Mani Sankar Mukherjee

শ্রীমণিশংকর মুখোপাধ্যায় (১৯৩৩-২০২৬)

চৌরঙ্গী তাঁর সাহিত্যজীবনের মাইলস্টোন। রুশ ভাষাতে পর্যন্ত অনুবাদ হয়েছে বইটি। তবুও বলা হচ্ছিল শংকর নিজে যা দেখেছেন, শুধু তা-ই লিখতে পারেন, ‘আমি’ ছাড়া গল্প বলার কৌশল জানেন না। অভিমানের বশে বছরখানেক দিনরাত পরিশ্রম করে বিজ্ঞানের পটভূমিকায় লিখলেন নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি।

শেষ আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৬:৪৩
Share:

অনুষ্ঠানে, পুরস্কার বিতরণী সভায় তিনি ঢুকলেই তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা বোঝা যেত। সেই আকর্ষণ অক্ষত ছিল সাত দশক ধরে। কিন্তু, জনতাকে যে বিষয়বস্তু সহজে টানে, সেই নর-নারীর প্রেম যে তাঁর সব উপন্যাসেরই মূলাধার— বলা চলে না। অথচ, আজও যে তাঁর একখানিও বই পড়েনি সেও কিন্তু তাঁকে চেনে। সমসাময়িক কিছু নক্ষত্রের মতো তারকা-সাহিত্যিকের দ্যুতিময় জীবনও কাটাননি। সারা জীবন ন্যস্ত থেকেছেন বিচিত্র পেশাগত কাজে। সেখান থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা ও চোখে দেখা চরিত্রদের নানা ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলি বাংলা সাহিত্যের গড়পড়তা চরিত্রের চেয়ে আলাদা, এমন মন্তব্যের উত্তরে তিনি বলতেন, খানিকটা সচেতন ভাবেই বদল এনেছেন। তাঁর চরিত্ররা আগেকার গল্প-উপন্যাসের মতো ভোলেভালা শিক্ষক, ডাক্তার, আইনজীবী বা ধনী জমিদার বা ব্যবসাদার নয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর জীবন ও কাজকর্ম যে ভাবে পাল্টে গেল, সেই বাঁকটাকেই ধরতে চেয়েছেন কলমে। সেই ব্যাপ্তি রয়েছে বলেই হয়তো তা মানুষকে ছুঁতে পেরেছে। পুনর্মুদ্রণের রেকর্ড করেছে বইগুলি। তবুও ঠাট্টা করতেন, “বিখ্যাত করার মূলে ‘জামাই’রা। গল্প-উপন্যাস হল কন্যা, আর তার থেকে চৌরঙ্গী, সীমাবদ্ধ, জন অরণ্য ইত্যাদি যত সিনেমা-নাটক হয়েছে, তারা ‘জামাই’।” এও বলতেন, তাঁকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন সত্যজিৎ রায়।

কাঁকরে-কুসুমে সাজানো চমকময় জীবনটিও সিনেমার চেয়ে কম ছিল না। হাওড়ার বিবেকানন্দ ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনার সময় থেকেই ঝোঁক সাহিত্যে, লেখালিখিতে। কিন্তু চোদ্দো বছর বয়সে এককালীন নাট্যকার বাবাকে হারিয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি রোজগারের চেষ্টাও দেখতে হয়। প্রথম বিভাগে আইএ পাশ করে ভাগ্যের ফেরে কখনও জাল সাবান বিক্রি করেছেন; টিউশনি, স্কুলে পড়ানো, মেশিন পরিষ্কার, চাপরাশি, অর্ডার সরবরাহ— অগুনতি ঘাট ঘুরে যখন ভাবছেন, পড়াশোনা করে বড় হওয়ার স্বপ্ন রাস্তার ধুলোতে হারিয়ে গেল, তখন ‘…বিধাতা মধুসূদন দাদার ছদ্মবেশে এসে অযাচিত উপহার দিলেন।’

সেই মধুসূদন দাদা কলকাতা হাই কোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল। ইংরেজ ব্যারিস্টারই এই শেষ বাঙালি মুহুরি বাবুর ‘অসাধারণত্ব’-এ শাণ দিয়েছিলেন। মণিশংকরকে ‘শংকর’ নামে প্রথম ডেকেছেন, উজাড় করেছিলেন তাঁর গ্রন্থাগার আর গল্পের ঝুলি, উৎসাহও দিয়েছিলেন। এর আগেই শংকরের লেখা অন্য স্বাদের প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক বসুমতী ও আনন্দবাজার পত্রিকা-র রবিবারের পাতায়। যুগান্তর-এ তাঁর হালকা লেখা বড়বাজারের ষাঁড়-এর সাক্ষাৎকার সম্পাদকদের নজর কেড়েছিল। বারওয়েল সাহেবের স্মরণে আদালতে দেখা ছবির ভিত্তিতে লেখা উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি গৌরকিশোর ঘোষের সহায়তায় পৌঁছয় দেশ-এর প্রবাদপ্রতিম সম্পাদক সাগরময় ঘোষের কাছে। ছেপে বেরোতে শুরু করলে সাহিত্যের দরবারে তাঁর আনুষ্ঠানিক প্রবেশ ১৯৫৪-য়। পরে বই হল শুভার্থী বিমল মিত্রের দৌত্যে, কত অজানারে নামকরণ ছিল নামের রাজা প্রেমেন্দ্র মিত্রের। দেশ-এ উপন্যাস বার হল বলেই তিনি হাজিরা না-থাকা সত্ত্বেও বিএ পরীক্ষায় বসতে অনুমতি পান ও ডিস্টিংশন-সহ পাশ করেন।

বইটি প্রশংসার সঙ্গে কিন্তু অবজ্ঞারও মুখোমুখি হয়েছিল। ‘ওয়ান বুক ওয়ান্ডার’ আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা ছিল। সব নস্যাৎ করে ১৯৬১ সালে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হল দ্বিতীয় উপন্যাস চৌরঙ্গী। এ উপন্যাসের উপাদান সংগ্রহে দীর্ঘ ‘ফিল্ডওয়ার্ক’ করেছেন। বারওয়েল সাহেবের সংস্পর্শে হোটেল জীবন দেখার অভিজ্ঞতা ছিলই; সঙ্গে এক্সাইজ়-এর লোক হয়ে স্পেন্স’স হোটেল, গ্রেট ইস্টার্ন এবং বিভিন্ন বার ও ক্লাব ঘুরে ইতিহাস খুঁজে কল্পনায় রাঙিয়ে লেখা উপন্যাস। সাগরময় বলেছিলেন, তাড়াহুড়ো না করতে, ফলে, দীর্ঘ দিন স্থগিত রাখার পর, লেখা শেষ করে তবে বিয়ে করতে বেরিয়েছিলেন লেখক।

চৌরঙ্গী তাঁর সাহিত্যজীবনের মাইলস্টোন। রুশ ভাষাতে পর্যন্ত অনুবাদ হয়েছে বইটি। তবুও বলা হচ্ছিল শংকর নিজে যা দেখেছেন, শুধু তা-ই লিখতে পারেন, ‘আমি’ ছাড়া গল্প বলার কৌশল জানেন না। অভিমানের বশে বছরখানেক দিনরাত পরিশ্রম করে বিজ্ঞানের পটভূমিকায় লিখলেন নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি। এল সমাজজীবন কেন্দ্রিক উপন্যাসগুলি। প্রতিটির বিষয় স্বতন্ত্র।ঘরের মধ্যে ঘর-এ অরণ্য-নগরী কলকাতায় মেয়েদের জন্য রাতের কী অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করে, তার ব্যথাতুর বিবরণ। তিনি নাকি সমকালীন রাজনীতিতে বিশেষ মনোযোগী নন। অথচ এপার বাংলা ওপার বাংলা বা নগরভিত্তিক উপন্যাসগুলি সময়ের নিরপেক্ষ দলিল। বঙ্গরঙ্গমঞ্চের শতবর্ষে লেখা সম্রাট ও সুন্দরী-র প্রেক্ষাপট নিয়ে আজও পাঠকমহলে তীব্র কৌতূহল।

এ সময়ে তাঁর পেশাজীবনও ঘোড়ায় সওয়ার। সওদাগরি অফিসের বড় কর্তার কাজের স্তূপের পাশে থাকত বই, ক্রমে তাঁর পাঠ্যে বাড়ছিল রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ প্রসঙ্গ। বলতেন, বার্ধক্যেও পেশাগত ব্যস্ততার পরেও প্রতি দিন চার-পাঁচ ঘণ্টা ও শনি-রবিবার প্রায় গোটা দিন লেখার শক্তি জোগায় দক্ষিণেশ্বর। লেখার আসরে তিনি পিতৃস্নেহ পেয়েছিলেন স্বয়ং শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে। পরের দিকের বই ও প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ গবেষণায় নতুন ভাবনা সংযোজন করেন, এ পথে তিনি তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী ও স্কুলের দাদা শঙ্করীপ্রসাদ বসুর সার্থক উত্তরসূরি।

নব্বই পেরিয়ে অসুস্থতা সত্ত্বেও অবসর চাননি। তাঁর জীবনকাহিনিটিই যেন রূপকথা— কথাটি মনে করিয়ে দিলেই সরস উত্তর— “দূর! সাহিত্য হল বিমা করার মতো। যা পাবে, সব মৃত্যুর পর।”

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন