি বিশ্বজোড়া সমস্যা তৈরি করলেন। আমেরিকার আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে পরিচালিত এই যুদ্ধের দাম এই পৃথিবীকে অনেক দিন ধরে দিয়ে যেতে হবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন